প্রচ্ছদ রাজনীতি আওয়ামী লীগ

ক্ষমতার লোভে কিছু উন্মত্ত মানুষের আর্তনাদ হলো এই জোট

780
ক্ষমতার লোভে কিছু উন্মত্ত মানুষের আর্তনাদ হলো এই জোট
ছবি : সংগৃহীত

আওয়ামী লীগ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতারাই বরং মনে করছেন জাতীয় ঐক্য দেশকে নির্বাচনমুখী করবে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত করবে। আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এই ধারণা পাওয়া গেছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ইতিমধ্যে দলের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন যে জাতীয় ঐক্যের কর্মসূচিতে যেন বাধা না দেওয়া হয়। কক্সবাজারের জনসংযোগরত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের টেলিফোনে বলেন, ‘আমি আশা করি, নতুন জোট আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে।

দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।’ তবে ওবায়দুল কাদের এটিকে জাতীয় ঐক্য বলতে রাজি নন। তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে দেশে জাতীয় ঐক্য হয় কীভাবে?’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘তাঁরা যদি নির্বাচনের জন্য ঐক্য করে তাহলে ভালো। তবে যদি ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করে তাহলে জনগণই তা প্রতিহত করবে।’

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, ‘এই জোট বাংলাদেশের জনগণ এবং রাজনীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।’ তাঁর মতে ডুবন্ত মানুষ যেমন বাঁচার জন্যে খড়কুটোর আশ্রয় ন্যায়, তেমনি ডুবন্ত বিএনপি বাঁচার জন্যে কিছু পরিত্যক্ত এবং বাতিল রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে চড়েছেন।’ মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘দেখেন নির্বাচন পর্যন্ত এই ঐক্য কতটুক থাকে।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতার লোভে কিছু উন্মত্ত মানুষের আর্তনাদ হলো এই জোট। যাদের কোনো আদর্শ নেই।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, ‘এখনই এই জোট নিয়ে মন্তব্য করার সময় হয় নাই। দেখি আসলে কি হয়? তিনি বলেন, ‘এখনো কি জোট হয়েছে।’ তবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা রকম জোট হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। আমরাও চাই একটা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হোক। অবশ্য এই ঐক্য কি বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়াকে বাঁচানোর চেষ্টা কি না সেটি দেখার বিষয়।’

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, আওয়ামী লীগ জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘এই জোটের পিছনে বিদেশি শক্তির মদদ আছে। ড. কামাল হোসেন তাদের মদদেই প্রকাশ্য হয়েছে।’ ঐ নেতা মনে করেন ‘এই জোটের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিও নেই। তাই নির্বাচন করতে না নির্বাচন বানচালের জন্য সেটিই দেখার বিষয়।’

এসব কারণেই আওয়ামী লীগ এই নতুন ঐক্য প্রক্রিয়াকে আরও গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণের পক্ষপাতী। আওয়ামী লীগ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের পর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া কি করে তা আগে দেখতে চায়। অবশ্য, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বলছেন, ঐক্য প্রক্রিয়া ভাঙতে সময় লাগবে না। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভাঙনের বীজ লুকিয়ে আছে।

গতকাল শনিবার মহাসমাবেশের মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করল জাতীয় ঐক্য। মহানগর নাট্যমঞ্চের সমাবেশের মধ্যে দিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়া আত্মপ্রকাশ করল। কিন্তু এই সমাবেশ কার নেতৃত্বে হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেন।

আরও পড়ুন:  প্রভাবশালী হলেও অজনপ্রিয়, দ্বন্দ্ব সৃষ্টিকারী ও বিতর্কিতরা মনোনয়নবঞ্চিত

দেড় ঘণ্টা পর সমাবেশস্থলে এসে তাতের সভাপতিত্ব করেন বিকল্পধারার নেতা অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সমাবেশে সমবেত শ্রোতার ৮০ ভাগই ছিল বিএনপি-জামাতের কর্মী। ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চ ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে এর সব টাকার যোগান দেন তারেক জিয়ার ঘনিষ্ঠ আবদুল আউয়াল মিন্টু। আর সমাবেশের যে আল্টিমেটাম দেওয়া হয়: তা লন্ডন থেকে তারেক জিয়া প্রণীত। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা কে? ড. কামাল হোসেন?  অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী নাকি তারেক জিয়া?

বিএনপি তাদের স্থায়ী কমিটির সভা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগ দেবে। বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে পলাতক তারেক জিয়া দুজনই অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বাদ দিয়ে শুধু ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। কিন্ত ড. কামাল হোসেন বিএনপিকে জানিয়ে দেন যে, বি চৌধুরীকেও ঐক্য প্রক্রিয়ায় লাগবে।

এ ব্যাপারে কৌশলগত যুক্তিও বিএনপি নেতৃবৃন্দকে বোঝান ড. কামাল হোসেন। মূলত বৃহস্পতিবার ড. কামাল হোসেনের ল চেম্বারে বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে ড. কামালের বৈঠকে অধ্যাপক চৌধুরীকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ড. খন্দকার মোশাররফ বি. চৌধুরীকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে বেগম জিয়া ও তারেকের আপত্তির কথা বলেন। পরে ড. কামাল হোসেন লন্ডনে তারেক জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেন।

পরে তারেক জানিয়ে দেন যে ড. কামাল যেভাবে বলবে সেভাবেই যেন বিএনপি কাজ করে। ড. কামাল এরপর অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে টেলিফোন করে বলেন যে, বিএনপির নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে (অধ্যাপক বি. চৌধুরীর সঙ্গে) দেখা করতে যেতে চায়। ড. কামাল হোসেনের মধ্যস্থতায় শুক্রবার সন্ধ্যায় বিএনপির তিন নেতা অধ্যাপক চৌধুরীর বাসায় যান। তারা সেখানে ‘অতীতে তাঁর প্রতি অন্যায়ের’ জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষমাও চান। এরপরই অধ্যাপক চৌধুরী জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশে যোগ দিতে সম্মত হন।

ড. কামাল হোসেন এবং অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী  চেয়েছিলেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত জন সংযোগমূলক কর্মসূচি রাখতে। গত ২৮ আগস্ট ঐক্য প্রক্রিয়ার যে বৈঠক ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে সিদ্ধান্ত ছিল যে, ২৮ অক্টোবর যদি সংসদ ভেঙ্গে না দেয়া হয়, তাহলে আন্দোলন শুরু করবে। কিন্তু তারেক জিয়ার হস্তক্ষেপে এই সিদ্ধান্ত পাল্টে যায়।

তারেক জিয়াই ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়ার জন্য চাপ দেন ড. কামালকে। আগামী ১০ অক্টোবর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের দিন ধার্য করা হয়েছে। তারেক তাঁর আগেই রাজপথ উত্তপ্ত করতেই জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। গতকালের সভায় এটা প্রমাণ হয়েছে, ড. কামাল বা বি. চৌধুরী নন; জাতীয় ঐক্যের আসল নেতা তারেক জিয়া।

শেয়ার করুন :
  • 412
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...