প্রচ্ছদ ইতিহাস-ঐতিহ্য

এক নজরে কুষ্টিয়া জেলা

18
এক নজরে কুষ্টিয়া জেলা

পড়া যাবে: 4 মিনিটে

কুষ্টিয়া জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। এ জেলাতে রয়েছে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। কুষ্টিয়া জেলাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। এ জেলার মানুষের ভাষা বাংলাদেশের সবচেয়ে শুদ্ধ ভাষা।

পূর্বে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার (বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে) অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও পাবনা জেলার মহকুমা /থানা হিসেবেও রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ জেলাটি। কোম্পানি আমলে কুষ্টিয়া যশোর জেলার অধীনে ছিল।১৮৬৯ সালে কুষ্টিয়ায় একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। হ্যামিলটন’স গেজেট প্রথম কুষ্টিয়া শহরের কথা উল্লেখ করে।

অবশ্য কুষ্টিয়া কোনো প্রাচীন নগর নয়। সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকালে এখানে একটি নদীবন্দর স্থাপিত হয়। যদিও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ বন্দর বেশি ব্যবহার করত, তবুও নীলচাষী ও নীলকরদের আগমনের পরেই নগরায়ন শুরু হয়। ১৮৬০ সালে কলকাতার (তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর রাজধানী)সাথে সরাসরি রেললাইন স্থাপিত হয়। একারণে এ অঞ্চল শিল্প-কারখানার জন্য আদর্শ স্থান বলে তখন বিবেচিত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস(১৮৯৬), রেণউইক, যজ্ঞেশ্বর এণ্ড কোং (১৯০৪) এবং মোহিনী মিলস (১৯১৯) প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৪৭-এ ভারতবর্ষ ভাগের সময় কুষ্টিয়া পৃথক জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর সাবডিভিশন ছিল কুষ্টিয়া সদর, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর। তৎকালীন এস ডি ও মৌলভি আব্দুল বারী বিশ্বাস কে প্রধান করে ১৯৫৪ সালে গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া আরো বেশ কিছু সরকারী অফিস কুষ্টিয়ায় স্থাপনের পরে শহরটিতে পুনরায় উন্নয়ন শুরু হয়।

কুষ্টিয়া জেলার আয়তন ১,৬২১.১৫ বর্গকিলোমিটার । এর উত্তরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা, দক্ষিণে চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহ জেলা, পূর্বে রাজবাড়ী এবং পশ্চিমে মেহেরপুর জেলা ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা অবস্থিত ।

কুষ্টিয়ার ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান নদীগুলো হল পদ্মা, গড়াই নদী, মাথাভাঙ্গা, কালীগঙ্গা ও কুমার নদী। জেলাটির গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭.৮°সে এবং গড় সর্বনিন্ম তাপমাত্রা ১১.২°সে । এখানকার বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১,৪৬৭ মি.মি.।

কুষ্টিয়া জেলা ৬টি উপজেলা, ৭টি থানা,৫টি পৌরসভা, ৫৭টি ওয়ার্ড, ৭০টি মহল্লা, ৭১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৭১০টি মৌজা ও ৯৭৮টি গ্রামে বিভক্ত। উপজেলাগুলো হলো:

কুমারখালী উপজেলা,কুষ্টিয়া সদর উপজেলা,খোকসা উপজেলা,দৌলতপুর উপজেলা,ভেড়ামারা উপজেলা,মিরপুর উপজেলা

কুষ্টিয়া জেলায় ৫ টি পৌরশহর রয়েছে

আরও পড়ুন:  বিএনপি একটি জনবিচ্ছিন্ন দল, এই দলকে নিয়ে জনগণ আর ভাবছে না

কুষ্টিয়া পৌরসভা – আয়তন ৪২.৭৯ বর্গ কি.মি. , জনসংখ্যা ৪১৮,৩১২(বাংলাদেশের ১৩তম বড় শহর)। ওয়ার্ড সংখ্যা ২১ টি।

কুমারখালী পৌরসভা– আয়তন- ১১ বর্গ কি.মি জনসংখ্যা প্রায় ৬০,০০০ ,ওয়ার্ড সংখ্যা- ৯টি

ভেড়ামারা পৌরসভা– আয়তন-১২ বর্গ কি.মি., জনসংখ্যা প্রায় ৬০,০০০,ওয়ার্ড সংখ্যা – ৯টি

মিরপুর পৌরসভা আয়তন- ৯.২২ বর্গ কি.মি.,জনসংখ্যা প্রায় ৪০৫,০০০, ওয়ার্ড সংখ্যা- ৯টি

খোকসা পৌরসভা আয়তন- ১২.৩৮ বর্গ কি.মি ,জনসংখ্যা প্রায় ৪৫,০০০ ,ওয়ার্ড সংখ্যা – ৯টি

কুষ্টিয়া জেলার জনসংখ্যা ২৩,৬৬,৮১১ জন, যার মধ্যে ৫০.৮৬% পুরুষ ও ৪৯.১৪% মহিলা। জনসংখ্যার ৯৫.৭২% মুসলিম, ৪.২২% হিন্দু ও ০.০৬% অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কুষ্টিয়ায় অবস্থিত। কুষ্টিয়ায় প্রথম স্থাপিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয় ।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুষ্টিয়া কয়েকটি সাবডিভিশন নিয়ে গঠিত একটি বড় জেলা, যার প্রতিটি সাবডিভিশন পরবর্তীকালে জেলা হয়েছে। কিন্তু এই তিন জেলা চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে বৃহত্তর কুষ্টিয়া শুধুই একটি অতীত নয়, আরও কিছু। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় যে, এই অঞ্চলের ও অবিভক্ত নদীয়া জেলার আদি বাসিন্দাদের মুখের ভাষার সাথে আধুনিক প্রমিত বাংলার ঘনিষ্ঠ মিল পাওয়া যায়। এই তিন জেলার অধিবাসীদের বৃহত্তর সমাজকে বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা বলা হয়। বিভিন্ন সংস্থা যেমনঃ “বৃহত্তর কুষ্টিয়া এসোসিয়েশন”, “বৃহত্তর কুষ্টিয়া সমাজ” এই তিন জেলার জনগনের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত কুষ্টিয়াতেও প্রধানত ধান, পাট, আখ, ডাল, তৈলবীজ ইত্যাদি চাষ করা হয়। তবে জেলাটিতে তামাক ও পানের চাষও লক্ষণীয়।

বাংলাদেশের অন্যান্য বিভিন্ন অঞ্চলের মতো কুষ্টিয়া কেবল চাষাবাদের উপর নির্ভরশীল নয়। চাষাবাদের পাশাপাশি কুষ্টিয়ায় অসংখ্য শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। কুষ্টিয়ায় মূলত তামাক, পাট, ধান, আখ, কাঠ, ধাতব দ্রব্য, যন্ত্রাংশ নির্মান, টেক্সটাইল এর উপর ভিত্তি করে শিল্প কারখানা গুলো গড়ে উঠেছে। কুষ্টিয়ায় অনেক তামাকের কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে নাসির টোব্যাকো লিমিটেড, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো, দি ইউনাইটেড ঢাকা টোব্যাকো, পারফেক্ট টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকো, এনবি টোব্যাকো, গ্লোবাল লিফ টোব্যাকো উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের বৃহত্তম বৈদ্যুতিক তার তৈরির কারখানা বি.আর.বি. কেবলস কুষ্টিয়ায় অবস্থিত। জেলার কুমারখালি উপজেলায় গড়ে উঠেছে উন্নতমানের টেক্সটাইলস ও ফ্রেব্রিকস শিল্প। এখানে উৎপাদিত ফ্রেব্রিকস সামগ্রী দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। এছাড়া কুষ্টিয়ায় অসংখ্য অটো রাইস মিল রয়েছে। খাজানগর এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে প্রায় ৪০০ টি অটো রাইস মিল এবং অসংখ্য এগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে। দেশের প্রায় ৭০% অটো রাইস মিল খাজানগর এলাকায় অবস্থিত। জেলার বিভিন্ন স্থানে জুট মিল, প্লাইউড ইন্ডাস্ট্রি, মেটাল ইন্ডাস্ট্রি জেলার অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করেছে। বিভিন্ন কলকারখানা গড়ে ওঠায় এককভাবে কৃষিকাজের উপর নির্ভরতা কম।

আরও পড়ুন:  ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ

কুষ্টিয়া মূলত শিল্পে সমৃদ্ধ একটি জেলা। এখানে তামাক, পাট, ধান, আখ, কাঠ, টেক্সটাইল, ধাতব দ্রব্য, যন্ত্রাংশ নির্মান ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে অসংখ্য শিল্প কারখানা ও শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে। উপমহাদেশের বিখ্যাত বস্ত্রকল মোহিনী মিল ১৯০৯ সালে এ জেলায় গড়ে উঠেছিল। তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশের বস্ত্র চাহিদা পূরণ হতো এই মোহিনী মিল থেকে। এরপরে ব্রিটিশ আমলেই রেনউইক যজ্ঞেশ্বর এন্ড কোং এবং যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস নামে দুইটি যন্ত্রাংশ নির্মান কারখানা গড়ে ওঠে। তখন থেকেই মূলত এ জেলায় শিল্পকারখানার বীজ বপন হয়। তখন কোলকাতার সাথে এ জেলার সহজ রেল যোগাযোগ থাকায় আস্তে আস্তে আরো শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। বর্তমানে এ জেলায় বেশ কয়েকটি শিল্পাঞ্চল রয়েছে।

চিত্তাকর্ষক স্থান

কুষ্টিয়া একটি প্রাচীন জনপদ। পূর্বে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার একটি মহকুমা ছিল। এখানে দেখার মত অনেক স্থান রয়েছেঃ

রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী – কুমারখালি উপজেলার শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কুঠিবাড়ী রয়েছে;

রবী ঠাকুরের কুঠিবাড়ি
রবী ঠাকুরের কুঠিবাড়ি

ফকির লালন সাঁইজির মাজার – বাউল ফকির লালন সাঁইজির মাজার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের ছেউড়িয়া গ্রামে;

লালন শাহের মাজার
লালন শাহের মাজার

টেগর লজ – কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত এই দোতলা ভবনটি;

পরিমল থিয়েটার – কুষ্টিয়া শহরের স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ;

গোপীনাথ জিউর মন্দির – নলডাঙ্গার মহারাজা প্রমথ ভূষণ দেব রায় কর্তৃক দানকৃত জমির উপর নির্মিত;

মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তুভিটা – বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের বাস্ত্তভিটা কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়ায় অবস্থিত;

পাকশী রেল সেতু – কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেল সেতু;

লালন শাহ সেতু – কুষ্টিয়া জেলার পদ্মা নদীর উপর নির্মিত “লালন শাহ” সেতুটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 14
    Shares