প্রচ্ছদ অপরাধ

‘তোর মতো কত সেনাবাহিনী ও পুলিশের লোক ক্রসফায়ার দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিছি’

287
‘তোর মতো কত সেনাবাহিনী ও পুলিশের লোক ক্রসফায়ার দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিছি
ছবি : সংগৃহীত

সার্জেন্ট রফিক সেনাবাহিনীতে ২৪ বছর চাকরি করেছেন। এ বছর জানুয়ারির ২৩ তারিখ এলপিআর এ এসেছেন। তিনি অপহরণ হয়েছেন ভুয়া র‌্যাবের হাতে। টাকা লুটসহ মারধরের শিকার হয়েছেন সার্জেন্ট রফিক। পিটিয়ে তার পা ভেঙে দিয়েছে ভুয়া র‌্যাব!

সোমবার (৫ নভেম্বর) র‌্যাবের মিডিয়া কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে তিনি জানান, গত ৩০ অক্টোবর কুমিল্লা ইসলামী ব্যাংক থেকে ৩ লাখ ও এটিএমবুথ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে বের হওয়ার পর র‌্যাবের অ্যাপ্রন পরে মাইক্রোতে তুলে নেয়া এবং মারধর করা হয়।

এ সময় তিনি সব টাকা পয়সা দিয়ে আবেদন করেন, ‘ভাই আমাকে মাইরেন না আমি সেনাবাহিনীর লোক।’

ওরা বলে, ‘তোর মতো কত সেনাবাহিনী ও পুলিশের লোক ক্রসফায়ার দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিছি। তুই আজকে পরিচয় দিয়ে বেঁচে গেলি। তোকে একটা জিনিস খাওয়াব, তুই ২ ঘণ্টা ঘুমে থাকবি, এরপর সুস্থ হয়ে বাড়ি যাবি।’ আমি রিকোয়েস্ট করেছি, ‘ভাই আমার সবকিছু নিয়ে নেন, আমার সেনাবাহিনীর যে কার্ডটা সেটা আমাকে দিয়ে দেন। কিন্তু তারা আমার কার্ড দেয়নি। এরপর আমাকে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছে।’

রাজধানীর কাউলা হতে ৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় র‌্যাব পরিচয়ে অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের মূল হোতাসহ ৭ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব- ১।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, এ সময় ১টি বিদেশি পিস্তল, ১ টি ম্যাগাজিন, ২ রাউন্ড অ্যামোনেশন, ২টি হ্যান্ডকাফ, ১টি ওয়াকিটকি সেট, ২টি র‌্যাব জ্যাকেট, ১টি র‌্যাব বোর্ড, ২টি সিগন্যাল লাইট, ৬টি বড় লাঠি, দড়ি, ৪টি চোখ বাঁধার কালো কাপড়, নগদ ২৮০০০ টাকা ও ১টি কালো গ্লাসের র‌্যাব স্টিকার যুক্ত হায়েস মাইক্রোবাস জব্দ করা হয়।

তিনি জানান, ‘অপরাধীরা নিজেদেরকে র‌্যাব সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করতে র‌্যাবের জ্যাকেটের ন্যায় জ্যাকেট ব্যবহার, ওয়াকিটকি ব্যবহার, হ্যান্ডকাফ, আইডি কার্ড ও অস্ত্র বহন করে থাকে। নিজেদেরকে র‌্যাবের ন্যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে র‌্যাবের স্টিকার তৈরি করে মাইক্রোবাস বা বিভিন্ন মানানসই গাড়িতে ব্যবহার করছে।

এ ধরনের অপরাধী দলের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বেশ কয়েকজন র‌্যাবের কাছে অভিযোগ দিয়েছে। র‌্যাব বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করে ছায়া তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় একটি অপরাধ সংগঠিত করার প্রস্তুতিকালে ৭ জনকে আটক করা হয়। অপরাধীরা হলো- মো. কাসেম ওরফে জীবন (৫৮) এবং তারা বাবা মৃত আবেদ আলী ব্যাপারী; তাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী, মো. ইব্রাহিম খলিল (৪০) ভোলা জেলার চর ফেশন থানার আবুল বাশারের ছেলে, মো. জাকির হোসেন সুমন (২৭) এবং বাবা মো. শহীদ ব্যাপারী; মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার বাসিন্দা, মো. বিল্লাল হোসেন ওরফে আসলাম (৩২) তার বাবা আব্দুর রাকিব; বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জের বাসিন্দা, আব্দুল মন্নান (৫০) মৃত সাইজ উদ্দিনের ছেলে; তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা, মো. সোহাগ (২৭) তার বাবা মো. সিদ্দিক ভূইয়া; তিনি বরগুনা জেলার বাসিন্দা, মো. আরিফ (২৮) তার বাবার নাম আব্দুল গফুর; নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লায় তাদের বসবাস।

মুফতি মাহমুদ বলেন, ‘তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়- উক্ত অপরাধ চক্রের মূল হোতা মো. কাশেম ওরফে জীবন। এই সংঘবদ্ধ দলটির স্থায়ী সদস্য ১০/১১ জন।’

চক্রটি এসব কাজে খুবই ইফিশিয়েন্ট মন্তব্য করে তিনি জানান, তারা কোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই অপরাধ চক্রটি বিভিন্ন হাইওয়েতে ডাকাতি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ নানাবিধ অপরাধ সংগঠিত করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকে গ্রাহককে টার্গেট করে অপহরনের পর ছিনতাই করতে থাকে বলে জানান গণমাধ্যম শাখার পরিচালক।

তিনি আরও জানান, ‘তারা তাদের দলের ১/২ জন ছদ্মবেশে ব্যাংকের বাহিরে, ২/৩ জন গ্রাহকের ছদ্মবেশে ব্যাংকে অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং মূল দলটি মাইক্রোবাসযোগে সুবিধাজনক স্থানে অপেক্ষা করতে থাকে। তারা গ্রাহকদের সনাক্ত করার চেষ্টা করে। যে গ্রাহক বেশি টাকা উত্তোলন করে কিন্তু নিজস্ব গাড়ি বা যানবাহন নেই সাধারণত তাদেরকে টার্গেট করে। অতঃপর ভিতরের একজন ব্যাংক থেকে বের হয়ে এসে বাহিরের জনকে টার্গেট বুঝিয়ে দেয় অথবা সরাসরি তারা মোবাইলের মাধ্যমে মূলদল বাহিরে অবস্থানরত দলকে অবহিত করে থাকে। এরপর মাইক্রোবাসটি পেছন থেকে অথবা কখনো সামনে থেকে এসে সুবিধাজনক স্থানে ভিকটিমের গতিরোধ করে মাইক্রোবাসে তুলে ফেলে। এরপর গাড়ির ভিতরে ভিকটিমকে চোখমুখ বেঁধে নির্যাতন করে সমস্ত টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং ভিকটিমকে রাস্তায় ফেলে চলে যায়।

আরও পড়ুন:  ‘পয়সা লাগবে না চকলেট দেব, ভেতরে আয়’ ... এরপর

মুফতি মাহমুদ খান জানান, দলটির সদস্যদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব আগে থেকে বন্টন করা থাকে এবং তা পূর্ব হতে রিহারসেল করে থাকে। যেমন র‌্যাবের অফিসারের ন্যায় ভূমিকায় কে থাকবে, কে হ্যান্ডকাফ পরাবে, কে ব্যাংকের ভিতরে থাকবে, কে ব্যাংকের বাহিরে থাকবে কীভাবে ইশারায় যোগাযোগ করবে ইত্যাদি। মো. কাশেম ওরফে জীবন ব্যাপারী দলের প্রধান হিসেবে যাবতীয় বিষয়াদি তদারকি করে থাকে। তাদের মধ্যে মো. ইব্রাহিম খলিল মাইক্রোবাসের ড্রাইভার।

সোহাগ গাড়ির নম্বর প্লেট আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকার কাজ করে এবং আরিফ ভিকটিককে মাইক্রোবাসে তোলার পর পিছনে বসে লক্ষ রাখে অন্য কোনো গাড়ি তাদেরকে অনুসরণ করছে কি না।

এ চক্রটি সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৩টি অপরাধ সংগঠিত করে এ সময় তারা ৩০ লাখ ৭০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে।

এছাড়া দেলোয়ার হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে সাড়ে ৮ লাখ টাকা নিয়ে তাকে চোখ বেঁধে তুরাগ এলাকায় ফেলে রাখে। এ সময় আটক সুমন তাকে প্রচুর মারধর করে, বলে তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানান।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, গ্রেফতারকৃত মো. কাশেম ওরফে জীবন ব্যাপারীকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে ১৯৮৮ সালে প্রথমে ঢাকায় এসে মুগদাপাড়ায় ফলের ব্যবসা শুরু করে। এরপর ১৯৯৮ সালে সিঙ্গাপুর চলে যায় এবং সেখানে ১০ বৎসর অবস্থান করার পর সিঙ্গাপুর থেকে দেশে এসে ২০০৮ সালে পুনরায় মুগদাপাড়া ফলের ব্যবসা শুরু করে। ২০১৫ সালে জনৈক ইমরানের প্ররোচনায় সে ছিনতাই এবং ডাকাতি কাজে সম্পৃক্ত হয়।

কিছুদিন পর সে পুলিশ কর্তৃক আটক হয়ে ৬-৭ মাস কারাগারে ছিল। কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে সে পুনরায় একই ধরনের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। ২০১৭ সালের দিকে সে আবারও ২ মাস কারাগারে ছিল। ২০১৮ তে ৩ মাস কারাগারে থেকে জুলাই মাসে জামিন পায়। কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে এই সংঘবদ্ধ দলটি গঠন করে জীবন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৮/৯টি ডাকাতি, দস্যুতা, ছিনতাই ও অস্ত্র সংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।

সংবাদ সম্মেলনে অপর এক ভিকটিম লক্ষ্মিপুর জেলার সিদ্দিকুল্লার ছেলে মহিউদ্দিন জানান, গত ২৮ অক্টোবর তিনি টঙ্গি এলাকায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে মোট ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকাসহ রাস্তায় বের হন। এ সময় র‌্যাব পরিচয়ে তাকে ১০/১৫টি মামলা আছে এমন কথা বলে অপহরণ করা হয়। এ সময় তাকে অপহরণকারীরা জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে হ্যান্ডকাপ লাগায় ও চোখ বেঁধে ফেলে। অপহরণকারীরা তাকে জানায়, আমরা গোপালগঞ্জের র‌্যাব। এ সময় মারধর করে হাত ভেঙে ফেলে (সংবাদ সম্মেলনে মহিউদ্দিনের ভাঙা হাতে ব্যান্ডেজ লাগানো ছিল)।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি তাদেরকে স্যার না বলায় অনেক পিটিয়েছে, আমি ওদের বাপও ডেকেছি। এরপর সব টাকা নেয়ার পর রুপগঞ্জ এলাকার একটি জঙ্গলে ফেলে আসে।’

শেয়ার করুন :
  • 129
    Shares

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন

Loading Facebook Comments ...