প্রচ্ছদ Featured News দ’খল-চাঁ’দাবা’জির রাজত্ব কায়েম করে এক আ’তঙ্কের নাম ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসু

দ’খল-চাঁ’দাবা’জির রাজত্ব কায়েম করে এক আ’তঙ্কের নাম ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসু

201
পড়া যাবে: 9 মিনিটে
advertisement

তিনি একজন কাউন্সিলর। ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের জানমালের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের ভার তার কাঁধে। কিন্তু সেই ভারের ধার ধারেন না তিনি। উল্টো দখল-চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করে বাসিন্দাদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছেন নিজেই। তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাশেম হাসু। ২০০২ সালে প্রথম কাউন্সিলর হওয়ার পর থেকেই এলাকায় দ’খল-চাঁ’দাবা’জির শুরু। তখন ছিলেন বিএনপির অনেকের সঙ্গে ঘনিষ্ট। সরকার পরিবর্তন হলে সখ্যতা গড়েন আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে।

advertisement

এক পর্যায়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান। এরপর শুরু করেন সরকারি দলের পরিচয়ে দ’খল-চাঁ’দাবা’জি। তার বেপরোয়া ক’র্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে সংগঠন থেকে ব’হিস্কার করা হয়। দল থেকে বহিস্কার হলেও থেমে থাকেনি হাসুর অ’পকর্ম। দ্বিতীয় দফা স্বতন্ত্র কাউন্সিলর হওয়ার পর তিনি আরও বে’পরোয়া হয়ে উঠেন। নে’শা হয়ে উঠে অন্যের জমি-সম্পত্তি দখল করা। গত কয়েক বছরে দ’খল, জা’লিয়াতি আর নানা অ’পকর্ম করে তিনি শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ব্যবহার করেন তিনটি দামি গাড়ি।

কাউন্সিলল হাসুর বাবা ফজর আলী এক সময় জীবিকার তাগিদে ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। হাসু এবং তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ছিল রিকশা চু’রির অভিযোগ। জনপ্রতিনিধি হওয়ার পর থেকে হাসু এলাকায় এখন আতঙ্কের নাম। অভিযোগ আছে কা’উন্সিলর হাসু ও তার ভাই অ’বৈধ দ’খলবা’জি করে শ’ শ’ বিঘা জমি, একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও দোকানের মালিক হয়েছেন। তার দ’খলে শুধু সাধারণ মানুষের সম্পত্তি নয় রয়েছে সরকারি খাসজমিও।

আদাবর থানা এলাকায় কেউ নতুন ভবন বা অন্য কোনো স্থাপনা তৈরি করতে হলে হাসুকে চাঁ’দা দিতে হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন দোকান, অফিস, হাসপাতাল থেকে মাসিক চাঁ’দা তোলেন। চাঁ’দা না দিলে বা তাদের মতের বাইরে কেউ গেলে ট’র্চার সেলে নিয়ে নি’র্যাতন করা হয়। ট’র্চার সেলে নি’র্যাতন করে জো’রপূর্বক আ’দায় করে নিতেন চাঁ’দা। এ ছাড়া এলাকার বড় মাপের মা’দক ব্যবসায়ীও তার আশীর্বাদপুষ্ট।

মা’দক ব্’যবসা থেকেও হাসুর মাসে বড় অঙ্কের টাকা আসে। হাসু-কাসু নামে ‘স্টার লীগ’ পরিচালনা সব ধরনের অ’পকর্ম করে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাই মিলে মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আদাবর, শেখেরটেক, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, নবোদয় হাউজিং, সিলিকন বেলী, বেড়িবাঁধের নিম্নাঞ্চল এলাকায় দ’খল করেছেন জমি।

তাদের সহযোগী হিসেবে পরিচিত জুল হোসেন, মাহবুব, শাহ আলম খান, রহমত উল্ল্যাহ ও আবুল কালাম নামে হাসু ও কাসু অসংখ্য বাড়ি ও জমি দ’খল করে প্রথমে রেজিস্ট্রি করতেন। পরে বিক্রি করে যে টাকা আসতো তার বড় অংশই হাসু ও কাসু নিতেন। হাসু চলাফেরা করেন টয়োটা হ্যারিয়ার, রেভ-৪ ও একটি প্রাডো গাড়িতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স’ন্ত্রাসী ক’র্মকা’ণ্ড করে অসংখ্য বাড়িঘর দ’খল করা এই দুই ভাইয়ের দৌরাত্ম্যে আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারাও রীতিমতো অতিষ্ঠ। কাউকে তোয়াক্কা না করে তারা দুজনই স’ন্ত্রাসী ক’র্মকা’ণ্ড করে বেড়ান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমেছে।

আরও পড়ুন:  কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,১৪ কাউন্সিলরকে শোকজ নোটিশ দিল ডিএনসিসি

অথচ ভ’য়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পান না কেউ। তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে মা’মলা-হা’মলাসহ নানা রকম হ’য়রানি করেন। তাই প্রাণের ভয়ে অনেকেই তাদের শেষ সম্বল হারিয়ে এখন অসহায়। এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাউন্সিলর হাশেমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত মা’দক সম্রাট সেলিম মিয়া। তিনি মা’দক ব্য’বসা করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। কাউন্সিলরের নির্দেশে সেলিম শেখেরটেকের রফিক হাউজিং এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেলিমের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন মানিক, টিপু, মকবুল, হীরা, জলিল, আল আমিন, মাসুদ, জসিম, জুয়েল, মোহাম্মদ আলী, মকবুল, আলমসহ আরো অনেকে।

সেলিমের বোন ওই এলাকার ই’য়াবা স’ম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত। কাউন্সিলর হওয়ার পরে আলিফ হাউজিং এলাকায় মা’দকবি’রোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হা’মলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় হাসুর ক্যা’ডার বাহিনী প্রথমে পুলিশের সোর্সের ওপর পরে আদাবর থানার উপ-পরিদর্শক রঞ্জিতের ওপর হা’মলা করে। পুলিশের একটি মোটরসাইকেলও তারা পু’ড়িয়ে দিয়েছিল। অভিযোগ আছে মা’দক ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে হাসু প্রতিমাসে মাসোহারা পান।

অনুসন্ধানে কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাই কাসুর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে, মা’মলা হা’মলা, ভু’য়া দ’লিল তৈরি করে জাল স্বাক্ষরে সাধারণ মানুষের জমি দ’খলের নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, উত্তর আদাবরের ১৪৫/৩ নম্বরের দেলোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি প্লট দখল। আদাবর ৬ নং রোডের মাথায় ২০৩ দাগে ৬৪ কাঠা, ২০৯ দাগে ১৬০ কাঠা জমি দখল।

এই জমির মালিক আলী হোসেন। হাজী মো. ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির শেখেরটেক এলাকায় ৩ কাঠা, বায়তুল আমান হাউজিংয়ে সাড়ে ৫ কাঠা জমি দ’খল। নবোদয় হাউজিং এলাকায় চারটি প্লট, মালেক গলিতে দুটি, আদাবরের বিভিন্ন রোডে সাতটি প্লট, আদাবরের ১০ নম্বর রোডের ৫৯৫ নম্বরের ১০ কাঠা প্লট, ১৩ নম্বর রোডে জমি দ’খল করে ১০টি দোকান, হোসনাবাদ মার্কেটের পাশে ১০ কাঠার প্লট দ’খল করে নিয়েছেন। আলিফ হাউজিংয়ের খাল দ’খল করে অফিস নির্মাণ, মনসুরাবাদ ব্রিজের পাশে জায়গা দ’খল করে অফিস নির্মাণ, কমফোর্ট হাউজিং ও সুনিবিড় মধ্যস্কুল এলাকায়ও কয়েকটি প্লট দ’খলে রয়েছে তার।

আজিজ গার্মেন্টসের জায়গা মাদ্রাসার নামে লিখে নেয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। শেখেরটেক ও বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ১০ নম্বর রোডের শেষ মাথায় ৫টি প্লট দ’খলে নিয়েছে হাসুর ঘনিষ্ঠ হাজী মোজাম্মেল হক ও অন্যরা। কমফোর্ট হাউজিংয়ের আদাবর ১৭/এ রোডের শেষ মাথায় ২টি প্লট, ১৬ নম্বর রোডের কাঁচা বাজারের সাত কাঠা জমি দ’খল এবং ১৬/এ রোডের মসজিদ গলিতে জমি দ’খল করে কাউন্সিলরের লোকজন ব্যবসা করছেন।

২৫/১ শ্যামলীর আলী হোসেন বলেন, আদাবরে ৬ নং রোডের মাথায় ২০৩ দাগে ৬৪ কাঠা ও ২০৯ দাগে ১৬০ কাঠা পৈতৃক সম্পত্তি হাসু কাউন্সিলর দ’খল করে নিয়েছে। ২০৯ দাগের জমির জন্য ২০০৭ সালে মা’মলা করেছিলাম। সাত বছর মা’মলা চলার পর বি’বাদী পক্ষ আদালতে কোনো জবাব দেয়নি। তাই আদালত কাগজপত্র দেখে আমাদের পক্ষে রায় দেন। আর ২০৩ দাগের জমিতে মা’মলা আছে। মা’মলাটি এখন বিচারাধীন।

আরও পড়ুন:  কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা,১৪ কাউন্সিলরকে শোকজ নোটিশ দিল ডিএনসিসি

আলী হোসেন বলেন, হাসু কমিশনার আমাকে একটি হ’ত্যা মা’মলার আ’সামি করে জে’ল খা’টিয়েছেন। জে’লে থাকা অবস্থায় আমার জমি দ’খল করে নেয়। তিনি বলেন, একসময় হাসুর কিছুই ছিল না। পুলিশ দিয়ে হ’য়রানি, মা’রধ’র ও নানারকম হু’মকি-ধ’মকি দিয়ে জ’মি দ’খল করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।

আরেক ভুক্তভোগী মো. ইয়াছিন বলেন, বায়তুল আনাম ১০ নম্বর রোডের শেষ মাথায় ব্রিজের কাছাকাছি সাড়ে পাঁচ কাঠা ও শেখেরটেক ৭ নম্বর রোডের মাথায় মজিদবাগ এলাকার তিন কাঠা জমি কাউন্সিলর ও তার বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় কিছু লোক দ’খল করে নিয়েছে। এ নিয়ে আমরা থানায় জিডি-মা’মলা করেছি। আইজিপি, ডিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু এ জমি আজও উদ্ধার হয়নি।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ১৮ই অক্টোবর হাসুর ক্’যাডার বাহিনী আদাবর থানা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীর ওপর হা’মলা চালায়। হা’মলায় অন্তত ৭জন নেতাকর্মী মারাত্বকভাবে আ’হত হন। এর কয়েক সপ্তাহ পরে ১৪ই নভেম্বর উত্তর আদাবরের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদের ওপরও হা’মলা করে হাসুর ভাড়াটিয়া স’ন্ত্রাসী’রা। ওই সময় হাসু ৩০ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।

এসব হা’মলা ছাড়াও আরও নানা অভিযোগ এনে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ তাকে ব’হিষ্কারের আবেদন করেন। পরে আওয়ামী লীগ থেকে চাঁ’দাবা’জি, জমি দ’খল, বাড়ি দ’খল, স’ন্ত্রাসীদে’র লালন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীর ওপর হা’মলা-নি’র্যাতন, বঙ্গবন্ধুর ছবি মুছে নিজের ছবি লাগানো, জয় বাংলার স্লোগান দিয়ে এলাকায় খু’ন, ডা’কাতি, লু’টপাট, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে সংগঠন বিরোধী কাজ করায় তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হাশেম হাসু বলেন, আমি স্বর্ণের চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছি। আমি তো ফকিরের ঘরে জন্মাইনি। আমার বিশাল সম্পত্তি আছে। এনবিআরে এ সংক্রান্ত ফাইলও আছে। চাঁ’দাবা’জি করে আমি এসব করিনি। বরং নির্বাচিত হয়ে ১০ কাঠা জমি বিক্রি করেছি। আমাদের বিরুদ্ধে মা’মলা থাকতে পারে। কারণ আমি কাউন্সিলর। আমার পক্ষে-বিপক্ষে লোক আছে।

অনেকেই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে। আমি স্বতন্ত্র কাউন্সিলর। সরকারদলীয় কাউন্সিলর না যে, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যাবে না। ছাত্রলীগ নেতা ও মা’দকবি’রোধী অভিযানে পুলিশের ওপর হা’মলার বিষয়ে তিনি বলেন, তারা নিজেরা মা’রামা’রি করে অন্যের ওপর দা’য় চাপাচ্ছে। আর মা’দকের সঙ্গে আমি জড়িত নই। এসব পুলিশ, র‌্যাব দেখবে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 1.9K
    Shares
advertisement