প্রচ্ছদ বাংলাদেশ

সুষ্ঠু, অবাধ ও সব দলের প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন আয়োজনে পাঁচ প্রস্তাব

37
সুষ্ঠু, অবাধ ও সব দলের প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন আয়োজনে পাঁচ প্রস্তাব
বাঁ থেকে) মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার অ্যালিসন ব্লেক, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত রেনজি তিরিংক । ছবি : সংগৃহীত

নির্বাচনকালীন সময়ে একটি সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব করতে যাচ্ছে বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রভাবশালী চার দেশ ও একটি সংস্থার কূটনীতিকরা। গতকাল শুক্রবার মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের উদ্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপানের এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কূটনীতিকদের এক বৈঠকে এমন প্রস্তাব উঠেছে।

বৈঠকে সহিংসতামুক্ত, সব দলের অংশগ্রহণমূলক এবং জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটে সেরকম নির্বাচন আয়োজনের জন্য বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়। কূটনীতিকদের আলোচনায় নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য পাঁচটি প্রস্তাবের কথা উঠে আসে। বিষয়গুলো নিয়ে আরেকবার বৈঠকের পর তা চূড়ান্ত করা হবে বলে কূটনীতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, যেহেতু সরকার এবং বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে বিএনপির মধ্যে কোনো সংলাপ হচ্ছে না, সংলাপের পরিবেশও নেই এবং রাজনৈতিক দলগুলো এই বিষয়ে অনড় অবস্থান গ্রহণ করেছে তাই কূটনীতিকরাই দলগুলোর মধ্যে দর কষাকষির পরিকল্পনা করেছেন। কূটনীতিকরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে কথা বলবেন এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দল দুটি যেন সমঝোতায় আসে সেই চেষ্টা চালাবেন। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব করতে হলে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর একটি প্ল্যাটফর্মে আসা উচিত বলে মনে করছেন দেশগুলোর কূটনীতিকরা।

অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনে কূটনীতিকরা গতকালের বৈঠকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন। এই প্রস্তাবনাটি আরও সংশোধন করে পরিশীলিত করা হবে। এজন্য আগামীকাল রোববার আবার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই কূটনীতিকরা। প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে গতকালের বৈঠকে অংশগ্রহনকারী কূটনীতিকদের। গতকালের বৈঠকে সুষ্ঠু, অবাধ ও সব দলের প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন আয়োজনে পাঁচটি প্রস্তাব উঠে এসেছে।

১। সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচন হবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই। তবে নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী কী কী করতে পারবেন এবং কী কী করতে পারবেন না তার সুনির্দিষ্ট তালিকা থাকবে। অর্থ্যাৎ বিধিমালা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা খর্ব করতে হবে।

২। নির্বাচনকালীন সরকারে পার্লামেন্টারি সদস্যরাই থাকবেন বলে প্রস্তাব করেছেন কূটনীতিকরা। তবে প্রধানমন্ত্রী সব দলের সমন্বয়ে সম্মিলিত একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবেন। উপদেষ্টা হওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখন ছয়জন উপদেষ্টা আছেন। কূটনীতিকরা এই ছয়জনকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকালীন উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা বলেছেন। কূটনীতিকদের প্রস্তাব হচ্ছে, প্রত্যেক রাজনৈতিক দল থেকে প্রতিনিধিত্বমূলক একজন বা দুইজন করে উপদেষ্টা নিয়ে ১০-১২ সদস্যের একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা। এছাড়া নির্বাচনকালীন সময়ে মন্ত্রীদের কোনো কাজ থাকবে না। বরং উপদেষ্টাদের উপদেশ অনুযায়ীই পরিচালিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার। সে সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলী হিসেবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, যুক্তফ্রন্ট ও অন্যান্য নিবন্ধিত দলগুলো থেকে আলোচনার মাধ্যমে ১০-১২ জনকে বাছাই করা হবে। এক্ষেত্রে যেসব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে না তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। অর্থাৎ যে দলগুলো থেকে মন্ত্রী থাকবে না তাদের উপদেষ্টা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিতে হবে।

আরও পড়ুন:  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ঢাকার অর্ধেক আসনে প্রার্থী পরিবর্তনের সম্ভাবনা

৩।  সংবিধানের ১২৩(ক) অনুযায়ী মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং ১২৩(খ) অনুযায়ী মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। এক্ষেত্রে সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তাব রেখেছে কূটনীতিকরা। এতে করে বিএনপির দাবি অনুযায়ী সংসদও ভাঙা হলো আবার আওয়ামী লীগে ইচ্ছানুযায়ী সংবিধানের আলোকেও নির্বাচন হলো। অর্থাৎ, দুই পক্ষের দাবিই পূরণ করা হবে। অবশ্য সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করলে নির্বাচন পিছিয়ে যাবে।

৪। সুনির্দিষ্ট কোনো দুর্নীতি বা অন্য মামলায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে মামলা আছে বা যারা বিচারে দণ্ডিত হয়েছেন এমন ব্যক্তিরা বাদে যারা রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হয়েছে বা যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মামলা রয়েছে, তাঁদেরকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। নির্বাচনের আগে কাদের মামলাগুলো বাতিল করতে হবে আর কাদের মামলাগুলো রাখতে হবে সে বিষয়ে সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ সুপারিশ করবে।

৫। নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বাধীন, আরও সক্রিয় করার প্রস্তাব রেখেছেন পাঁচ দেশের কূটনীতিকরা। আরপিও সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে এবং নির্বাচন কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবে তাঁরা নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করবে কী না কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কীভাবে তাঁদের ক্ষমতা প্রয়োগ করবে। কীভাবে নির্বাচন হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।

জানা গেছে, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কূটনীতিকরা এই পাঁচটি প্রস্তাবনা বাছাই করেছে এবং আগামী রোববার তাঁরা আবার এই বিষয়ে বৈঠকে বসবে। বৈঠকে প্রস্তাবনাগুলো চূড়ান্তভাবে গৃহীত হলে তাঁরা প্রথমে সরকারি দল এবং পরবর্তীতে বিরোধী দলের সঙ্গে কথা বলবে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, যেহেতু বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা দিতে পারেনি এবং সবগুলো দলই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে এবং নির্বাচন ঘনিয়ে আসলেও দেশে সংলাপের পরিবেশ নেই এবং চটজলদি করে সংলাপ আয়োজন করা সম্ভবও নয়, সেজন্য এই পাঁচটি দাতা দেশ বাংলাদেশের একাধিক জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ২০১৪ সালে গত নির্বাচনের সময়ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা এমন জোট করেছিলেন।  এর ২০০৮ ও ২০০৬ সালেও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিদেশী কূটনীতিকরা।

শেয়ার করুন :
  • 25
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    25
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...