প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য

৭৫ এ তাঁদের ভূমিকা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পক্ষে

366
৭৫ এ তাঁদের ভূমিকা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পক্ষে

স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পরই বাংলাদেশের স্বাধীনতার অবিসংবাদিত নায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদল সেনাসদস্যের হাতে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদ, মেজর জিয়া, মোশতাকসহ কয়েকজনকে দায়ী করা হয় এবং বাংলাদেশের মাটিতে তাঁদের নাম উচ্চারণ করা হয় ঘৃণা সহকারে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়ে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছে আদালত। কিন্তু জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে অনেক লোকের ভূমিকা ছিল রহস্যময়, যা এখন পর্যন্ত উন্মোচিত হয়নি। এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যায় এদের সংশ্লিষ্টতা বা হত্যাকাণ্ডের পর এদের ভূমিকা নিয়ে সাধারণত কথাও বলা হয় না। কিন্তু পরবর্তীতে এই ব্যক্তিদের কার্যক্রমে বোঝা গেছে ’৭৫ এ তাঁদের ভূমিকা ছিল বঙ্গবনধু হত্যাকাণ্ডের পক্ষে।

বঙ্গবনধু হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যারা রহস্যময় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ড. কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় ড. কামাল হোসেন লণ্ডনে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের জীবিত দুই সদস্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তখন বেলজিয়াম থেকে জার্মানি গেছেন। এক পর্যায়ে ড. কামাল হোসেন জার্মানিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় শেখ রেহানা ড. কামালকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ক্যাম্পেইন করার অনুরোধ করেন, অনুরোধ করেন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পরিবারের সেই দুঃসময়ে কামাল হোসেন কোনো কিছু করেননি। সাহায্য করেননি সদ্য পরিবার হারিয়ে শোকে দিশেহারা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ত্বরান্বিত করতে কোনো ভূমিকাই রাখেননি তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল এম. এ. জি. ওসমানী। এক সময়কার মুক্তিযোদ্ধা ওসমানী বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পরে খুনিদেরকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর মেজর ডালিম যখন ভোরে রেডিও স্টেশন থেকে বঙ্গবন্ধুর হত্যা সংবাদ প্রচার করছিলেন সে সময় সেখানে জেনারেল জিয়া ও কর্নেল (অব.) তাহের ছাড়াও জেনারেল (অব.) আতাউল গণি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে মোশতাকের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্কের কথা জানা যায় যায়। মোশতাকের ডিফেন্স অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর ওসমানীর তত্ত্বাবধানেই পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসানো শুরু হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। ইত্তেফাকের বিখ্যাত সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার পুত্র তিনি। সংবিধান সংস্কার করে যখন বাকশাল প্রতিষ্ঠা হয় তখন মইনুল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ইত্তেফাক পত্রিকায় লেখা হয়েছিল – ‘প্রত্যুষে বেতারে এই ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়া একটি আকাঙ্ক্ষিত সূর্যরাঙ্গা প্রভাত দেখিতে পায়।‘ সে সময় ইত্তেফাকের কর্ণধার ছিলেন এই মইনুল হোসেন।

আরও পড়ুন:  মানবতাবাদী ও জাতীয় জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ

অথচ ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুই মইনুল হাসানকে আওয়ামী লীগের টিকেটে নির্বাচিত করেছিলেন। তাঁর পিতা মানিক মিয়াও ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর এসব উপকারের কথা মনে রাখেননি মইনুল। ‘৭৫ এর ১৫ আগস্টের পরে খন্দকার মোশতাকের দলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

এই কয়েকজন ছাড়াও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ণ্ড প্রশ্নে আরও অনেকের ভূমিকা রহস্যজনক। একসময় যারা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন, ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, তাঁরা অনেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ঘোরতর বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ বিরোধী হয়ে যান। আর এদের মধ্যে যারা জীবিত আছেন তাঁরাই এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন। যেমন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কথাই ধরা যাক। ২০০৭ সালে ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের অগণতান্ত্রিক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। সে সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এছাড়া বলা যায় ড. কামাল হোসেনের কথা। বর্তমানে রাজনৈতিক দল গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ বিরোধী বক্তব্যের জন্য খ্যাত। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের অন্যতম সমালোচক।

এই মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিরা বিভিন্ন দেশে বসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থা কাছে তথ্য আছে। কিন্তু শুধু প্রত্যক্ষ খুনিরাই যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছেন তা নয়, ’৭৫কে ঘিরে যাদের ভুমিকা রহস্যময় ছিল তাঁদের কর্মকাণ্ডেও দেশবিরোধী সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে এই রহস্য মানবদের ভূমিকা কী ছিল তা এখনো উন্মোচিত হয়নি। এই কারণে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন সময়ে একটি নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করার মাধ্যমে ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের পূর্বাপর কার কী ভূমিকা ছিল তা খুঁজে বের করার দাবি উঠেছে।

জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গতকাল বুধবার টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানাও বলেছেন এই বিষয়ে একটি পুর্ণাঙ্গ কমিশন হওয়া উচিত। এতে করে ’৭৫ এর ১৫ আগস্টের পরে কার কী ভুমিকা ছিল তা পরিস্কার হয়ে যাবে।

শেয়ার করুন :
  • 71
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...