প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জেলা

বিমানবন্দরটির রানওয়ে এখন চাতাল

25
বিমানবন্দরটির রানওয়ে এখন চাতাল
ছবি : সংগৃহীত

সবুজ ঘাসে ঘেরা রাস্তার দুই পাশ। চারদিকে চাষ করা জমি আর মাড়াই করা ভুট্টার ডাঁটা। পাট, ধানে বিস্তীর্ণ পুরো এলাকা। দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে নিমিষেই। চাষাবাদের জমির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে দীর্ঘ পাকা মাঠ, যেখানে মাড়াইয়ের পর শুকানো হয় ভুট্টা, ধান ও গম। একপাশে সারি সারি স্তূপ করে রাখা আছে ভুট্টার ডাঁটা আর শুকনো খড়। আরেক পাশে ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষে ব্যস্ত কয়েকজন যুবক। দেখে যে কেউ অবাক হবেন। এলাকাটি দেখে বোঝার উপায় নেই এটি খামারবাড়ি, না অন্য কিছু। পাকা মাঠের আরেক পাশে রয়েছে তিনতলা একটি দালান।

এর ওপর গ্লাসে ঘেরা এক ওয়াচ টাওয়ার। আসলে সেটি এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) টাওয়ার। তবে এই পাকা জায়গাটি কোনো ভুট্টা শুকানোর কিংবা চাষাবাদের জন্য নয়। প্রায় ২৭৬ একর জায়গাজুড়ে সেখানে আছে ৬ যুগের বেশি সময়কার স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী স্থানটি। এটি ঠাকুরগাঁও শিবগঞ্জ বিমানবন্দর। এখনো সেই বিমানবন্দরের স্থাপনা, রানওয়ে, রাডারসহ সব কিছু আছে। তবে সেই রানওয়ে এখন শুধু চাতাল। জানা যায়, ১৯৪০ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা তৈরি করে এই বিমানবন্দর। উড়োজাহাজ ওঠানামায় একসময় জমজমাট থাকত এটি।

ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে এর অবস্থান। বিমানবন্দরটির রানওয়ে ছিল ৩টি এবং সাব-রানওয়ে ছিল ১০টি। পাকিস্তান শাসনামলের শুরুতে এটিকে ‘আর্মি স্টেট’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সিভিল এভিয়েশন বিভাগ আরও ১১০ একর জমি বর্ধিত করে সেখানে স্টল ভবন নির্মাণ ও রানওয়ে বর্ধিত করে বিমানবন্দরটি চালু করে। তখন ত্রাণসামগ্রী পরিবহনসহ জরুরি কাজে এই বিমানবন্দর ব্যবহার করা হতো।

১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে এর যোগাযোগ ছিল এবং ওই সময় ঢাকা-ঠাকুরগাঁও রুটে নিয়মিত বিমান চলাচল ছিল। এরপর তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮০ সালের দিকে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দরটি ফের চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও বিদ্যুতায়নের কাজসহ রানওয়ে মেরামতের কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে লোকসানের অজুহাতে ১৯৮৪ সালে তা চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে যায়। সেটি এখন ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ফসল শুকানোর কাজে। এখানে আগের মতো আর উড়োজাহাজ ওঠানামা করে না। রানওয়ের দুই পাশের জায়গা রীতিমতো ফসল ফলানোর মাঠে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন:  দোতলা মাটির বাড়ি তাও আবার ১০৮ কক্ষের

বিমানবন্দরটি পুনরায় চালুর কয়েক দফা উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষমেষ সেটি আর হয়ে ওঠেনি বলে জানান স্থানীয়রা। ১৯৯৪ সালে বিমানবন্দরটি ফের চালুর জন্য সংস্কার করা হলেও কার্যক্রম শুরু করা হয়নি। এয়ার বেঙ্গল ও বোরাকসহ ৬টি বেসরকারি সংস্থা ঢাকা-ঠাকুরগাঁও রুটে স্টল বিমান সার্ভিস চালু করার জন্য বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি করলেও তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী শামসুদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, তখন চলে ইয়াহিয়ার শাসনামল। প্রায় ছেলেবেলা তখন। এক আত্মীয়ের হজযাত্রায় বিদায় জানাতে তিনি ওই বিমানবন্দর থেকে ঢাকা তেজগাঁও বিমানবন্দর পৌঁছেছিলেন।

এর কয়েক বছর পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে সেটি। এলাকার মানুষ এখন সেখানে খেলার মাঠ, ভুট্টা, ধান, গম, সরিষা শুকায়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, অনেক সম্ভাবনা থাকার পরও নানা জটিলতার কারণে দীর্ঘদিনেও চালু করা সম্ভব হয়নি ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ৩৪ বছর ধরে পরিত্যক্ত বিমানবন্দরের স্টল ভবনের দরজা-জানালা নষ্ট হয়ে গেছে। উঠে গেছে রানওয়ের কার্পেটিং। চুরি হয়ে গেছে সীমানা পিলারসহ তারের বেড়া। গোচারণভূমিতে পরিণত হওয়া এ বিমানবন্দরের রানওয়েতে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে সেখানে ট্রাক্টর গ্যারেজ এবং মেশিন বসিয়ে মাড়াই করা হচ্ছে ভুট্টা। এটি ব্যবহার করছে যে যার মতো। স্টল ভবন ঘেঁষে শুকানো হচ্ছে ভুট্টার ডাঁটা। কয়েকজন শ্রমিক জানান, আশপাশে কোনো চাতাল না থাকায় এলাকার লোকজন এটিকেই চাতাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।

কেউ কিছু বলে না এ জন্য যে যার মতো করে ব্যবহার করছে। ধান, গম, ভিজা পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য শুকানো হয় এখানে। অথচ এটি চালু করা গেলে একদিকে যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হতো, অন্যদিকে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে যোগ হতো নতুন মাত্রা— বললেন লিয়াকত আলী নামে এক স্কুলশিক্ষক। জানা যায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ বিমানবন্দরটি আবারও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে সেই উদ্যোগও ভেস্তে যায়। পরবর্তী সময়ে বিমানবন্দরের ১০০ একর জমি স্থানীয়দের কাছে লিজ দেওয়া হয়।

শেয়ার করুন :
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...