প্রচ্ছদ বাংলাদেশ

বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরী

18
বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরী

টানা ৯ ঘণ্টা বৃষ্টি। হালকা থেকে মাঝারি। তাতেই তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগরের সড়ক, দোকানপাট, স্কুল মাঠসহ নিচু এলাকা। কমে গেছে যানবাহন চলাচল। বেড়েছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও কর্মমুখী মানুষের দুর্ভোগ। 

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মেঘনা তঞ্চঙ্গ্যা জানিয়েছেন, ১০ই সেপ্টেম্বর রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪৪ দশমিক ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আরো বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। নিয়মানুযায়ী সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য আবহাওয়া অফিস থেকে জানা গেলেও বৃষ্টি থেমে নেই চট্টগ্রামে। কখনও গুঁড়ি গুঁড়ি। কখনও মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হচ্ছেই। তবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা ৫ মিনিট পর্যন্ত হয়ে গেল মাঝারি আকারের ভারি বৃষ্টি, যা নগরবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকখানি। ভোর ৩টা থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি। এতে কিছুসংখ্যক নগরবাসী শান্তিতে ঘুমালেও কর্মমুখী মানুষের বিরাট একটি অংশ রোজকার মতো ভোরে হাই তুলতে হয়। ছুটতে হয় কর্মস্থলের দিকে।

বিশেষ করে পোশাককর্মী ও সমপর্যায়ের বেসরকারি শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের। কিন্তু তাদের চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। সড়কজুড়ে হাঁটু থেকে কোমর পানি ডিঙিয়ে সকাল সাড়ে ৭টায় নগরীর বহদ্দারহাট মোড়ে নার্গিস নামের এক পোশাককর্মী জানান, তিনি চান্দগাঁও থানার ফরিদেরপাড়া এলাকায় থাকেন। বৃষ্টির কারণে নাস্তাও করতে পারেননি। ৮টার মধ্যে নগরীর অক্সিজেন এলাকার কারখানায় পৌঁছাতে হবে। কিন্তু ফরিদেরপাড়া সড়কের কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমর পানি ডিঙিয়ে বহদ্দারহাট মোড়ে আসতে ৪০ মিনিট সময় লেগেছে তার। অথচ এমনিতে ৫ থেকে ৭ মিনিটের পথ।

তিনি বলেন, বহদ্দারহাট মোড়েও হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন পর্যন্ত সড়কে বৃষ্টির পানি জমায় গাড়ি চলাচল করছে কম। তার মতো বিভিন্ন কারখানার তিন-চারশ’ পোশাককর্মী বহদ্দারহাটে দাঁড়িয়ে আছে বলে জানান নার্গিস আক্তার। নগরীর মুরাদপুর এলাকায় তানিম নামে ইপিজেডের এক স্পোর্টস কারখানার কর্মী বলেন, বৃষ্টিতে নগরীর কালুরঘাট থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়ক হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে কালুরঘাট কাপ্তাই রাস্তার মাথা, সিএন্ডবি, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, দেওয়ানহাট ও আগ্রাবাদের বিভিন্ন মোড়ে ৬-৭ হাজার কর্মজীবী মানুষ আটকা পড়েছেন। কেউ কেউ পানি মাড়িয়ে কর্মস্থলে ছুটতে গিয়ে শরীরের জামা-কাপড় ভিজিয়ে নাকাল হচ্ছে। সড়কের ১০নং বাসচালক আমির হোসেন জানান, ভাঙচোরা সড়কে পানি জমে যাওয়ায় গাড়ি চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন:  দৈহিক সম্পর্ক না করলে স্পর্শকাতর অন্তরঙ্গ ছবি সবার কাছে পাঠিয়ে দিব

ফলে নগরীর বেশিরভাগ সড়কে যানবাহন চলাচল কমে গেছে। তাতে দুর্ভোগ বেড়েছে যাত্রী সাধারণের। একইভাবে নগরীর বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, সদরঘাট, চাক্তাই, পতেঙ্গাসহ সব ক’টি সড়ক বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খেটে খাওয়া মানুষ নানা দুর্ভোগের শিকার হওয়ার খবর আসছে। শুধু তাই নয়, সকালে ছুটে চলা নগরীর সব ক’টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বাকলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফিয়া খানম নিহার মা তনিমা খানম বলেন, বৃষ্টির কারণে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার মাধ্যম শাহ আমানত সড়কে কোমর পানি জমে যায়। ফলে সবরকম যানচলাচল বন্ধ রয়েছে। প্রায় দেড় কেলোমিটার সড়ক পানি মাড়িয়ে এলেও বিদ্যালয় মাঠে গলা সমান আর বিদ্যালয়ের ভেতরে হাঁটু সমান পানি দেখা যায়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ফিরে যায়। কিন্তু আমার মেয়ের সমাপনী মডেল টেস্ট আজ। তাই বাধ্য হয়ে সাঁতরিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়েছে।

একইভাবে নগরীর অপর্ণাচরণ বালিকা বিদ্যালয়, বহদ্দারহাট পাউবোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আগ্রাবাদ জাম্বুরি মাঠ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সদরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সমশেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ আরো কয়েকটি বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের মাঠে হাঁটু থেকে কোমর পানি জমে যাওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। এছাড়া নগরীর কাপাসগোলা, বাদুরতলা, মুরাদপুর, কোতোয়ালি, বহদ্দারহাট, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদ ও হালিশহর এলাকার অধিকাংশ ভবনের নিচতলা ও দোকানপাট পানিতে তলিয়ে নানা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলে জানান ভুক্তভোগীরা। হালিশহর কে-ব্লকের বাসিন্দা হাজী দলিলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রামে আল্লাহর গজব পড়েছে। প্রস্রাব করলেও যেন হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকা।

অথচ আজ থেকে ২০ বছর আগেও এরকম পানি দেখা যায়নি। নগরীর মুরাদপুর এলাকার শাহ আমানত স্যানেটারির মালিক আবুল বাশার (৭২) বলেন, ছোট থেকে অনেক বন্যা দেখেছি। কিন্তু কোথাও চট্টগ্রামের মতো পানি জমে থাকা দেখিনি। বৃষ্টি হলেই পানি শুধু উপরের দিকে ফুলতে থাকে। পানি চলাচলের কোনো স্রোত দেখা যায় না। সব পানি যে কোনদিকে আটকে থাকে তাও বোঝা বা দেখা যায় না।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, নগরীর অপরিকল্পিত উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখলের কারণে বৃষ্টির পানি জমে যায়। পানি চলাচলের কোনো স্রোত দেখা যায় না। এ সমস্যা সমাধানে চউক, চসিক সমন্বিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আশা করি চট্টগ্রাম নগরবাসী দ্রুতই এর সুফল পাবেন।

শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...