প্রচ্ছদ এক্সক্লুসিভ

থামছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ডা’কাতি’, দশগুণ দামে কেনা হচ্ছে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম!

55
থামছে না স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ডা’কাতি’, দশগুণ দামে কেনা হচ্ছে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

আমরা রূপপুরের বালিশ কে’লেঙ্কারির কথা জানি, আমরা পর্দা কে’লেঙ্কারির কথা জানি। এই করোনা সংকটের সময় যখন সারা দেশের মানুষ আ’তঙ্কে, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এক অবাস্তব প্রক্ষেপণ দিয়ে একটা নতুন ‘বালিশ কে’লেঙ্কারির’ পটভূমি তৈরি করেছে।

বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে পিপিই, ভেন্টিলেটর, মাস্ক, গগলসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু এসব স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনায় যে খরচ ধরা হয়েছে, তা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে দশগুণ বেশি।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া ‘ক’রোনাভা’ইরাস মোকাবেলায় জরুরি সহায়তা’ শিরোনামের প্রকল্পটির আওতায় এক লাখ সেফটি গগলস কেনা হবে। প্রতিটি সেফটি গগলসের দাম ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার টাকা। মোট খরচ ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে প্রতিটি সেফটি গগলস বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকায়।

এই প্রকল্পের আওতায় মোট এক লাখ সাত হাজার ৬০০ পিপিই কেনা হবে। যার প্রতিটির জন্য খরচ ধরা হয়েছে চার হাজার ৭০০ টাকা। পিপিই কেনায় মোট খরচ হবে ৫০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব শর্ত মেনে ওষুধ অধিদপ্তরের সব শর্ত অনুসরণ করে বিভিন্ন কম্পানির তৈরি ভালো মানের পিপিই বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকায়। এই প্রকল্পের আওতায় ৭৬ হাজার ৬০০ জোড়া বুট শু কেনা হবে। প্রতিটি শুর খরচ দেখানো হয়েছে এক হাজার ৫০০ টাকা। এই খাতে খরচ ধরা হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। দেশে বর্তমান বাজারে বুট শু ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় মিলছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ডাকাতি’ এখানেই থেমে থাকছে না। চলমান মানবিক দুর্যোগের সময় যেখানে চিকিৎসা উপকরণের দিকে জোরালো নজর দেওয়া দরকার, সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেশি ঝোঁক চিকিৎসাবহির্ভূত খাতে। চিকিৎসা সরঞ্জামে যত টাকা খরচ করা হচ্ছে, তার চেয়ে তুলনামূলক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে করোনা মোকাবেলার প্রকল্পে স্বাস্থ্য সরঞ্জাম কেনার চেয়ে সফটওয়্যার, ওয়েবসাইট, সেমিনার, কনফারেন্স ও পরামর্শক খাতে তুলনামূলক বেশি খরচ হচ্ছে। গবেষণার জন্য খরচ হবে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ইনোভেশন নামের আলাদা একটি খাত তৈরি করে সেখানে ৩৬ কোটি টাকা খরচ করা হবে। চলমান ক’রোনা সংকটের মধ্যে যেখানে সব কিছু স্থবির, সেখানে এই প্রকল্পে ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ টাকা।

মাত্র ৩০টা অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরির খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ৮০টা সেমিনার ও কনফারেন্স করে খরচ করা হবে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা। সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়েছে ওয়েবসাইট উন্নয়ন খাতে। মাত্র চারটি ওয়েবসাইট উন্নয়ন করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খরচ হবে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পাঁচটি ডাটাবেইস তৈরিতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৩০টি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য খরচ হবে আরো ৪৫ কোটি টাকা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক’রোনায় আক্রান্ত রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া নেওয়া হবে। সেই গাড়িভাড়া বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ৩৭ কোটি টাকা। দেশে যতগুলো স্থলবন্দর আছে, সেখানে যাতায়াত করা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা দেখতে নির্মাণ করা হবে অনাবাসিক ভবন। সেসব ভবন নির্মাণে খরচ দেখানো হয়েছে ১৯০ কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের প্রকল্পটিতে অডিও-ভিডিও ফিল্মে যেখানে খরচ দেখানো হয়েছে ১১ কোটি টাকা, এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পটিতে একই খাতে খরচ ধরা হয়েছে মাত্র এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পে গবেষণা খাতে খরচ দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পটিতে সমজাতীয় খাতে খরচ দেখানো হয়েছে মাত্র চার কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এ ছাড়া পাঁচটি কম্পিউটার সফটওয়্যার কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৫০ লাখ টাকা, যেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের প্রকল্পটিতে সমানসংখ্যক সফটওয়্যার কেনার খরচ ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি টাকা। এডিবির অর্থায়নে এই প্রকল্পের আওতায় সেমিনার কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপ খাতে ৪৫ কোটি টাকা ধরা আছে।

এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় অনাবাসিক ভবন নির্মাণে ২০০ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় এই টাকা খরচ ধরা হয়েছে, পরিকল্পনা কমিশনকে সদুত্তর দিতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

জানা গেছে, এডিবির অর্থায়নের প্রকল্পের আওতায় করোনা যোদ্ধা চিকিৎসক ও নার্সদের ঝুঁকিভাতা হিসেবে ৩৩৫ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। অথচ সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে পদ অনুযায়ী প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। তারপরও নতুন করে আবার কেন এই খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে তার কোনো উত্তর নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে।

করোনা সংকটে যখন নিজেদের ভুলভ্রান্তি শুধরে সুষ্ঠু সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করার সময়, তখনও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাদের পুরনো অভ্যাসেই আটকে আছে। একের পর এক প্রমাণসহ অভিযোগ, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে নাস্তানাবুদ হওয়া- কোনো কিছুতেই বদলাচ্ছে না এই মন্ত্রণালয়ের চরিত্র। এন-৯৫ মাস্ক কে’লেঙ্কারির রেশ কাটতে না কাটতেই তারা নতুন ফন্দি ফিকির নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। তাদের নতুন প্রক্ষেপণ এরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।