প্রচ্ছদ গল্প

একটি বাজে মেয়ের গল্প

300
একটি বাজে মেয়ের গল্প

রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো সজাগ দৃষ্টি নিয়ে গলি পাহারা দিচ্ছে । শীতের রাতে এগারোটা বাজতেই পাড়াটা কেমন শীতঘুমে কম্বল মুরি দিয়েছে । হয়ত জেগেই আছে আর কর্মকার বাড়ির পাঁচালীর গোঁড়ায় আগুন জ্বালিয়ে নিজেদের ঘর গরম করছে । সবিতার কতকিছু মনে হয় অন্ধকার বারান্দাটায় দাঁড়িয়ে ।কই কার বাড়ির মেয়ে প্রেম করছে , কার বাড়ির বউ পালিয়েছে দেখতে যান নাতো । তবু পাঁচ বাড়ির চোখ সর্বদা তাদের দিকেই থাকে যেন । গত পাঁচ বছর ধরে বড় মেয়ে শিপ্রার কাঁধেই সংসারের জোয়াল চাপিয়েছেন ।

আর দুটো মেয়ে রমা আর মিনু নেহাতই কিশোরী । এবছর উচ্চমাধ্যমিক দেবে রমা আর মিনু ক্লাস নাইন । একসময় ছেলেটাকে ভেবেছিলেন উদ্ধার কর্তা নারায়ণ ।শুধু কি মরলে পরে ছেলের হাতে আগুন পাওয়ার জন্যই ছেলে আকাঙ্খা করে মানুষ ! সব থেকে বড় সন্তান হয়েও মদ গিলে , জুয়া খেলে আর মেয়েবাজি করে বেড়ান ছাড়া কোন কাজেই লাগল না সংসারে ।পাড়ায় বলে বাবুগুন্ডা। শিপ্রার প্রাইভেট কোম্পানির চাকরীটাই ভরসা । আজকাল কিছু উপরিও আসে ।এবার গরমে ভেবেছে উপর তলাটায় হাত দেবে । নীচের তলা ভাড়া দিয়ে একটা আয়ের সংস্থান তো হবে । আজকাল শিপ্রারও খুব মুখ হয়েছে । টাকা চাইতে গেলে কথায় কথায় খোঁটা দেয় ।কিন্তু এটাও জানে শিপ্রার এখন অনেক টাকা । সবিতা জানতে চায়না এতো টাকা আসছে কোথা থেকে ।শুধু সময় থাকতে থাকতে সেই টাকার সৎ ব্যবহারটা করতে হবে । একদিন কলে জল নিতে গিয়ে পাশের মেয়েছেলেগুলোর ফিসফিসানি শুনেছিল – সবিতাদির বড় মেয়েটা লাইনে নেমে পরেছে মনে হয় । আরেকজন গালে হাতদিয়ে বলেছিল – ওমা অতো ভালো মেয়েটা বাজে হয়ে গেল ?সামনের বুক দুটো দেখবে , দেখলেই মনে হয় পুরুষ মানুষের হাত পরেছে । আলোচনায় ওরা এতো মত্ত ছিল যে পাশে দাঁড়ান সেই মেয়ের মা কে আর লক্ষ্য করেনি ।এখন অবশ্য বাড়ির মধ্যে কল চলে এসেছে । জলের জন্য লাইন দিতে হয়না । উননের ধোয়ায় চোখ জ্বলা নেই । ফ্রিজের ঠাণ্ডা জল । এই গরমে শিপ্রা বলেছে ঘরে এসি লাগিয়ে দেবে । সুখ , সুখ । চোখ ঝাপসা হয়ে আসে সবিতার – সে কি পাষণ্ড মা !সব রাগ গিয়ে পরে মৃত স্বামী শুভাশিসের উপর । কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সবাই কি এমন কুয়োয় ঝাঁপ দেয় ? কারখানার অবস্থা ভালো না । উৎপাদন নেই । প্রায়ই শুনত শুভাশিসের মুখে ।তিনমাস ধরে বেতন পায়নি । কিন্তু পাওনা গণ্ডা না মিটিয়ে এমন ঝুপ করে বন্ধ হয়ে যাবে তা কল্পনাতেও ভাবে নি কেউ । বাজারে ধার বারছিল । এতোগুলো পেট কি শান্ত থাকে ? বাবু কদিন গুন্দাবাজি করে এলো ইউনিয়নের লোকদের সাথে । মালিক, পুলিশ দিয়ে বাবুকে উঠিয়ে নিয়ে গেল তখন ইউনিয়নের দেখা নেই । তিনদিন পরে ছেড়ে দিল কিন্তু সারাগায়ে কালশিটে, মার খেয়ে পরে থাকল বিছানায় ।এতো বড় সংসারের কর্তা একমুখ দাড়ি নিয়ে হন্যে হয়ে দুয়ারে দুয়ারে কাজ খুঁজছে । কিন্তু কে দেবে পঞ্চাশ বছরের মানুষটাকে কাজ । রুগ্ন হার জিরজিরে মানুষটা সমানে ক্ষয়ে যাচ্ছিল ভিতর থেকে । প্রায় পাঁচবছর হতে চলল এখনও কুয়োটাকে দেখলে কেমন ভয় করে । সাত সকালে কাকের তীব্র আওয়াজে ঘুম ভেঙে ছিল সবিতার । কুয়োর কাছে যেতেই শুভাশিসের লাশটা ভেসে থাকতে দেখেছিল ।হয়ত গভীর রাতেই কাণ্ডটা ঘটেছে । শোকে সেই মুহূর্তে পাগল হলেও পরে রাগ, ঘেন্না জমা হয়েছিল। কাপুরুষের জন্য আর যাই থাকুক হৃদয়ের গভীরে ভালোবাসা থাকে না । সবিতার বুকটা চিন চিন করে ওঠে । শিপ্রা তখন কলেজের ফাইনাল ইয়ার । কটা টিউশন পড়িয়ে বোনদের আর নিজের পড়াশুনোটা ঠিক চালিয়ে নিয়ে গেছে । কলেজ শেষ হতেই একটা চাকরী জুটিয়ে নিয়েছে ।সেই সব দিনের কথা মনে পরলে ভয় করে । কোনোদিন একবেলা খাবার জোটেনি । আজ হোটেলে ভালোমন্দ খেতে যায় । ভাবলে কেমন স্বপ্ন লাগে । আত্মীয়রা বলে ছাব্বিশ বছর বয়েস হল বিয়ে দিয়ে দাও ।মাঝে মাঝে অনেক সুহৃদয় মানুষ তার ভাগ্না ভাইপোর সম্মন্ধ নিয়ে আসে । শিপ্রার জলন্ত রুপ দেখে পাড়ার ছেলেরাও উশখুশ করে । সবই নজরে আসে কিন্তু সবিতা জানে সংসারটা যার উপর দাঁড়িয়ে আছে তার সুখি সংসার করার অধিকার নেই । না , না থাকতে পারেনা ।দূরে কোথাও গির্জায় ঢং ঢং করে বারোটার ঘণ্টা বেজে উঠল । সাথে সাথে কয়েকটা কুকুর কান্না জুড়েছে । সবিতা গায়ের সালটা খামচে ধরল – কোথাও আবার মন দেয়নি তো কাউকে ?শরীর দিলে ক্ষতি নেই । মেয়েদের শরীর হল কাঠ কয়লা । যত পুরবে তত আঁচ বাড়বে । একদিন ছাই হয়ে যাবে । কিন্তু মনের পারদ কখন যে চড়বে ! অবশ্য মন দিলেও সে মন ভাঙতেও জানে । কেমন নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল সবিতার মুখে ।

ব্ল্যাক স্করপিও গাড়িটা বাইপাসের এক ধারে দাঁড়িয়ে আছে ।গাড়ির ভিতর ফুলস্পিডে এসি চলছে । – শিপ্রা আমি তোমায় ভীষণ ভালোবাসি । কথাগুলো এখন ভীষণ মেকি লাগে । মনে কোথাও ছাপ ফেলেনা । দুটো শরীর এখন ব্যস্ত । – এই কোম্পানির বড়বাবু, অবাঙালি। দিল্লীতে থাকেন ।নাম – সুরজ বারনওয়াল । বয়েস প্রায় পঞ্চাশ , পঞ্চান্ন । এখন শিপ্রার নরম বুকে আঁচর কাটছে ।প্রায় প্রতিমাসেই একবার করে ভিসিট করেন কলকাতার অফিসে । যাবতীয় কন্ট্রাক্ট ওনার হাত দিয়ে পাস হয় ।শিপ্রা পাঁচ বছর চাকরী করলেও এই তিনবছর ধরে শরীরী খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে । কোম্পানির বস বদলেছে তিনবার ।তাছাড়া কলকাতার অফিসের বড় সাহেবের সাথে মাঝে মাঝেই যেতে হয় হাওয়া বদলাতে । শিপ্রার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স আর অফিস দুটোই দিনদিন ফুলে উঠছে । সব কৃতিত্ব শিপ্রা কর্মকারের ।তবে শিপ্রাকে মানুষ করেছে অফিসের শর্মিষ্ঠাদি। – শিপ্রা মনে রাখবি যতদিন রুপ যৌবন আছে , যতটা পারবি ছিনিয়ে নিবি । কেউ তোকে একচুল জায়গা ছাড়বে না । কখনও মরবি না তাহলেই তো হেরে গেলি । না শিপ্রা হারতে আসেনি । ক্রমশ এই ছিনিয়ে নেওয়ার খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে । – তুমাকে আদর করতে বহুত ভালোলাগে ।এতো সফট আছো । এই কথাগুল এখন পুরন লাগে শিপ্রার । কৃত্তিম কিছু চুমু ছড়িয়ে দেয় সুরজ বারনোয়ালের বুকে । লোকটা তাতে শুয়োরের মতো ঘোঁত ঘোঁত করতে করতে নেমে যায় শিপ্রার নিম্নভাগে । শরীরটা এখন যন্ত্রের মতো । সেখানে কোন অনুভব নেই । সেখানে পর্যায় গুল গতে বাঁধা । কতটা উত্তেজনা প্রকাশ করলে পুরুষের ভাললাগে সেটাও জানা । এখন একজন দক্ষ খেলোয়াড় ।বাইপাসে গাড়িগুলো এক নিঃশ্বাসে ছুটে চলে যাচ্ছে । কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে । “তোমায় হৃদ মাঝারে রাখব ছেড়ে দেব না ” রিংটোন বাজছে শিপ্রার মোবাইলে ।মায়ের ফোন , বেজেই চলেছে । কিছুটা বিরক্ত হয়ে ঘড়ি দেখল – বারোটা বেজে গেছে । বারনোয়াল সাহেব এবার একটু তাড়াতাড়ি অনেক রাত হোল । উনি খুব মনোযোগ সহকারে কাজে ব্যস্ত এখন । শিপ্রা ফোনটা কেটে দিল । এমন মানুষ আগেও পেয়েছে কিছুতেই ছাড়তে চায়না । -যেকোনো মুহূর্তে পুলিশের জিপ আসতে পারে । রাতে বাইপাসে টহল দেয় । তাতে কাজ হল- এই তো হয়ে গেছে । – শিপ্রা তুমি কিন্তু তুমার ঠোঁটে চুমু খেতে দিলে না ।শিপ্রা অন্যমনস্ক হয়ে বলে -সবটাই তো বিলিয়ে দিয়েছি এটুকু থাক ।

আরও পড়ুন:  মধুর রাতের কথা

গলি পর্যন্ত গাড়ি পৌঁছয় না । বড় রাস্তার ধারে শিপ্রা নেমে গেছে । এখান থেকে দশমিনিট হাঁটা । রাতে দেরিতে বাড়ি ফিরলে আগে দাদা নিতে আসত গলির মোরে । এখন কেউ আসেনা । দাদা বলেছে – ওই মেয়ে লায়েক হয়ে গেছে । গলির বাঁকে ল্যাম্পপোস্ট বসবে বলে গর্ত করেছে । বড় রাস্তার আলোয় গলিটা একটু আলো পেয়েছে । গলির আঁধার কাটান ল্যাম্পপোস্টগুলো এখন অন্ধকারে মুখ লুকিয়েছে ।মনে হচ্ছে লোডশেডিং ।জনমানব শূন্য অন্ধকার রাস্তায় একটু গা ছমছম করছে । সারা পাড়া এখন ঘুমিয়ে কেউ তার জন্য জেগে নেই । হাইহিলের জুতোর খটাস খটাস আওয়াজ তুলে জোরে পা চালাল । সামনের একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে পরতে যাচ্ছিল মুখ থুবড়ে । অন্ধকার থেকে একটা শক্ত হাত ধরে ফেলল । অন্ধকার রাস্তায় টর্চের আলো পরল । – এতো দেরি করিস কেন ফিরতে ? গলাটা শুনে থমকে গেছে শিপ্রার জীবনের কাঁটা । এই মুহূর্তে খুব জড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল । না না যে সম্পর্ক আজ তিনবছর আগে নিজে হাতে ভেঙে দিয়েছে তার বুকে মাথা রেখে কাঁদা যায়না । শিপ্রা সংযত হয়ে বলল- কবে ফিরলে ? – আজ বিকেলে । দুদিনের জন্য এসেছি ।সৌম্যর নামটা ধরে খুব ডাকতে ইচ্ছে করছিল । কিন্তু চেষ্টা করেও পারল না । এখনও এই মানুষটার প্রথম ছোঁয়া বাঁচিয়ে রেখেছে । এখনও পর্যন্ত কাউকে সেই ঠোঁট ছুঁতে দেয়নি । – শিপ্রা এখনও কি তুমি ওখানেই চাকরী করো ? – ওখানেই করি কিন্তু উন্নতি হয়েছে । – সেতো বুঝতেই পারছি । সৌম্য তুমি কি আমায় ………না কথাটা আর পুরো করতে পারল না । বাজে মেয়ে শব্দটা এতো সহজে বলা যায়না । -শিপ্রা তোমার বাড়ি চলে এসেছে । সেই তিনবছর আগের রাতটা মনে পরল । এমন ভাবেই শিপ্রাকে বিয়ে বাড়ি থেকে বাড়ি পৌঁছে ছিল মাঝরাতে । এই নিঝুম পাড়ার অলক্ষ্যে শিপ্রার ঠোঁটে প্রথম চুমু খেয়েছিল । সেই স্বাদ এখন শিপ্রার গলায় আটকে আছে । কি ভীষণ কষ্ট হচ্ছে । সৌম্যর মুখে ল্যাম্পপোস্টের আলো পরল । কারেন্ট এলো । পাড়াটা যেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে পাশ ফিরল । শিপ্রা এখন সেই ভিতু লজ্জাবতি লতা নয় । সব কিছুতে ভীষণ পারদর্শী । সৌম্যকে এখনি সেই কাঙ্খিত সুখ দিতে পারে ।একদিন সৌম্যই তো দিতে চেয়েছিল অনেক অনেক সুখ । রেলের চাকরী , কোয়ার্টার এমন স্বামীর সংসার সবাই শিবথানে মানত করে । শিপ্রা রাজরানি হয়ে থাকত । এই নরক থেকে দূরে নিজের সুখি জীবনে । – আজ আসি । পরশু ফিরে যাব ।সৌম্য যেন আরও কিছু বলতে চায় ।নাকি শিপ্রা শুনতে চায় অন্য কোনো কথা । – শিপ্রা ঘরে আয় । প্রতিবার এই মানুষটার জন্য শিপ্রার সব তছনছ হয়ে যায় । – যাও তোমার মা ডাকছে । সৌম্য অন্ধকার আলোয় মিলিয়ে যাচ্ছে ।

শেয়ার করুন :
  • 2
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...