একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : গাজীপুরের মনোনয়ন যুদ্ধে কিছু নতুন মুখ

১৪ views
গাজীপুরের মনোনয়ন যুদ্ধ

গোপালগঞ্জের পর গাজীপুরকে আওয়ামী লীগ তাদের ঘাঁটি মনে করে। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে এখানে বরাবরই জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অতীতের সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকবে বলে মনে করে ক্ষমতাসীন দলটি।

গাজীপুরের পাঁচটি সংসদীয় আসনে (১৯৪, ১৯৫, ১৯৬, ১৯৭ ও ১৯৮) সব দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তৃণমূলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। তবে বেশ আত্মবিশ্বাসী বিএনপি এবার আওয়ামী লীগের এই দুর্গে হানা দিতে চায়। বিএনপির নেতারা বলছেন, গাজীপুরে জয়ী হয়ে তাঁরা প্রমাণ করতে চান, এই সরকারের প্রতি মানুষের আর আস্থা নেই।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র বিপুল ভোটে জয়লাভ করাই তাদের আত্মবিশ্বাসের প্রধান কারন হিসেবে মনে করছেন বিশিষ্টজনেরা।

গাজীপুরে আওয়ামী লীগের বড় ভোটব্যাংক থাকায় বিগত স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে। ১৯৯১ সালের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসনে (সদর ও টঙ্গী) কখনো বিএনপি জয় পায়নি। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুরের বাকি চারটি আসনেও জয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। তবে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে তিনটি আসন পেয়েছিল বিএনপি। আর বর্তমানে গাজীপুরের পাঁচটি আসনই আওয়ামী লীগের দখলে। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সবকটি আসনে পুনঃরায় জয়ের স্বপ্ন দেখছে। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি হারানো আসনগুলোসহ পরিধি বৃদ্ধি করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাবে। মূলত সবকটি আসনেই ভোটযুদ্ধ হবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।

এদিকে বসে নেই জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় পার্টি। জামায়াত নিজেদের প্রতীক দাড়িপাল্লা ব্যবহার করতে না পারলে স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহনের গোপন প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা গণসংযোগ শুরু করেছেন। এ আসনের সর্বত্র মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ডিজিটাল ব্যানার শোভা পাচ্ছে। মহাসড়কে দু’পাশে গাছে গাছে রঙ-বেরঙের বিলবোর্ড ঝুলছে। মূলত মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অনেকে পোস্টার, ব্যানার সাঁটিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে নিজেকে জানান দিচ্ছেন। পাশাপাশি তৃণমূল নেতাদের খুশি করতেও নানা তৎপরতা শুরু করেছেন। মনোনয়ন পেতে এলাকায় জনসংযোগের পাশাপাশি এসব প্রার্থীরা দলের হাইকমান্ডের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

গাজীপুরের সংসদীয় পাঁচটি আসনে এবার মনোনয়ন যুদ্ধে কিছু নতুন মুখ দেখা যাচ্ছে। প্রধান দুই দলেই মনোনয়ন প্রত্যাশী একাধিক নেতা। তাই নানা হিসাব-নিকাশ করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা তাদের পথ চলার চেষ্টা করলেও বর্তমান সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার হিসেবও কষছেন আগামি নির্বাচনের ভোটাররা।

গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর ও গাজীপুর মহানগর আংশিক)
এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি এবারও প্রার্থী হতে চাচ্ছেন। নবম সংসদে এই আসন থেকেই তিনি প্রথম সাংসদ নির্বাচিত হন।

এছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম বাবুল ও কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন শিকদার মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

অন্যদিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. মুজিবুর রহমান ও মো. হুমায়ুন কবির খান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকের মনোনয়ন প্রত্যাশী।

১৯৯১ সাল থেকে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। পরবর্তীতে তিনি ছেলের কর্মকান্ডের জন্য দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার হন।

অপরদিকে জেলার জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার আবদুস ছালাম লাঙলের প্রার্থী হতে পারেন।

গাজীপুর-২ (গাজীপুর মহানগর আংশিক ও গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট)
এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রয়াত সাংসদ ও শ্রমিক নেতা আহসান উল্লাহ মাস্টারের ছেলে মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি এবারও মনোনয়ন চাইবেন। আহসান উল্লাহ মাস্টার ২০০৪ সালের ৭ মে খুন হলে ওই বছরই অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে রাসেল নির্বাচিত হন। গত ২০০৮ সালে ও ২০১৪ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খানও নৌকার মাঝি হতে আগ্রহী।

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক সাংসদ ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো. হাসান উদ্দিন সরকার। শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি মো. সালাহ উদ্দিন সরকার ও টঙ্গীর সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহান শাহ আলম প্রার্থী হবেন বলে নির্বাচনী মাঠে প্রচার রয়েছে। এছাড়া অধ্যাপক এমএ মান্নান পুত্র এম মঞ্জুরুল করিম রনিও রয়েছেন সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায়।

অপরদিকে গাজীপুর মহানগর জাতীয় পার্টির সভাপতি ও কেন্দ্রীয় জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবদুস সাত্তার মিয়া এবার লাঙল কাঁধে নিতে চান।

গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর-গাজীপুর সদর আংশিক)
শ্রীপুর, গাজীপুর সদর উপজেলার মির্জাপুর, ভাওয়ালগড়ও পিরুজালী ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত গাজীপুর-৩ সংসদীয় আসন। এ নিয়ে টানা পাঁচবার আসনটিতে আওয়ামী লীগের হয়ে রাজত্ব করছেন বর্তমান সংসদ সদস্য এডভোকেট মো. রহমত আলী। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি সম্ভবত আর ভোটের মাঠে লড়বেন না। তাই বিকল্প হিসেবে প্রবীণ এ নেতার উত্তরাধীকারী অ্যাডভোকেট জামিল হাসান দুর্জয় অথবা মেয়ে রোমানা আলী টুসিকে প্রার্থী করা হবে। এছাড়া সম্ভব মনোনয়ন প্রত্যাশী ইকবাল হোসেন সবুজ সংসদীয় এলাকায় তৃণমূল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে না পারায় জনগন থেকে অনেকটা দূরে রয়েছে বলে অনেক প্রবীণ নেতাদের ধারণা। তিনি গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক শ্রীপুর উপজেলা চেয়ারম্যান থাকলেও ছাত্রলীগ নেতা আল-আমিন হত্যায় অভিযুক্ত। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনেও তিনি এ আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। এছাড়া গাজীপুর জেলা আদালতের পিপি হারিছ উদ্দীন আহমদ মনোনয়ন প্রত্যাশী।

অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছে একাধিক। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসনে বর্তমান গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এমএ মান্নান বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। তিনি ওই নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে গাজীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। তিনি গাজীপুরের নগর পিতা হওয়ায় বর্তমানে গাজীপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সিনিয়র নেতার সঙ্কট তৈরী হয়েছে। তবে এমএ মান্নান গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও মেয়র প্রার্থী না হলে, সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রার্থী হতে পারেন বলে মনে করছেন তার সমর্থকরা।

এছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মো. সাখাওয়াত হোসেন সবুজ, ওলামা দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা এস এম রুহুল আমীন, শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহজাহান ফকির ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. আবদুল মোতালেব প্রার্থী হতে চান।

অপরদিকে গাজীপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মো. নূরুল ইসলাম জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে।

গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া)
এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কন্যা সিমিন হোসেন রিমি বর্তমানে এই আসনের সাংসদ। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় টিকিটে অংশ নিতে চান। তাজউদ্দীন আহমদের একমাত্র ছেলে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ ২০১২ সালে মন্ত্রিত্ব ও পরে সংসদ সদস্য থেকে পদত্যাগের পর উপনির্বাচনে তার বড় বোন রিমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও এ আসন থেকে তিনি এমপি হন। তবে আগামী নির্বাচনে সোহেল তাজ অংশ নিবেন বলে তাঁর সমর্থকরা আশাবাদী। তাজউদ্দীন আহমদের ভাই অ্যাডভোকেট আফসার উদ্দিন আহমেদ খানও ইতিপূর্বে প্রার্থী হয়েছিলেন। এবারও হতে পারেন।

অপরদিকে গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) আ স ম হান্নান শাহর মৃত্যুতে অভিভাবক সংকট তৈরী হয়েছে গাজীপুর জেলা ও কাপাসিয়া উপজেলায়। এই আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন প্রয়াত হান্নান পুত্র শাহ রিয়াজুল হান্নান। তবে হান্নান শাহর ভাই বিচারপতি শাহ আবু নঈম মমিনুর রহমানের নামও বিএনপিতে আলোচনায় আছে। তবে দীর্ঘদিন নিশ্চুপ থাকলেও দল থেকে বহিষ্কৃত তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দিন আহমেদ নির্বাচন করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

এছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে সম্ভাব্য প্রার্থী মো. মোস্তাফিজুর রহমান।

গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ ও গাজীপুর মহানগর-সদর আংশিক)
এ আসনে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে নারী ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপি আবারও প্রার্থী হতে চান। ২০০৮ সালেও তিনি এ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন।

এ ছাড়া ডাকসুর সাবেক ভিপি, সাবেক এমপি ও গাজীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আখতারুজ্জামানও মনোনয়ন চাইবেন। চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান দুলু (ফারুক) প্রার্থী হতে পারেন।

অন্যদিকে একক প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি এ কে এম ফজলুল হক মিলন। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অপরদিকে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মো. আজম খান এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন।

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...