প্রচ্ছদ এক্সক্লুসিভ

সম্রাটের ডেরা থেকে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়েছেন ওমর ফারুক

284
পড়া যাবে: 6 মিনিটে

২৩ নভেম্বর আওয়ামী যুবলীগের ৭ম জাতীয় কংগ্রেস। সাত বছর ধরে দো’র্দণ্ড প্রতাপে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করা ওমর ফারুক চৌধুরীর ইচ্ছা ছিল ওই কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করা। এ কারণে ক্যা’সিনোবি’রোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর যুবলীগ থেকে বাদ পড়ছেন এই আঁচ পেয়ে কংগ্রেসে যেন সভাপতিত্ব করার শেষ সুযোগটুকু তাকে দেয়া হয় সে জন্য দেনদরবার করছিলেন। কিন্তু তার সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হলো না। তাকে যুবলীগের চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন যুবলীগের সাংগঠনিক নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর মধ্য দিয়ে তার যুবলীগে রাজনীতি করার অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল।

ওমর ফারুক চৌধুরীর বিষয়ে অ’ভিযোগের অন্ত নেই সংগঠনটির নেতাকর্মীদের। তিনি যুবলীগের রাজনীতিতে এসে অনেকটাই আঙুল ফুলে কলাগাছ। একসময় তা’মাকের বিকল্প টেন্ডুপাতার ব্যবসা করা ওমর ফারুক যুবলীগের রাজনীতির সুবাদে এখন গাড়ি-বাড়ির মালিক। তার অঢেল সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে। এসব করেও পার পেয়ে যাচ্ছিলেন ওমর ফারুক। অবশেষে ধরা খান ক্যা’সিনোকা’ণ্ডে। ঢাকার ক্লাব ব্যবসার আড়ালে যারা অ’বৈধ জু’য়ার ব্য’বসা করে আসছেন, তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্য ওমর ফারুকের। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট, সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, যুগ্ম সম্পাদক মমিনুল হক সাঈদ, সহসভাপতি এনামুল হক আরমানের ক্যা’সিনো ব্যবসার সুবিধাভোগী ছিলেন তিনি।

রি’মান্ডে দেয়া জি’জ্ঞাসাবা’দে এসবের সত্যতা স্বীকার করেছেন সম্রাট ও খালেদ। সম্রাট জানিয়েছেন, ভিআইপিরা তার কাছ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়েছেন। তার ডেরা থেকে ব্যাগভর্তি টাকা নিয়েছেন। এসব ভিআইপির মধ্যে ওমর ফারুকও রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ক্যা’সিনো সম্রাট ছিলেন ওমর ফারুকের অত্যন্ত আস্থাভাজন। ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে সভাপতি পদে সম্রাটের পদোন্নতি হয়েছে ওমর ফারুকের হাত ধরেই। সম্রাটকে যুবলীগের শ্রেষ্ঠ সংগঠক আখ্যা দিয়েছিলেন খোদ যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি ওমর ফারুক।

ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে দলীয় পদ বা’ণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া স্বেচ্ছাচারিতা, ইচ্ছামাফিক পদ দেয়া-পদ বাতিল করা ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে অ’সদাচরণের অভিযোগ রয়েছে ওমর ফারুকের বিপক্ষে। ৭১ বছর বয়সী এ নেতা দীর্ঘ সাত বছর চেয়ারম্যান পদ আঁকড়ে ছিলেন সংগঠনটির। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কারণে আওয়ামী লীগের বৃহৎ এই সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে ঝরে পড়লেন তিনি।

সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে গত রোববার রাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন যুবলীগ নেতারা। ওমর ফারুক চৌধুরীসহ চার নেতা এতে অনুপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, শেখ ফজলুর রহমান মারুফ এবং শেখ আতিয়ার রহমান দীপু। এদের মধ্যে শেষের দুজন গণভবনের গেট থেকে ফেরত আসেন। প্রথম দুজন আগে থেকেই গণভবনে নি’ষিদ্ধ। এদিকে উল্লিখিত চারজনের প্রত্যেককেই যুবলীগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

ক্যা’সিনোকা’ণ্ডের শুরুতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াসহ তিন নেতার গ্রে’ফতারের পর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। তিনি ওই ঘটনাকে ষ’ড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন। প্রশাসনকেও দুষেছেন। যুবলীগের প্রশ্নবিদ্ধ নেতাদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। এর পরের দৃশ্যপট অন্যরকম। এর পর থেকেই তাকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে রোববার তার বিষয়ে এ অব্যাহতির সিদ্ধান্ত এলো।

তিন বছর মেয়াদি যুবলীগ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব টেনে অর্ধযুগ পার করেছেন ওমর ফারুক চৌধুরী। নানা অজুহাতে যথাসময়ে সম্মেলন করেননি তিনি। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আগামী ২৩ নভেম্বর সংগঠনটির সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর আগে ২০১২ সালের ১৪ জুলাই সর্বশেষ জাতীয় কংগ্রেসে যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ওমর ফারুক চৌধুরী। ক্যাসিনোকাণ্ডের পর থেকে নির্জন-নিভৃতে চলে যান যুবলীগ চেয়ারম্যান। অভিযান শুরুর পর থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ উঠতে থাকে তার বিরুদ্ধে।

ব্যাংক হিসাব তলব ও বিদেশ যাত্রায় নি’ষেধাজ্ঞার পর থেকেই তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। বিপদ বুঝে ছিটকে পড়েছেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নিজেকে তরুণ ভাবাপন্ন ৭১ বছর বয়সী ওমর ফারুক চৌধুরী যুবলীগের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই একক ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। শুরুতে সাবেক নেতাদের পরামর্শ ছাড়াই একটি ঢাউস কমিটি গঠন করেন তিনি। অভিযোগ আছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি অনেক নেতাকে কমিটিতে স্থান দিয়েছেন। পদভেদে ১০ লাখ থেকে শুরু করে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছেন। ফ্রিডম পার্টি ও যুবদলের অনেকে টাকার বিনিময়ে ঠাঁই পেয়েছেন যুবলীগে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।

আরও পড়ুন:  এবার শেখ মারুফসহ ১৭জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা জানান, বিগত সাত বছরে তারা চেয়ারম্যানের ভয়ে ত’টস্থ ছিলেন। মুখবুজে সব অ’পকর্ম সহ্য করেছেন। সংগঠনের সব সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে নিয়েছেন। আমাদের শুধু সম্মতি দিতে হয়েছে। তার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে মত দিলেই তাৎক্ষণিক ব’হিষ্কার, অফিসে আসতে বারণ পর্যন্ত করা হয়েছে। তারা বলেন, তার সব অ’পকর্ম জায়েজ করার মেশিন ছিল যুব জাগরণ প্রকাশনা। এখান থেকে নানা বই ও প্রকাশনা বের করে সবার কাছে ভালো সাজার চেষ্টা করতেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে হাজারও অভিযোগ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। দলীয় পদবাণিজ্যের অভিযোগ, স্বেচ্ছাচারিতা, ইচ্ছামাফিক পদ দেয়া-পদ বাতিল করা ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ ছিল তার নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। সম্রাটের ক্যা’সিনোর ভা’গ পেতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। যুবলীগের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ক্যা’সিনো’তে সম্পৃক্ত ‘বিস্ময়কর’ এবং সংগঠনটির জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের অনেক নেতা।

বি’তর্কিত ক’র্মকাণ্ডে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া ওমর ফারুক চৌধুরীর সমালোচনায় মেতে ওঠেন কোণঠাসা প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। যুবলীগের প্রেসিডিয়ামের কয়েকজন নেতা বলেন, চেয়ারম্যানের প্রশ্রয়ে সংগঠনের অনেকেই বে’পরোয়া হয়ে ওঠেন। ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ছিল। তারা কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সারা দেশের জেলা-উপজেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও পদবাণিজ্য করে। দায়িত্বশীলদের এড়িয়ে একমাত্র দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের শলাপরামর্শেই চূড়ান্ত হতো চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত।

এমনকি গুরুত্বপূর্ণ সব কার্যক্রমের বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ পর্যন্ত অন্ধকারে থাকতেন। বর্তমান ও সাবেক একাধিক নেতা জানান, ২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে যুবলীগের ঐতিহ্য বিলীন হতে শুরু করে। অর্থের বিনিময়ে দলে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন এলাকায় বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বিতাড়িতরাও। অর্থের বিনিময়ে দলে অযোগ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ অনেক ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন সংগঠনের চেয়ারম্যান।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর মিরপুরের দারুসসালাম এলাকায় গোলারটেক মাঠে ঢাকা মহানগর যুবলীগ উত্তরের কয়েকটি ওয়ার্ডের যৌথ ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স’মালোচনা করেন ওমর ফারুক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আপনি বলছেন ৬০টি ক্যা’সিনো আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপনারা ৬০ জনে কি এতদিন আঙুল চু’ষছিলেন? তা হলে যে ৬০ জায়গায় এই ক্যা’সিনো, সেই ৬০ জায়গার থানাকে অ্যা’রেস্ট করা হোক। সেই ৬০ থানার যে র্যা ব ছিল, তাদের অ্যা’রেস্ট করা হোক।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘অ’পরাধ করলে শা’স্তির ব্যবস্থা হবে। প্রশ্ন হলো- এখন কেন অ্যা’রেস্ট হবে। অতীতে হলো না কেন, আপনি তো সবই জানতেন। আপনি কি জানতেন না? নাকি সহায়তা দিয়েছিলেন সে প্রশ্নগুলো আমরা এখন তুলব। আমি অ’পরাধী, আপনি কী করেছিলেন? আপনি কে, আমাকে আঙুল তুলছেন?’ সেদিন উত্তেজিত হয়ে যুবলীগের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাকে অ্যা’রেস্ট করবেন? করেন। আমি রাজনীতি করি, ১০০ বার অ্যা’রেস্ট হব। আমি অ’ন্যায় করেছি, আপনারা কী করেছিলেন? আপনি অ্যা’রেস্ট করবেন, আমি বসে থাকব না। আপনাকেও অ্যা’রেস্ট হতে হবে। কারণ আপনিই প্রশ্রয় দিয়েছেন।’

ওমর ফারুক চৌধুরী আরও বলেন, ‘এখন হঠাৎ করে কেন জেগে উঠলেন? কারণটি কী? এটি কি বিরাজনীতিকরণের দিকে আসছেন? দলকে প’ঙ্গু করার কোনো ষ’ড়যন্ত্রে আসছেন? নিষ্ক্রিয় করার ষ’ড়যন্ত্রে আসছেন?’ যুবলীগের অনেক নেতা জানান, ২০০৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন ওমর ফারুক। এর আগের কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আর ২০১২ সালে হন চেয়ারম্যান।

এর পর থেকে যুবলীগে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের শীর্ষ পদ পাওয়ার পর সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন এবং ধনাঢ্য জীবনযাপন করছেন; যদিও তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই। ওমর ফারুক ৬৪ বছর বয়সে হয়েছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। অথচ যুবলীগের ইতিহাসে এর আগে ৫০ বছরের বেশি বয়সী কেউ চেয়ারম্যান হননি। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে শেখ ফজুলল হক মনি যখন যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার বয়স ছিল ৩২ বছর।

১৯৪৮ সালে জন্ম নেয়া ওমর ফারুক চৌধুরী সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম জেলা বিড়ি শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এইচএম এরশাদ ক্ষমতায় আসার সময় ওমর ফারুক শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় পার্টির প্রয়াত নেতা নাজিউর রহমান (মঞ্জু) এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য হলে ওমর ফারুক দলবদল করেন। জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন।

আরও পড়ুন:  এবার ওমর ফারুক ও তার স্ত্রী-ছেলেদের সকল ব্যাংক হিসাব জব্দ, গ্রে’প্তারের শঙ্কা

ওমর ফারুক চৌধুরী নাজিউর রহমানের ভায়রা এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভগ্নিপতি। এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে তিনি সদস্য হন। ১৯৯৭ সালে তিনি উত্তর জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হন। সদ্য পদ হারানো নেতা ওমর ফারুক তামাকের বিকল্প ‘টেন্ডুপাতা’ থেকে শুরু করে তৈরি পোশাকের ব্যবসা করেছেন। ঋ’ণখে’লাপি হয়েছেন। রাজনীতিতেও দীর্ঘ সময় সুবিধা করতে পারেননি।

বিড়ি শ্রমিক লীগ, জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন, আওয়ামী লীগ করেও লম্বা সময় ছিলেন পেছনের কাতারে। তবে যুবলীগ তাকে নিয়ে গেছে শীর্ষে। যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর শোধ করেছেন পুরনো ব্যর্থতার দেনা।

২০০৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন ওমর ফারুক। এর আগের কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আর ২০১২ সালে হন চেয়ারম্যান। এর পর থেকে যুবলীগে তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের শীর্ষ পদ পাওয়ার পর সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন এবং ধনাঢ্য জীবনযাপন করছেন। যদিও তার দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই।

এ নিয়ে সংগঠনের নেতাকর্মীদের সমালোচনাও আছে। যুবলীগের একাধিক নেতা জানান, চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাদের সরাসরি আলাপ করার সুযোগও কম ছিল। যুবলীগের বহিষ্কৃত দফতর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। পিয়ন থেকে দফতর সম্পাদক হওয়া কাজী আনিসও ‘কমিটি–বাণিজ্য’ করে অনেক বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। আনিস এখন প’লাতক।

যুবলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমনই ভাগ্য ওমর ফারুকের, ৬৪ বছর বয়সে হয়েছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। অথচ যুবলীগের ইতিহাসে এর আগে ৫০ বছরের বেশি বয়সী কেউ চেয়ারম্যান হননি। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে শেখ ফজুলল হক মনি যখন যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার বয়স ছিল ৩২ বছর।

১৯৪৮ সালে জন্ম নেয়া ওমর ফারুক চৌধুরী সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম জেলা বিড়ি শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের প্রয়াত কেন্দ্রীয় নেতা এসএম ইউসুফ ছিলেন তার রাজনৈতিক মুরব্বি। বিড়ি শ্রমিক লীগের নেতা হয়ে মিয়ানমার থেকে টেন্ডুপাতা আমদানি শুরু করেন ওমর ফারুক। তামাকের বিকল্প এ টেন্ডুপাতা বিড়ির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

এইচএম এরশাদ ক্ষমতায় আসার সময় ওমর ফারুক শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় পার্টির প্রয়াত নেতা নাজিউর রহমান (মঞ্জু) এরশাদের মন্ত্রিসভার সদস্য হলে ওমর ফারুক দলবদল করেন। জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ওমর ফারুক চৌধুরী নাজিউর রহমানের ভায়রা ভাই এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভগ্নিপতি। তৎকালীন মন্ত্রী নাজিউর রহমানের উৎসাহে ওমর ফারুক জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জেলার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর কিছু দিন নীরব ছিলেন ওমর ফারুক। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে তিনি সদস্য হন। ১৯৯৭ সালে তিনি উত্তর জেলা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হন। ওই কমিটির মেয়াদ ছিল ২০০৪ সাল পর্যন্ত। ১৯৯২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে উত্তর কমিটিতে সদস্য ও কোষাধ্যক্ষ ছিলেন ওমর ফারুক চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এরশাদের আমলে যুব সংহতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ওমর ফারুকের আয় বাড়তে থাকে। মালিক হন পোশাক কারখানার। ওমর ফারুক চৌধুরী নিজেও গত সোমবার বলেন, তিনি ১৯৮৮ সালে রাউজানে পোশাক কারখানা স্থাপন করেছিলেন, যা পরে চট্টগ্রাম শহরের জুবিলি রোডে স্থানান্তর করেন।

তবে এই ব্যবসা করতে গিয়ে সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি হয় ওমর ফারুকের। ব্যাংকঋণের দায়ে নগরের একটি বাড়ি এবং রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের জমি ও ঘর নিলামে ওঠার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে। নিলামে তোলার দিনক্ষণও ধার্য করেছিলেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত। উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে নিলাম ঠেকান তিনি।

সম্পদ নিলামে ওঠার দুই মাস আগেই যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন ওমর ফারুক চৌধুরী। আওয়ামী লীগও ওই বছরের শুরুতে ক্ষমতায় আসে। পরিস্থিতি বদলাতে থাকে তার। ব্যাংকঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছেন তিনি। কিন্তু এখন আর ওমর ফারুক চৌধুরীর দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 2.9K
    Shares