প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জেলা

যারা আমার ছেলেকে বাস্তুচ্যুত করে পেটে লা’থি মেরেছে তাদের স্যালুট আমার ক’ফিনে চাই না

448
দিনাজপুর সদর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের জা’নাজা ও চিঠি
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

‘জীবন মৃ’ত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃ’ত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দা’ফন না করা হয়। কারণ, এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, যারা আমার ছেলেকে চাকুরীচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পে’টে লা’থি মে’রেছে, তাদের সালাম/স্যালুট আমার শেষ যাত্রার ক’ফিনে আমি চাই না। ভূল ত্রুটি ক্ষমা করিও।’

কথাগুলো বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের। হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির কাছে চিঠিটি লিখেছিলেন তিনি। হুইপকে সেটি পাঠানোর ২৪ ঘণ্টা পর হাসপাতালেই মা’রা যান ইসমাইল।

বীর মুক্তিযোদ্ধার চিটিতে করা ওছিয়ত অনুযায়ী আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা (গার্ড অফ অনার) ছাড়াই তার দা’ফন স’ম্পন্ন হয়েছে। বাজানো হয়নি বিগউলে। জা’নাজা’র আগে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকশদল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। জাতীর এই বীর সন্তানের ম’রদে’হ জড়ানো হয়নি র’ক্ত দিয়ে অর্জিত লাল সবুজের পতাকা।

দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন পিতৃস্নেহে চিঠিতে যা লিখে গেছেন তার মূল কথা হচ্ছে, জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সুপারিশে ছেলে নুর ইসলামের ‘নো ওয়ার্ক নো পে’ ভিক্তিতে গাড়িচালক হিসাবে চাকরি হয়। সেই সুবাদে নুর ইসলাম সদর এসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন। কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসিকে (রাজস্ব) বিষয়টি দেখতে বলেন।

হুইপকে বিষয়টি আবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নুর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসিল্যান্ড সদরের মিসেস নুর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়।

আরও পড়ুন:  *দিনাজপুরে আত্ম'গোপনে থাকা হত্যা মামলার আসামি 'মিজান গ্রেফতার*

পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষি’প্ত হয়ে যান। এ ছাড়া নুর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য এসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেনি। চাকরি চলে যাওয়ায় তারা উপায় না পেয়ে হুইপ ইকবালুর রহিমের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু প্রশাসন সেটি নে’তিবাচকভাবে নেয়। বর্তমানে তার ছেলে চাকরিচ্যুত ও বাস্তচ্যুত হয়ে পরিবার নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

তিনি আরও লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অ’স্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি-রোজগারটুকুও অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হলো। গত ২১ অক্টোবার থেকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতাল দিনাজপুরের কার্ডিওলজি বিভাগে, ওয়ার্ড নম্বর ২, বেড নম্বর ৪৪ এ ভর্তি অবস্থায় আছি, এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন তুমি ন্যায় বিচার কোরো। ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুত করায় তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কোরো। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ করে চাকরিচ্যুত হওয়ায় একে তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছি। জীবন-মৃ’ত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃ’ত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ, এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষযাত্রার ক’ফিনে আমি চাই না।’ পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২২ অক্টোবর চিঠিটিতে তিনি স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিমের বরাবরে প্রেরণ করেন। পরের দিন ২৩ অক্টোবর সকাল ১১টার সময় হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন আবস্থায় মা’রা যান।

আরও পড়ুন:  *হিলিতে ফেনসিডিলসহ দুই মাদক'কারবারী গ্রেফতার*

আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের জা’নাজা শুরুর আগে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকসদল গার্ড অব অনার প্রদান করার জন্য যান। এ সময় স্ত্রী-ছেলে-মেয়েরা জানায়, তাদের পিতার জীবণ-মৃ’ত্যুর সন্ধিক্ষণে লিখে যাওয়া চিঠি অনুয়ায়ী তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দা’ফন বা গার্ড অব অনার প্রদান করতে দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। তাদের ভাষায় এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে মরহুম ইসমাইল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।

জা’নাজার আগে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের পরিবার-পরিজনের পক্ষে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বলেন, ‘অ’ন্যায়ভাবে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির ওসিয়ত অনুয়ায়ী দা’ফন করতে চাই। চিকিৎসার জন্য তিনি অনেকের কাছে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন।’

গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটকে ছেলেরা বলেন, ‘জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জেলা প্রশাসক বেতন পান। তিনি জেলার পিতা। তার সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা দেখা করতে গিয়ে দেখা পান না। এর চেয়ে লজ্জার কি হতে পারে। এই কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখান করেছেন।’

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। মুক্তিযোদ্ধার মৃ’ত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পর বিষয়টি অবগত হই। পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে না দেওয়ায় তা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।’ মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মুক্তিবার্তা নম্বর ০৩০৮০১১০০২, ভাতা বই নম্বর ৮১৯।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 148
    Shares