প্রচ্ছদ Featured News কেউ বলেন, হাওরের রাজা ,কেউ বলেন শাহানশাহ।কারও চোখে তিনি অঘোষিত সম্রাট

কেউ বলেন, হাওরের রাজা ,কেউ বলেন শাহানশাহ।কারও চোখে তিনি অঘোষিত সম্রাট

244
পড়া যাবে: 7 মিনিটে

কেউ বলেন, হাওরের রাজা। কেউ বলেন শাহানশাহ। কারও চোখে তিনি অঘোষিত সম্রাট। অথচ হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার পক্ষে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি এমপি হয়েছিলেন। এখন এর ধারে কাছেও নেই। উল্টো হাওরের মানুষের জীবন জীবিকার ওপর প্রচ্ছন্ন হু’মকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। চাঁ’দাবা’জি, দ’খল আর অ’নৈতিক ক’র্মকাণ্ডের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। তিন জেলায় গড়েছেন অন্তত ১৩টি বাড়ি। বিদেশে সম্পদ আছে এমন অভিযোগও আছে।

তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। আওয়ামী লীগের টিকিটে রতন টানা তিন মেয়াদে এ আসনের এমপি। এই সময়ে পুরো এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন নিজের রাজত্ব। তার কথার বাইরে কিছুই হয় না এ নির্বাচনী এলাকায়। সবাইকে চমকে দিয়ে এমপি হওয়া রতনের ফুলে ফেঁ’পে কলা গাছ হওয়ার গল্পও অনেক চমকে ভরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে শুরু হওয়া দু’র্নীতি বি’রোধী অ’ভিযান শুরুর পর থেকেই তার নাম মানুষের মুখে মুখে। তার বিরুদ্ধে দু’র্নীতি দ’মন ক’মিশনেও জমা হয়েছে অভিযোগ।

দেশত্যাগে দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। পরিস্থিতি আঁচ করতে পের প্রকাশ্যে আসছেন না রতন। গা-ঢাকা দিয়েছেন তার সহযোগীরাও। সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদ তাহিরপুর, ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসনের পুরো এলাকাই হাওরাঞ্চল। সম্প্রতি সরজমিন এ চার উপজেলা ঘুরে এমপি রতনের অ’পকর্মের নানা তথ্য পাওয়া গেছে। ভূক্তভোগীদের অনেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে ভয় পান। আবার কেউ কেউ সরাসরি অভিযোগ দিচ্ছেন তার বিরুদ্ধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুনামগঞ্জের তাহিরপুর এলাকার জাদুকাটা নদী থেকে বালু ও পাথর উত্তোলনের নৌকা থেকে চাঁ’দাবা’জি হচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। এই চাঁ’দাবা’জি করছেন এমপি রতনের লোকজন। স্থানীয়দের ভাষ্য, তাহিরপুরের ফাজিলপুর জাদুকাটা নদীতে বালু ও পাথর উত্তোলন করা নৌকা থেকে প্রতিদিন ট্রিপ প্রতি ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, এখানে টাকা দিলে নৌকা থাকবে, না দিলে থাকবে না। নেতারা এসে সোজা বলে দিছে। তিনি বলেন, এলাকায় কেউ ভয়ে মুখ খুলে না। সবাই জি’ম্মি।

এই ব্যক্তির অভিযোগ, যারা টাকা আদায় করে তারা সবাই এমপির লোক। এই টাকার বড় অংশ যায় এমপির পকেটে। এক সময় তাহিরপুর এলাকার মিজানুর রহমান সোহেল নামের এক ব্যক্তি এমপির সব কাজ করতেন। ফাজিলপুর, বড়ছড়া বাজার, লাউয়ের গড় বাজারসহ একাধিক বাজার থেকে চাঁ’দা আদায় করতেন ওই মিজান। তবে গত সাত বছর মিজানের কোনো হদিস নেই এলাকায়। তার স্ত্রী জোসনার সঙ্গে আলাপ করে জানা যায় রতনের সঙ্গে মিজানের সম্পর্কের কথা।

জোসনার তথ্য মতে, এমপি হওয়ার পর থেকে মিজান ছিল রতনের ডান হাত। তার সব কাজই করে দিতেন মিজান। হঠাৎ করেই দলীয় কো’ন্দলের শি’কার হয়ে মিজান এলাকা ছাড়া হন। যখন এমপির সঙ্গে ছিলেন তখন বড়ছড়া বাজার, ফাজিলপুর, বিশম্ভপুর ও লাউয়ের গড় বাজারের দোকানপাট নিয়ন্ত্রণ করতেন মিজান। মাসে সত্তর থেকে আশি লাখ টাকা পর্যন্ত তিনিই তুলে দিতেন। মিজান এলাকায় নেই কেন তা জানতে চাইলে জোসনা বলেন, দলের লোকজনের সাথে কি নিয়া যেন ঝা’মেলা হইছিল।

দীর্ঘদিন এলাকার বাইরে থাকলেও স্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন মিজান। তবে কার ভয়ে তাহিরপুর থেকে বিতাড়িত সে বিষয়ে মুখ খোলেননি জোসনা। এদিকে সম্প্রতি দু’র্নীতি দ’মন ক’মিশনে এই মিজানই অভিযোগ করেছেন এমপি রতনের বিরুদ্ধে। ৩রা অক্টোবর সংস্থাটির চেয়ারম্যান বরাবর এক অভিযোগ পত্র আসে সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপির বিরুদ্ধে। সে অভিযোগটি করেন মিজান। এ নিয়েও তাহিরপুরে চলছে ব্যাপক আলোচনা। যে মিজান একসময় এমপির সঙ্গে চলতেন তিনিই কিনা এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। নাম প্রকাশ না করা শর্তে সুনামগঞ্জের একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, এমপি রতনের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই।

২০০৮ সালে হঠাৎ করেই আওয়ামী লীগের এমপি হয়ে যায়। কার মাধ্যমে হয় সেটাও জানি না। তাহিরপুরে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের দূরে সরিয়ে দিয়েছেন তিনি। একে একে দলের মধ্যে বিএনপি নেতাদের প্রবেশ করান। তাহিরপুরের কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতিও করেন বিএনপির এক নেতাকে। সাথে আরো কয়েকজনকে ওই চক্রে নিয়ে নেন এমপি। এই চক্র গত ১১ বছর ধরে সমিতির নামে হাজার কোটি টাকা চাঁ’দা আদায় করেছে। আমরা এলাকাবাসী ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ থেকে অনেক প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু এমপি তার লোকজন দিয়ে সবাইকে হু’মকির মুখে রাখেন।

এমপি রতনের জন্ম ধর্মপাশা উপজেলার নওদা গ্রামে ১৯৭৩ সালে। নওদা গ্রামের কৃষক আবদুর রশীদ ওরফে দারোগ আলীর চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রতন দ্বিতীয়। তার বাবা ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ বাজারে একসময় আটা বিক্রি করতেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ১৯৮৮ সালে ধর্মপাশার বাদশাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথমে ফেল করে দ্বিতীয়বার পাস করেন রতন। পরে সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন।

যদিও জাতীয় সংসদের ওয়েবসাইটে ‘বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার’ লেখা রয়েছে রতনের শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে। সিলেট পলিটেকনিকে পড়ার সময় সিলেটের সাবেক একজন এমপির বাড়িতে থাকতেন। সে সময় তিনি ওই এমপির একটি ফোন-ফ্যাক্সের দোকান তদারকি করতেন। সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলায় টেলিফোন বিভাগে তার কর্মজীবন শুরু। ওই সময় তিনি জনৈক সিভিল সার্জনের স্ত্রী বিলকিস নূরের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে জগন্নাথপুরে আলাদা সার্ভার বসিয়ে অ্যান্টিনাবিহীন ফোনের মাধ্যমে ভিওআইপি ব্যবসা শুরু করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন।

আরও পড়ুন:  সরকারি টাকায় নিজের জন্য ব্রিজ বানাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতা!

পাওনা নিয়ে বিলকিস নূর তার বিরুদ্ধে মা’মলাও করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে খুব একটা যুক্ত না থাকলেও বিপুল অর্থ ব্যয়ে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান। এ নিয়ে দলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। জানা যায়, প্রয়াত প্রভাবশালী এক নেতার হাত ধরেই আওয়ামী লীগে পদার্পন করেন রতন। এরপর প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একতরফা নির্বাচনে পরপর আরও দুবার এমপি হন তিনি। দুদকে যাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, রতন রাজধানী ঢাকা, সুনামগঞ্জ, ধর্মপাশা, নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে ১৩টি বাড়ির মালিক। এর মধ্যে ধর্মপাশায় নিজ গ্রামে ১০ কোটি টাকায় ‘হাওর বাংলা’ নামে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন।

বাড়িটির অধিকাংশ জমি সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের এক ব্যক্তির কাছ থেকে দ’খল করা। সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুরে জেলা পুলিশ লাইনসের বিপরীতে ৭ কোটি টাকায় বাড়ি কেনেন রতন। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘পায়েল পিউ’। বাড়িটি এক লন্ডন প্রবাসীর কাছ থেকে কিনে নেন তিনি। ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তার আরও সাতটি বাড়ি রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরেও রয়েছে দুটি বাড়ি।

নেত্রকোনা জেলা শহরেও একটি বাড়ি রয়েছে। নেত্রকোনা শহরে তার মা-বাবার নামে মেডিকেল কলেজ করার জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে জমি ক্রয় করেছেন তিনি। এছাড়া ঢাকার গুলশানের নিকেতনের কয়েকটি ফ্ল্যাটের মালিক রতন। অভিযোগ মতে, গত কয়েক বছরে তার সহোদর যতন মিয়ার নামে ৫০০ একর জমি কেনা হয়েছে। ওই জমিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্টের জন্য একটি বিদেশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে প্রকল্প তৈরি করেন তিনি।

কিন্তু তার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। ওই কোম্পানির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও মোটা অঙ্কের পাওনা নিয়ে দেনদরবার চলছে। তাছাড়া রতনের নিজ নামেও আছে কমপক্ষে ৬০ একর জমি। এদিকে দুদকের অনুসন্ধানে রয়েছে, এমপির দেশের বাইরে কানাডাতেও বাড়ি থাকার অভিযোগ। তাছাড়া দেশে অর্জিত বিপুল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পা’চারের অভিযোগের বিষয়টিও রয়েছে সংস্থাটির অনুসন্ধান টেবিলে। নির্বাচন কমিশনে নিজের স্বাক্ষর করা হলফনামায় তিনি ২০০৮ সালের ২১শে নভেম্বর লেখেন, তার স্ত্রী মাহমুদা হোসেন লতা ৪০ তোলা স্বর্ণের মালিক। রয়েছে ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৭৫৪ টাকার জমি। তবে স্ত্রীর কোনো আয় নেই।

নিজের মোট আয় ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৮৩ টাকা। মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২২ টাকা। ২০১৩ সালের ৭ই নভেম্বর দেয়া হলফনামায় নিজ নামে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্ত্রী লতার পরিচয় দেন ব্যবসায়ী। হলফনামায় স্ত্রী লতাকে পায়েল টেক্স লিমিটেডের পরিচালক উল্লেখ করেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেয়া হলফনামায় তিনি ৫২৩ দশমিক ২৭ একর কৃষিজমি, ৮ দশমিক ২৬ একর পরিমাণের অকৃষি জমি, একটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং নিজের ও অংশীদারিত্বের তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা উল্লেখ করেন।

একাদশ নির্বাচনের আগে রতনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে স্থানীয় ২১ জন নেতা সুনামগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দাবি করেন। রতন নিজের মনোনয়ন ঠিক রাখতে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় রতন তার নামে-বেনামে থাকা রাজধানী ঢাকা, আশুলিয়া, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে বেশকিছু জমি বিক্রি করেন।

তাহিরপুরে কয়লা আমদানিকারক গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে শত শত কোটি টাকা চাঁ’দাবা’জির অভিযোগ অনেকদিনের। চাঁ’দাবা’জির টাকা থেকে অর্জিত অর্থে এমপি রতনসহ তার চক্রের প্রায় সবাই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। চক্রের অন্যতম দুই সদস্য হলেন তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ও সচিব রাজেশ তালুকদার।

সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুদক ও জেলা প্রসাশকের কার্যালয়ে সমিতির শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন কয়লা আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও এলাকাবাসীর পক্ষে সেলিম ইকবাল নামের এক ব্যাক্তি। অভিযোগ সূত্র বলছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সভাপতি প্রার্থী হন তৎকালীন তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হোসেন খান এবং বিএনপি থেকে তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর (উত্তর) ইউনিয়নের বড়ছড়া গ্রামের আলকাছ উদ্দিন খন্দকার। কিন্তু সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেন এবং নিজের ক্ষমতাবলে বিএনপির প্রার্থী আলকাছ উদ্দিন খন্দকারকে বিজয়ী ঘোষণা করতে নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করেন।

সভাপতির আসন দখল করার পর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার লালারগাও গ্রামের রাশেন্দ্র তালুকদারের ছেলে এমপি রতনের মদতপুষ্ট রাজেশ তালুকদারকে সমিতির সচিব হিসেবে নিয়োগ দিয়ে শুরু হয় সমিতির নামে চাঁ’দাবা’জি । তখন থেকেই  চলছে তাদের চাঁ’দাবা’জির রাজত্ব। ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যাদের কোনো সম্পৃক্ততাও ছিল না হঠাৎ করে এমপির ছত্রছায়ায় টাকার প্রভাবে বিএনপি নেতা আলকাছ উদ্দিন খন্দকার বনে যান তাহিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও তার ছেলে মঞ্জুর খন্দকার হয়ে যান সুনামগঞ্জ জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক।

আরও পড়ুন:  দুদকের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন সাংসদ রতন-বাবু

সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছর পর পর নির্বাচন দেয়ার নিয়ম থাকলেও এমপির ম’দতে আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ ১১ বছর তাহিরপুর কয়লা আমদানীকারক সমিতির সভাপতির দায়িত্বে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময় সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতি ৫০ টন কয়লা ও চুনা পাথর থেকে ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করে যাচ্ছেন তারা। এই চাঁদা আদায়ের রশিদগুলোর কোনটাতেই বহি নম্বর দেয়া থাকে না।

স্থানীয়দের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত কত কোটি টন কয়লা ও চুনাপাথর এ দুটি শুল্ক ষ্টেশন দিয়ে আমদানি হয়েছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে সরকারের রাজস্ব বিভাগে। এ হিসাব টানলেই তাদের সঠিক চাঁ’দা আদায়ের হিসাব বের হয়ে আসবে। এছাড়াও নতুন ব্যাবসায়ীদের সমিতিতে অন্তর্ভুক্ত করার সময়ে সমিতির নামে ২০ হাজার টাকার রশিদ দিলেও মূলত প্রতি সদস্য থেকে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁ’দা আদায় করা হয়। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, বিগত ১১ বছরে তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির অধীন ২টি শুল্ক ষ্টেশনের পাটলাই নদী পথে প্রতিদিন প্রায় ৩শ ষ্টিল বডির বাল্কহেড নৌকা ও কার্গো কয়লা, চুনা পাথর পরিবহন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়।

এসব কয়লা ও চুনা পাথরবাহী নৌকা থেকে আমদানিকারক সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকা চাঁ’দা আদায় করছে এই চক্রটি। এমনকি দেশের টাকা বিদেশে পা’চারের অভিযোগও রয়েছে সমিতির সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ও তার ছেলে মঞ্জুর খন্দকারের বিরুদ্ধে। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আলকাছ উদ্দিন খন্দকার। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ সত্য নয়। মা’মলার কারণে সমিতির নির্বাচন হচ্ছে না। এজন্য তিনি দীর্ঘ দিন দায়িত্বে আছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের আগ পর্যন্ত এই আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ট্যাকেরঘাটের চুনাপাথর কোয়ারীতে মাটি কাটার শ্রমিকদের সর্দার হিসেবে কর্মরত ছিলেন । পরবর্তীতে হঠাৎ করেই শ্রমিকদের জনবল দেখিয়ে তৎকালীন বিএনপির এমপির সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে উঠে এবং বিএনপির একজন সক্রিয় কর্মী বনে যায়। সেই সময় আলকাছ উদ্দিন তৎকালীন এমপির লোক পরিচয়ে নিজেই সমিতি করে হয়ে যায় সভাপতি। একাধারে প্রায় এক যুগ সমিতি পরিচালনা করেন। এক যুগে সমিতির নাম ভাঙিয়ে লা’ঠিয়াল বা’হিনী দিয়ে চাঁ’দাবা’জি করে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যান।

সে সময় বিএনপির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যানের একটি জনসভায় স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত ধানের শীষ উপহার দেন এই আলকাছ উদ্দিন খন্দকার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলকাছ উদ্দিন হয়ে যান আওয়ামী লীগ কর্মী। যে এলাকার পাথর উত্তোলনের কোয়ারীতে আলকাছ উদ্দিন মাটি কাটার কাজ করতেন, সেই এলাকায় গত চার বছর আগে বড়ছড়াতে জয়বাংলা বাজার নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে বাজারে রয়েছে ৮০০ দোকান। প্রতিটি দোকানের জায়গা বিক্রি করেছেন ৬০ হাজার টাকায়।

সে বাজারেই বর্তমানে তার রয়েছে কয়েকটি বিলাস  ভবন , তিনতলা বাড়ি। শুধু তাই নয় বাজারের জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় করে আনার নাম করে প্রতি দোকান হিসেবে নেয়া হয়েছে ৮০০০ টাকা।  নিজের এলাকা ছাড়াও সুনামগঞ্জ জেলা শহরে আলকাছ উদ্দিনের রয়েছে  একাধিক বাড়ি-মার্কেটসহ অসংখ্য জায়গা। সম্প্রতি সুনামগঞ্জের নবীনগরে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে একটি হাসপাতাল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে তার।

এছাড়ারাও সুনামগঞ্জের পার্শ্ববর্তী হালুয়ারঘাট এলাকায় রয়েছে বিশাল দুটি ইটা খোলা। যে আলকাছের এক সময় দিনাতিপাত করতেই কষ্ট হতো কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি আজ শত শত কোটি টাকার মালিক। তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির নামে শত শত কোটি টাকা চাঁ’দা উত্তোলন করলেও কোনদিন সমিতি এলাকার রাস্তাঘাটের কোনো উন্নয়ন করেননি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সম্প্রতি চালু হওয়া শুদ্ধি অভিযানের মধ্যেই এমপি রতনসহ একাধিক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে দু’র্নীতি দ’মন ক’মিশন। এই অনুসন্ধানেই তথ্য মেলে রতন বিদেশে অর্থ পা’চারসহ নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। এরই সূত্র ধরে গত ২৪শে অক্টোবর দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখায় চিঠি পাঠানো হয়।

ওদিকে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণ মেলায় এমপি রতনের দ্বিতীয় স্ত্রী তানভি ঝুমুর চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে এমপি রতনের প্রভাবে ও তদবির করিয়ে তিনি তরং প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ডেপুটেশনে আসেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার তেঘরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে মাত্র একদিনের ছুটি নিয়েছিলেন তানভী ঝুমুর। অথচ এরপর থেকে গত ১০ মাস ধরে বিদ্যালয়ে যাননি এই শিক্ষিকা। অথচ বেতন-ভাতা সবই ঠিকমত তুলেছেন তানভী ঝুমুর।

নানা অভিযোগের বিষয় আলোচনায় আসায় এমপি রতন নিজেকে আড়ালে নিয়ে যান। দলীয় কোন কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন না। মধ্যনগরে একটি কর্মসূচিতে অংশ নিতে গেলে স্থানীয় নেতাকর্মীরাই মঞ্চ থেকে তার ব্যানার নামিয়ে দেন। পরে তিনি সেখানে যাননি। সরজমিন খবর সংগ্রহের সময় তার নির্বাচনী এলাকায় যোগাযোগ করে এমপি রতনকে পাওয়া যায়নি। পরে বক্তব্য নেয়ার জন্য টেলিফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 271
    Shares