প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের পাঁচ ফ্যাক্টর

19
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের পাঁচ ফ্যাক্টর

চলতি বছরের শেষে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য অনেক দিন আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছিল আওয়ামী লীগ। আর এই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল নির্বাচনে ভোটের ফ্যাক্টর হিসেবে উন্নয়নের প্রচারকে মডেল ধরে। তবে সময়ের স্রোতে অনেক দেশের পরিস্থিতি অনেক পাল্টেছে। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণায় দেখা গেছে উন্নয়ন নয় বরং আগামী নির্বাচনে ভোটের জন্য ফ্যাক্টর হয়ে দেখা দিয়েছে পাঁচটি বিষয়। এই ফ্যাক্টরগুলো নিয়ে কোনো দলের অবস্থানই নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে প্রভাব ফেলবে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফ্যাক্টরগুলো নিয়ে এখন সব দলই মোটামুটি কাজ শুরু করেছে। আওয়ামী লীগও পূর্ব পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে পাঁচ ফ্যাক্টর নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এবারের নির্বাচনে ভোটের ফ্যাক্টরগুলোর মধ্যে আছে,

১. তরুণ ভোটার এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে থাকা ভোটাররাই নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়।  একসময় তরুণ ভোটারদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। তবে বর্তমানে এই অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। আর এরই মধ্যে তরুণ ভোটারদের ফেরাতে উদ্যোগী আওয়ামী লীগ। তরুণদের আবার আওয়ামী লীগের প্রতি আকৃষ্ট করতে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সরব হয়েছে তথ্য-প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ দলটির বিশেষ টিম।

২. কোটা নিয়ে অবস্থানও এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলবে। চলতি বছরের শুরু থেকেই কোটা নিয়ে সরব হয়েছিল শিক্ষার্থীরা। অনেক আন্দোলন হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনো নানা কর্মসূচি ঘোষণা চলছে। শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী ছাড়াও এই ইস্যু নিয়ে দেশের সকল শ্রেণি পেশার শিক্ষিত মানুষের মধ্যে আগ্রহ আছে। সব মিলিয়ে কোটা সম্পর্কে আগ্রহী ভোটারের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আর এই বিপুল ভোটারের আগ্রহের কথা চিন্তা করেই সবগুলো রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কোটা সংস্কার নিয়ে অবস্থান তুলে ধরবে বলে জানা গেছে। আর এই অবস্থানই ঠিক করে দেবে বিপুল ভোট কোন দিকে যাচ্ছে।

৩. সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশজুড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। এই আন্দোলনও শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করেছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলন একরকম শেষ হলেও এ নিয়ে সচেতন এখন সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। এই আগ্রহ থেকেই মানুষ এখন জানতে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে সড়ক নিরাপদে কী পদক্ষেপ নিয়ে। তাই নিরাপদ সড়ক নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোও অঙ্গীকারও নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। আর রাজনৈতিক দলগুলোও জনসাধারণের আগ্রহের কথা মাথায় রেখে নিরাপদ সড়কের জন্য তাদের প্রস্তাবগুলো সাজাচ্ছে।

৪. ব্যবসায়ীরাও নির্বাচনের অন্যতম ফ্যাক্টর হবেন। ব্যবসাবান্ধব নীতি, ব্যাংকের সুদের হারসহ ব্যবসা সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় তাই নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করেই সরকার অনলাইন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পিছিয়েছে। সুদের হারও এক অংকে নামিয়ে আনার বিষয়টিও বাস্তবায়নে দ্বারপ্রান্তে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও ব্যবসায়ীদের আকৃষ্টে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে।

আরও পড়ুন:  শেখ হাসিনার কাছে নাজমুল হুদার ৫০টি আসন দাবি

৫. এবারের নির্বাচনে ভোটের অন্যতম ফ্যাক্টর হবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান। দুর্নীতি নিয়ে মানুষ এখন সচেতন। দেশের উন্নতির অন্যতম অন্তরায় হিসেবেই বিষয়টিকে দেখে সাধারণ মানুষ। দুর্নীতির বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বরাবরই কঠোর অবস্থানে। আর একাদশ জাতীয় নির্বাচনে খসড়া ইশতেহারেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের এই অবস্থানের কথা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে, এবার ক্ষমতায় এলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে আওয়ামী লীগ। একই সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। তবে এক্ষেত্রে বিএনপি শুরুতেই ব্যাকফুটে। কারণ বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি দায়ে দণ্ডিত হয়ে পাঁচ বছরের জন্য কারান্তরীণ। আবার, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লন্ডনে পলাতক তারেক জিয়া দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবেই খ্যাত। আর গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে দুর্নীতিবাজদের দলে রাখার বিষয়টি জায়েজ করেছে বিএনপি। বিএনপির ইশতেহারে যে কথাই থাকুক, তা যে শুধুই কথা তা দেশের মানুষকে নতুন করে বুঝাতে হবে না। দুর্নীতিকে আশ্রয় করে একটি দল কীভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে।

এর বাইরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিও প্রভাব ফেলবে এবারের নির্বাচনে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে-তার উপরই নির্ভর করবে কোনো দলের প্রতি ভারত সরকারের অবস্থান। আর এর প্রতিফলন ঘটবে নির্বাচনে দেশটির ভূমিকায়। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কেমন হবে, এ নিয়ে রাজনৈতিক দলের অবস্থানই তাঁর পক্ষে নির্বাচনে দেশটির প্রভাব ঠিক করে দেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ভারতে। আর এর সঙ্গে কূটনৈতিক অবস্থানে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। এই সরকার ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে দমননীতি নিয়ে ভারতের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা শূন্য করেছে। এজন্য সরকারের প্রতি ভারত যে কৃতজ্ঞ তা বহুবারই প্রকাশ করেছে। কিন্তু বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো নির্বাচনী ইশতেহারে জঙ্গিবাদ দমনে সরাসরি কোনো অঙ্গীকার করেনি। তবে এবার বিএনপিও এ বিষয়ে অঙ্গীকার করতে পারে। কারণ, গত কয়েকমাসে ভারতের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে কয়েকদফা বৈঠক করেছে বিএনপি। এর প্রতিফলন এবারের নির্বাচনের জন্য নেওয়া বিএনপির ইশতেহারে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এছাড়া সম্প্রতি মার্কিন-বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন বন্ধেও আওয়ামী লীগকে সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এছাড়া মানবাধিকার ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বেশ সরব। তাঁদের জন্যও সুস্পষ্ট কিছু থাকতে হবে।

আগামী নির্বাচনে ভোটের ফ্যাক্টরগুলো কাজে লাগিয়ে যারাই ইশতেহার গড়ে তুলতে পারবে তারাই ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবে। কোন দল জনগণের চাহিদার কতোটা ইশতেহারে রাখতে পারছে তা জানা যাবে শিগগিরই। তফসিল ঘোষণার আগে পরে আসতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার।

শেয়ার করুন :
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...