প্রচ্ছদ আইন-আদালত

তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়ে গেল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন

41
তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়ে গেল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন

জমজমাট প্রচারের মধ্যেই হঠাৎ তিন মাসের জন্য স্থগিত হয়ে গেল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ভোটের নয় দিন আগে উচ্চ আদালতের এই নির্দেশের পর প্রার্থীরাও প্রচার স্থগিত করেছেন। সাভারের শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ বি এম আজহারুল ইসলাম সুরুজের এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রবিবার এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে হাইকোর্টের বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমেদের বেঞ্চ।

আগামী ১৫ মের ভোটকে সামনে রেখে রাজধানী লাগোয়া এই জনপদে ভোট নিয়ে দৃষ্টি রয়েছে সারাদেশেরই। সেদিন খুলনার পাশাপাশি এই মহানগরেও হওয়ার কথা ছিল ভোট। খুলনার তুলনায় এখানে ভোটারের সংখ্যা আড়াই গুণেরও বেশি, প্রায় সাড়ে ১১ লাখ।

হঠাৎ ভোট স্থগিতের খবরে চাঞ্চল্যের তৈরি হয়েছে নির্বাচনী এলাকায়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম এরই মধ্যে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার প্রচার স্থগিত করেছেন।

রিটকারীর যে আপত্তি

শিমুলিয়ার চেয়ারম্যান সুরুজের আপত্তি তার ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে। তবে তার রিট আবেদন গত ১০ এপ্রিল উচ্চ আদালতে উত্থাপিত হয়নি বলে খারিজ হয়।

সেদিন সুরুজের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ। তাকে সহায়তা করে এ কে এম এনায়েত উল্লাহ চৌধুরী ও ফারজানা শারমিন পুতুল।

সেদিন নাকচ হলেও আজ আবার আবেদন করেন শিমুলিয়ার চেয়ারম্যান সুরুজ। এবার তার পক্ষে ছিলেন সৈয়দ মো. রেজাউর রহমান ও বিএম ইলিয়াস কচি। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান।

শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ শিমুলিয়ার ছয় মৌজাকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করে জারি করা প্রজ্ঞাপন কেন আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছে আদালত।

রুলে চার সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় সরকার সচিব, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, স্থানীয় সরকার বিভাগের (সিটি করপোরেশন-২) উপসচিব, ঢাকা ও গাজীপুর জেলা প্রশাসক, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব (চলতি দায়িত্ব) ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

রেজাউর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগ শিমুলিয়া ইউনিয়নের ডোমনা, দক্ষিণ বাড়ৈবাড়ী, পশ্চিম পানিশাইল, দক্ষিণ পানিশাইল, শিবরামপুর ও ডোমনাগ মৌজাকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

তখনই আপত্তি জানান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজহারুল ইসলাম সুরুজ। স্থানীয় সরকার বিভাগ তার আপত্তি আমলে না নেয়ায় ২০১৫ সালে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি। তখন তার আপত্তি নিষ্পত্তি করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করতে বলে।

২০১৬ সালে পুরনো সীমানা অনুযায়ী শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হলে আজহারুল আবার জেতেন।

চলতি বছর ৪ মার্চ নির্বাচন কমিশন আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। যেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ওই ছয়টি মৌজাকে ফের গাজীপুর সিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর ৩১ মার্চ ভোটের তফসিল দেয় নির্বাচন কমিশন।

আরও পড়ুন:  আদালতের দেয়া ১৩ বছরের সাজার রায় বাতিল

রিটের পক্ষে শুনানি করা রেজাউর রহমান বলেন, ‘এখন ওই ছয় মৌজার ভোটার ঢাকার সাভারের একটি ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি গাজীপুর সিটি করপোরেশনেও পড়ে গেছে। এ কারণে এই রিট আবেদন করা হয়।’

‘যদি এক জেলার কোনো এলাকা অন্য জেলায় অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, তখন প্রশাসনিকভাবে প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু এখানে তা করা হয়নি। এজন্য আদালত আমাদের বক্তব্য শুনে নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছে।’

চার যুক্তিতে রিট

১. শিমুলিয়া ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা গাজীপুর সিটি করপোরশনে যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিষয়টি ঢাকা জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়নি।

২. এক জেলার এলাকা অন্য জেলায় অন্তর্ভুক্ত করতে প্রশাসনের নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি।

৩. এই ছয়টি মৌজার অধিবাসীরা বর্তমানে শিমুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভোটার ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভোটার। সেই হিসেবে তারা দ্বৈত নাগরিক।

৪. দ্বৈত নাগরিক হওয়াতে তাদেরকে দুইটি জায়গায় তাদেরকে কর দিতে হবে।

নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী যা বললেন

সাংবাদিকদেরকে রাষ্ট্রপক্ষ এবং নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী তৌহিদুর রহমান বলের, ‘নির্বাচন কমিশনকে স্থগিতাদেশের বিষয়টি জানানো হয়েছে।  কমিশনই আপিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।’

আপনারা আদালতে কী বলেছেন-এমন প্রশ্নে এই আইনজীবী বলেন, ‘আমরা আদালতে বলেছি একই বিষয়ে হাইকোর্ট ইতোপূর্বে মামলাটি নিষ্পত্তি করেছেন। তাই এ বিষয়ে পুনরায় মামলা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আদালত তিন মাসের জন্য নির্বাচন স্থগিত করে রুল জারি করেন।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন স্থগিত করে আদালত রুল জারি করেছেন। আপিলের বিষয়ে এখন নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।’

ঢাকা উত্তরে ভোট স্থগিত হয় হাইকোর্টের নির্দেশে

এর আগে উচ্চ আদালতে নির্দেশে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়রের পাশাপাশি রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে ১৮টি করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচনও উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়।

গত ৯ জানুয়ারি তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোটকে সামনে রেখে বড় দুই দল প্রার্থী বাছাইয়ের পর এই আদেশ জারি হয়।

কিন্তু ঢাকা উত্তরে সিটি করপোরেশনে যোগ হওয়া ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কোষাধ্যক্ষ আতাউর রহমান এবং বেরাইদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ভোট স্থগিত চেয়ে রিট করেন।

আর প্রার্থিতা জমা দেয়ার শেষ সময়ের আগের দিন ১৭ জানুয়ারি ঢাকা উত্তরে এবং পরে ঢাকা দক্ষিণে নির্বাচন স্থগিত করে হাইকোর্ট। প্রথমে তিন মাসের জন্য স্থগিতাদেশের কথা জানা গেলেও পরে নির্বাচন কমিশন জানায়, স্থগিতাদেশ দেয়া হয়েছে ছয় মাসের জন্য।

শেয়ার করুন :

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...