প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

এখনও চার দাবিতে অনড় ইসি মাহবুব

52
চার দাবিতে অনড় ইসি মাহবুব
ছবি : সংগৃহীত

বাকস্বাধীনতা ‘কেড়ে নেয়ার’ অভিযোগ তুলে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে আবারো কমিশন সভা বর্জন করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। সোমবার কমিশনের ৩৬তম সভা শুরুর পর ১০ মিনিটের মাথায় তিনি সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে পড়েন। তবে অন্য তিন নির্বাচন কমিশনার মো: রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও শাহাদাত হোসেন চৌধুরীকে নিয়ে বৈঠক চালিয়ে যান সিইসি নুরুল হুদা।

এর আগে গত ৩০ অগাস্ট কমিশনের যে সভায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রাখতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সে সভা থেকেও মাহবুব তালুকদার আপত্তি জানিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে পাঁচ দফা প্রস্তাব নিয়ে সভায় বক্তব্য দিতে চেয়েছিলেন এই নির্বাচন কমিশনার। কিন্তু সেই সুযোগ না পাওয়ায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে তিনি বেরিয়ে যান। গত ৮ অক্টোবর কমিশনে দেয়া এক আনঅফিশিয়াল নোটে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে’ ওই পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন তিনি।

নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা বর্জনের বিষয়ে ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিকেলে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মাহবুব তালুকদার। তিনি বলেন, গত বছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় তিন মাস নির্বাচন কমিশন অংশীজনের সাথে সংলাপের আয়োজন করে। ৪০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছাড়াও সুশীল সমাজ, মিডিয়া, পর্যবেক্ষণকারী, নারী নেত্রী প্রমুখ সেই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

মাহবুব তালুকদার বলেন, তবে এই সংলাপ ছিল একপক্ষীয়। নির্বাচন কমিশন কেবল তাদের বক্তব্য শুনেছে, নিজেদের কোনো মতামত দেননি। সবার সংলাপ সুদৃশ্য গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা হলেও সংলাপের সুপারিশ বা প্রস্তাব সম্পর্কে এ পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি। সংলাপের কোনো কার্যকারিতা না দেখে ব্যক্তিগতভাবে আমি ওই সংলাপ পর্যালোচনা করে কমিশন সভায় কিছু প্রস্তাব পেশ করতে চেয়েছিলাম এবং কমিশনের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলাম।

তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশীদারমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে কিছু প্রস্তাবনা শিরোনামে আমি যা আলোচনা করতে চেয়েছিলাম, নির্বাচন কমিশন সভায় তা উপস্থাপনা করতে দেয়া হয়নি। তিনি জানান, গত ৮ অক্টোবর কমিশন সচিবালয় থেকে ইউ ও নোটের মাধ্যমে আমাকে আজকের সভায় তা উপস্থাপনার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। আমাকে আমার প্রস্তাবনা উপস্থাপনা করতে বলেও আজ তা না দেয়ায় আমি অপমানিত বোধ করেছি।

মাহবুব তালুকদার বলেন, বাক প্রকাশের স্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা আমার সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই আমার এই অধিকার খর্ব করতে পারে না। বাধ্য হয়ে আমি নির্বাচন কমিশনের এ রকম সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করেছি এবং এর প্রতিবাদস্বরূপ নির্বাচন কমিশন সভা বর্জন করেছি। কমিশন সভায় উপস্থাপনার জন্য তৈরি প্রস্তাবনাগুলোও তুলে ধরেন তিনি।

নোট অব ডিসেন্টে তিনি লিখেছেন, নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই আমার অধিকার খর্ব করতে পারে না, বাকস্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা আমার সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার। এমতাবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে আমি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করছি এবং প্রতিবাদস্বরূপ কমিশন সভা বর্জন করছি।

মাহবুব তালুকদার লিখেছেন, কমিশন সভায় তাকে বক্তব্য উপস্থাপন করতে না দেয়ার বিষয়ে কমিশনারদের ‘অভিন্ন অবস্থান’ তাকে ‘বিস্মিত ও মর্মাহত’ করেছে। ওই পাঁচ দফা প্রস্তাব কমিশন সভার কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করারও অনুরোধ করেছেন এই নির্বাচন কমিশনার।

আরও পড়ুন:  সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল

কমিশন সভায় আলোচনার জন্য কমিশনার মাহবুব তালুকদার যে পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে রয়েছে :

ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েন : ইসির সংলাপে ২৬টি দল সেনা মোতায়েনের পক্ষে ও তিনটি দল বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। স্বাধীনতার পর সব নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হয়েছে; তবে তা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে। ভোটে সেনা মোতায়েন হলেও তারা কিভাবে দায়িত্ব পালন করবে তা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সেনাবাহিনী বাদ দেয়ার পর তাদের কার্যপরিধি কেমন হবে তা নির্ধারিত হওয়া উচিত।

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন : দশম সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। এ নির্বাচনটি একটি দল বর্জনও করেছে। তবে বর্তমান বিরোধী দল সরকারের পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় অংশ নিয়েছে। এ অবস্থায় কিভাবে একটি দল সরকারে ও বিরোধী দলে থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলের সাথে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে কঠিন সমস্যারও সমাধান হতে পারে।

নির্বাচনে নিরপেক্ষতা : ভোটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি নির্বাচনের পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ক্ষমতাসীন দল যে সুবিধা ভোগ করে বিরোধী দল তা ভোগ করতে পারে না। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের কমিটি ধরে ধরে মামলা দায়ের ও গায়েবি মামলা দায়েরে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় তফসিল ঘোষণার আগে ইসি সম আচরণ নিশ্চিতে বিবৃতির মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

ইসির সক্ষমতা বৃদ্ধি : নির্বাচনকালে সার্বিকভাবে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে ন্যস্ত করতে বলেছেন অনেকে। এ দু’টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ইসির কাছে অর্পিত হলে জন আস্থা বেড়ে যাবে এবং অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে তা সহায়ক হবে।
সরকারের সাথে সংলাপ : এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য মনে হলে তফসিল ঘোষণার আগে সরকারের সাথে তা নিয়ে ইসির সংলাপ করা উচিত।
গত ৩০ আগস্ট কমিশনের যে সভায় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রাখতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেখান থেকেও মাহবুব তালুকদার আপত্তি জানিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেছিলেন, আমি মনে করি, একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা ঠিক হবে না। কারণ, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএম চায় না।

মাহবুব তালুকদার বর্জন করলেও সভা বিঘ্নিত হয়নি : ইসি সচিব
নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার ইসি সভা বর্জন করলেও তাতে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ দাবি করেন।

সচিব বলেন, মাননীয় নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বৈঠকের এজেন্ডায় কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বলেছিলেন। সেগুলো অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় প্রথমে তিনি বৈঠকে যোগ দিলেও পরে বর্জন করেন। আশা করি আগামী বৈঠকগুলোতে সব কমিশনারই উপস্থিত থাকবেন।

শেয়ার করুন :
  • 7
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...