প্রচ্ছদ বাংলাদেশ বিভাগ

ডাস্টবিনের শত শত গরু-ছাগলের চামড়া!

65
ডাস্টবিনের শত শত গরু-ছাগলের চামড়া
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

কোরবানির পশুর বর্জ্য টানতে গিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি ডাস্টবিনে আস্ত দুটি গরুর চামড়া পান চার জন পরিচ্ছন্ন কর্মী। যা ৫শ’ টাকায় বিক্রি করে ভাগবাটোয়ারা করেছেন পরিচ্ছন্ন কর্মীরা।

কোরবানির দিন বিকালে প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় পরিচ্ছন্ন কাজে নিয়োজিত চসিকের সুপারভাইজার তসলিম উদ্দিন। তিনি জানান, চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার এ-ব্লক ৩নং সড়কে রাখা ডাস্টবিনে পাওয়া যায় চামড়া দুটি। এরমধ্যে একটি চামড়া ২৪ বর্গফুট, আরেকটি চামড়া ২৮ বর্গফুটের মতো হবে। তিনি বলেন, একইভাবে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের একটি ডাস্টবিনেও একটি গরুর চামড়া ও চারটি ছাগলের চামড়া পাওয়া গেছে। মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকার তিনটি ডাস্টবিনে তিনটি গরু ও সাতটি ছাগলের চামড়া পাওয়া গেছে। যা বিক্রি করে টাকা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন পরিচ্ছন্ন কর্মীরা।

সুপারভাইজার তসলিম উদ্দিন বলেন- শুধুমাত্র চান্দগাঁও ও মোহাম্মদপুর আবাসিক এলাকায় নয়, চট্টগ্রাম মহানগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, মৌসুমী আবাসিক এলাকা, হিলভিউ আবাসিক এলাকা, কাপাসগোলা ও শুলকবহর আবাসিক এলাকা, হালিশহর, পাঁচলাইশ, চকবাজার, বাকলিয়া কল্পলোক, আগ্রাবাদ ও খুলশী আবাসিক এলাকাসহ সবকটি আবাসিক এলাকায় সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনে পাওয়া গেছে এমন শত শত কোরবানির গরু-ছাগলের চামড়া।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি শৈবাল দাশ সুমন বলেন, আবাসিক এলাকাসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সিটি করপোরেশনের রাখা ডাস্টবিনে প্রথমবারের মতো শত শত গরু-ছাগলের চামড়া মিলেছে। যা অকল্পনীয়। গরু-ছাগলের চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় অনেকে রাগ করে চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার একাধিক খবর নিশ্চিত করেন তিনি। তিনি বলেন, চট্টগ্রামে এবার কোরবানি দাতাপর্যায়ে ২শ’ থেকে ৩শ’ টাকার বেশি চামড়া বিক্রয় হয়েছে এমন নজির খুবই কম। লাখ টাকা গরুর মূল্য হলেও চামড়া বিক্রি হয়েছে ৩শ’ টাকায়। কিন্তু আড়তে শোনা যাচ্ছে অন্য গল্প। সরকার নির্ধারিত মূলের চেয়েও নাকি বেশি দামে চামড়া কিনেছে ক্রেতারা। চামড়ার দাম অত্যন্ত কম হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম মহানগরীর নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা ডা. কাউছার হোসেন।

তিনি বলেন, এক লাখ ১০ হাজার টাকায় গরু কিনেছি। আর সে গরুর চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ৩শ’ টাকায়। ক্রেতারা তো ২৫০ টাকার বেশি দিতেই চাচ্ছিল না। গরিবের হকের কথা বলে ৩শ’ টাকা নিয়েছি। তিনি বলেন, কাঁচা চামড়া দাম কম হলেও চামড়াজাত পণ্যের দাম কি কম? এক-দেড় ইঞ্চির পাতলা চামড়ার জোড়া জুতোর দামও বাজারে ৩ হাজার টাকার বেশি। এক বর্গফুটের একটি ব্যাগের দামও ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা। তাহলে কাঁচা চামড়ার দাম এত কম কেন।

এদিকে, অনেক খোঁজাখুঁজির পর ডাস্টবিনে চামড়া ফেলে দেয়া চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ইঞ্জিনিয়ার সামশুদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় গতকাল দুপুরে। তিনি বলেন, ৯৫ হাজার টাকায় গরু কিনেছি। আর চামড়ার দাম নাকি ২শ’ টাকা। তাই রাগ করে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছি। তাতে লাভ কি হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, চামড়ার টাকা গরিবের হক। এতে আমার লাভের কিছুই না থাকলেও দায়িত্ব তো আছে। চামড়া বিক্রির টাকা গরিবদের বিলিয়ে দেয়া আমার দায়িত্ব। কিন্তু এত কম টাকা আমি কাকে দেব। কয়জনকে দেব। তাই চামড়া ফেলে দিয়েছি। একইভাবে নগরীর মৌসুমী আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শওকত আলী নুর, হিলভিউ আবাসিক এলাকার ইফতেখার হোসেন বাবুল, হালিশহর আবাসিক এলাকার কে-ব্লকের বাসিন্দা আজাদ সোহাগসহ অনেকেই এবার কোরবানির গরুর চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দেয়ার কথা জানান। তারা বলেন, শুধু আমরা নয়- আবাসিক এলাকার অনেকে লাখ টাকার গরুর চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে।

তারা বলেন, নগরীর ওয়ার্ড ও মহল্লায়-মহল্লায় কোরবানির গরু ছাগলের চামড়া কিনেছে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ নামধারী নেতাকর্মীরা। যারা সিন্ডিকেট করে কোরবানি দাতাদের জিম্মি করে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়েও তিন চতুর্থাংশ কম মূল্যে গরু-ছাগলের চামড়া কিনেছে। এ নিয়ে যারা একটু আপত্তি বা বেশি দাম চেয়েছে-তাদের গরুর চামড়া কেনেনি। ফলে বিকালের দিকে অনেকে গরু-ছাগলের চামড়া ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাঠপর্যায়ের ক্রেতারা চামড়া কেনার আগে গরু বা ছাগল কত টাকা দিয়ে কিনেছে তার খোঁজ খবর নিয়েছে। তারপর লাখ টাকার গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৩শ’ টাকায় কিনেছে। আর ১০ হাজার টাকা দামের ছাগলের চামড়া কিনেছে মাত্র ২০ টাকায়।

অথচ সরকার ঢাকার বাইরে এবার প্রতিবর্গফুট গরুর চামড়া ৩৫-৪৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। যা গতবছরের তুলনায় পাঁচ থেকে ১০ টাকা কম। তবুও সে হিসেবে লাখ টাকার একটি গরুর চামড়া ২৮ থেকে ৩০ বর্গফুট হলে তার মূল্য এক হাজার থেকে ১৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রয় হওয়ার কথা। আর এদিকে এত কম দামে চামড়া কেনার কথা অস্বীকার করছেন চামড়া ব্যবসায় মাঠপর্যায়ে পুঁজি বিনিয়োগ করা চামড়া ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, প্রতিটি চামড়া গড়ে এক হাজার থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত কিনতে হয়েছে। যা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি। আর লবণজাত করা ও শ্রমিকদের বেতনসহ প্রতিটি চামড়া ১৪০০ টাকার বেশি গিয়ে পড়বে। কিন্তু আড়তদাররা সে মূল্যে চামড়া কিনতে চাচ্ছে না। আড়তদাররা এক হাজার টাকার বেশি কোনো চামড়াই কিনছে না বলে জানান চামড়া ব্যবসায়ীরা।

চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি আব্দুল কাদের বলেন, ব্যবসায়ীরা যতকিছুই বলুক। তারা কত টাকায় চামড়া কিনেছে তার খবর আমাদের কাছে আছে। বেশি মুনাফার লোভে তারা বেশি দামে চামড়া ক্রয়ের কথা বলছে। কিন্তু তারা মানুষকে কিভাবে ঠকিয়েছে তা আমরা জানি। চট্টগ্রাম মহানগরীর চামড়া আড়তদার জহিরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামে ২২টি ট্যানারি সবকটি বন্ধ হয়ে আছে মাত্র একটি। ফলে চট্টগ্রামের চামড়া ঢাকায় বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আর সেখানেও সব ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেট করে সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে চামড়া কিনতে রাজি নন। ফলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও পাঁচ থেকে ১০ টাকা কম দামে আমরা চামড়া না কিনলে লাভের মুখ দেখা সম্ভব হবে না বলে জানান তিনি।

সর্বশেষ আপডেট