প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জেলা

যুবলীগ নেতা হত্যায় অভিযুক্ত ধর্মমন্ত্রীর ছেলে, তাই মামলা নিচ্ছে না পুলিশ

41
যুবলীগ নেতা হত্যায় অভিযুক্ত ধর্মমন্ত্রীর ছেলে, তাই মামলা নিচ্ছে না পুলিশ

ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগ নেতা সাজ্জাদ আলম শেখ আজাদ হত্যার ১৩ দিন পরও মামলা নেয়নি পুলিশ। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের ছেলে মোহিত উর রহমান শান্ত প্রধান আসামি; তাই এজাহার নথিভুক্ত করা হচ্ছে না। পুলিশ বলছে, তদন্ত করে মামলা নেওয়া হবে।

গত ৩১ জুলাই ময়মনসিংহের আকুয়ার নাজিরবাড়িতে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আজাদ শেখ। তাকে গুলি, গলা কেটে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আজাদের মা ও স্ত্রীর অভিযোগ, ধর্মমন্ত্রীর ছেলে ময়মনসিংহ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহিত উর রহমান শান্ত, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রাসেল পাঠান ও ধর্মমন্ত্রীর ভাতিজা মন্তু বাবুর নির্দেশে আজাদকে হত্যা করা হয়। মামলার এজাহারে তাদের আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের দাবি, রাজনৈতিক হয়রানি করতেই এজাহারে তাদের নাম দেওয়া হয়েছে।

হত্যার দু’দিন পর ২ আগস্ট ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় এজাহার দায়ের করেন নিহত আজাদের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার দিলু। তিনি এজাহারে মোহিত উর রহমান শান্তসহ ২৫ জনের নাম উল্লেখ করেন। কিন্তু এখনও এজাহারটি নথিভুক্ত করেনি পুলিশ। ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল ইসলাম বলেন, এজাহারে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে, তারা আসলেই হত্যায় জড়িত ছিলেন কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত করে মামলা নেওয়া হবে।

তদন্তসাপেক্ষে মামলা নথিভুক্ত করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়ার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মামলা নথিভুক্ত না করে পুলিশ দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে। আইনে খুনের মামলা না নেওয়ার কোনো সুযোগই নেই। একজন ব্যক্তি খুন হয়েছেন, তার মৃতদেহ পাওয়া গেছে, ময়নাতদন্ত করা হয়েছে; মামলা নিতে এর চেয়ে বেশি কারণের প্রয়োজন নেই আইনে। জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, হয়তো প্রভাবশালীদের নাম এসেছে বলেই মামলা নেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু আইন অনুযায়ী আসামি যে-ই হোক, পুলিশকে মামলা নিতে হবে। তার পর তারা তদন্ত করে দেখবে, যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হত্যায় জড়িত ছিলেন কি-না। তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেবে পুলিশ। হত্যার ঘটনায় মামলা নেওয়ার আগে তদন্তের সুযোগ নেই। মামলা না নেওয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ওসি মাহমুদুল হাসানের দাবি, আইনে মামলা গ্রহণের আগে তদন্তের সুযোগ রয়েছে এবং মামলা নথিভুক্ত না করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মামলা না নেওয়ার কারণ জানতে পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নিবাস চন্দ্র মাঝির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পুলিশ সুপারের (এসপি) সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এসপি সৈয়দ নুরুল ইসলামও জানান, এজাহার নথিভুক্ত না করার বিষয়টি সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অবহিত আছে। তিনি বলেন, এজাহারে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে, তাদের সংশ্নিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজাহারে বলা হয়েছে, একজন আসামি (মোহিত উর রহমান শান্ত) ফোনে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। আসলেই ফোনালাপ হয়েছে কি-না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। হত্যার নির্দেশের সত্যতা পেলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

আজাদের স্ত্রীর অভিযোগ, মন্ত্রীর ছেলেকে আসামি করায় মামলা নিচ্ছে না পুলিশ। মোহিত উর রহমান শান্তর অনুসারীরা তাকে এবং তার পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। পুলিশ তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে না।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগে ‘মন্ত্রী-মেয়র গ্রুপের’ বিরোধ অনেক দিনের। আজাদ একসময় মন্ত্রীপুত্রের অনুসারী ছিলেন। কয়েক মাস আগে তিনি পক্ষ বদলে ময়মনসিংহের পৌর মেয়র ইকরামুল টিটুর পক্ষভুক্ত হন।

আজাদ হত্যা মামলার এজাহারেও দাবি করা হয়েছে, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও জমি দখলের কাজে ব্যবহূত হতে চাননি বলেই আজাদ মন্ত্রীপুত্রের পক্ষ ত্যাগ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আজাদকে হত্যার পরিকল্পনা করেন মোহিত উর রহমান শান্ত। তবে এ অভিযোগ শুরু থেকেই নাকচ করে আসছেন মোহিত উর রহমান। তিনি হত্যাকাণ্ডের দু’দিন পর সমকালের সঙ্গে আলাপে বলেন, আজাদ চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে ছিলেন। এ কারণেই আজাদকে পরিত্যাগ করেন তিনি। প্রকাশ্য সভায় আজাদের গ্রেফতার ও বিচার দাবি করে বক্তব্য দিয়েছেন। আজাদ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মোহিত উর রহমান নিজেও খুনের বিচার দাবি করেন।

আরও পড়ুন:  ‘পয়সা লাগবে না চকলেট দেব, ভেতরে আয়’ ... এরপর

ময়মনসিংহ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আজাদকে নবগঠিত মহানগর যুবলীগের কমিটিতে পদ পাইয়ে দিয়েছিলেন শান্ত। আরেক যুবলীগ নেতা ফরিদ শেখের সঙ্গে দীর্ঘ বিরোধ ছিল আজাদ শেখের। ফরিদকেও এজাহারে আসামি করা হয়েছে।

ফরিদ শেখ মন্ত্রীর পরিবারের অনুসারী। আজাদের সঙ্গে বিরোধে ফরিদকে সমর্থন দিয়েছিলেন শান্ত। তাই মন্ত্রী পরিবারের আনুগত্য ছেড়ে মাস কয়েক আগে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুলের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন আজাদ। মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল ও মেয়র ইকরামুল হক টিটু একই বলয়ের নেতা। স্থানীয় রাজনীতিতে তারা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান ও শান্তর বিরোধী। ইকরামুল হক বলেন, আজাদকে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজন হত্যা করেছে। একই দাবি মোয়াজ্জেম হোসেনেরও। তাদের দু’জনেরই ইঙ্গিত মন্ত্রীপুত্রের দিকে।

আকুয়ার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, চুরিসহ আজাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ছিল। মন্ত্রীপুত্রের হাত ধরেই তিনি রাজনীতিতে আসেন। পরে বিরোধ সৃষ্টি হয়। কয়েক মাস আগে ধর্মমন্ত্রীর ছোট ভাই ও আকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্রয়াত চেয়ারম্যান আফাজউদ্দিন সরকারের কার্যালয়ে গুলি ছুড়েছিলেন আজাদ শেখ। মন্ত্রীর এলাকায় ‘মেয়র গ্রুপের’ রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলেছিলেন আজাদ। এর মধ্যে ২০ জুন আজাদের কার্যালয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সেদিনের সংঘর্ষে মন্ত্রীর দুই ভাতিজা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সব্যসাচী সরকার ও মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুর রাজ্জাক উষানকেও অংশ নিতে দেখা যায়।

আজাদের স্ত্রী জানান, বাড়ি ও কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় মামলা করতে চেয়েছিলেন আজাদ। কিন্তু পুলিশ মামলা নেয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক মাস ধরেই বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলছিল মন্ত্রীর অনুসারী ও আজাদের অনুসারীদের মধ্যে।

আজাদের স্ত্রী এজাহারে উল্লেখ করেন, ৩১ জুলাই অস্ত্র হাতে আসামিরা তাদের বাড়িতে আক্রমণ করে। প্রাণ বাঁচাতে আজাদ বাড়ি থেকে বের হয়ে দৌড়ে নাজিরবাড়ি মসজিদের দিকে যান। সেখানে তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে মিলন। গুলিবিদ্ধ আজাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আসামি নুরুল পিস্তল দিয়ে দুটি গুলি করে। আসামিরা আজাদকে সেখান থেকে জুবলি কোয়ার্টারের গলিতে তুলে নিয়ে যায়। আসামি রাজীব, রকি, ফজলু, রতন, শ্রাবণ ও মেহেদি আজাদকে মাটিতে চেপে ধরে। আসামি স্বপনের হাতে থাকা ছোরা নিয়ে আজাদের গলা কাটে মিলন। আসামি নুরুল ও রানা চাপাতি দিয়ে বুকে কুপিয়ে আজাদের কলিজা ও ফুসফুস ছিঁড়ে নিয়ে যায়।

জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রাসেল পাঠান জানান, হত্যাকাণ্ডের দিন আকুয়ায় ছিলেন না তিনি। শান্তও সেদিন ময়মনসিংহে ছিলেন না। তারপরও তাদের নাম এজাহারে দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাদের হয়রানি করতে মিথ্যা মামলা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

আজাদের মা সুফিয়া খাতুন বলেন, কয়েক মাস আগে থেকেই আজাদকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন শান্ত। মন্ত্রী পরিবারের বিরোধিতা করায় আজাদের কলিজা ছিঁড়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। খুনিরা আজাদকে হত্যা করে কলিজা ছিঁড়ে নিয়েছে। সুফিয়া খাতুনের দাবি, মন্ত্রীর ছেলের হুকুমেই তার ছেলেকে খুন করা হয়েছে।

শেয়ার করুন :
  • 3
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...