প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

মানবসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ডা. নিজাম

32
মানবসেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ডা. নিজাম
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

মহামা’রি করো’নাভাই’রাসে বিপর্যস্ত গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশেও পড়েছে করো’নার থাবা। দেশে প্রতিদিনই করো’না কেড়ে নিচ্ছে অর্ধশত মানুষের প্রা’ণ। শুরুতে করো’না রোগীদের চিকিৎসা’সেবা নিয়ে নানা ধরনের অ’ভিযোগ থাকলেও এরই মধ্যে আ’ক্রান্তদের সুস্থ করতে গিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন অনেক চিকিৎসক।

স্বাস্থ্যসেবার নানা অ’প্রতুলতার মধ্যেও দিনরাত তারা পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। করো’নাকালে মানবসেবায় স্থাপন করছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। এমনই একজন করো’নাযোদ্ধা নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজে’লা হাতিয়া উপজে’লা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম উদ্দিন মিজান।

হাতিয়া একটি বিচ্ছিন্ন উপজে’লা। চারদিকে মেঘনা নদী ও চর বেষ্টিত। তাই সেখানে চিকিৎসা সেবা দিতে সংশ্লিষ্টদের একটু বেশি ক’ষ্ট করতে হয়। তার ওপর করো’নার প্রাদুর্ভাব। এর মধ্যেই দিনরাত সমান তা’লে কাজ করে যাচ্ছেন হাতিয়ার চিকিৎসকরা।

গত মঙ্গলবারও (২৩ জুন) তার ব্যতিক্রম ছিল না। উপজে’লা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. নিজাম উদ্দিন মিজান সঙ্গীদের নিয়ে বিকেল থেকে শুরু করেন করো’না আ’ক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ সরবরাহ, নতুন পজিটিভ আসা রোগীদের বাড়ি খুঁজে খুঁজে লকডাউনের কাজ। এভাবে তিন বাড়িতে চিকিৎসা’সেবা দেয়ার পর এক বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান রবিউল নামে একজন প্রচণ্ড শ্বা’সক’ষ্টে ভুগছেন। অক্সিজেনের মাত্রা মাত্র ৩৫ শতাংশ। সঙ্গে থাকা একজনকে পাঠিয়ে দিলেন উপজে’লা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসার জন্য। অক্সিজেন সিলিন্ডার আসার পর অক্সিজেন দেয়া হলো রোগীকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অক্সিজেনের মাত্রা উঠে এলো ৯৬ শতাংশে।

অক্সিজেন সরিয়ে নেয়ার পরই সমস্যা দেখা দিল। রোগীর অক্সিজেনের মাত্রা সঙ্গে সঙ্গে নামতে লাগলো। বাইরে থেকে অক্সিজেন দিলে রোগী ভালো থাকে, সরিয়ে নিলেই দ্রুত নেমে আসতে থাকে। এই রোগীকে বাসায় রাখা মানে মৃ’ত্যু নিশ্চিত- এই ভেবে রোগীকে উপজে’লা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। হাসপাতা’লে নিয়ে এসে ওই রোগীকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে কে’টে গেল আরও কয়েক ঘণ্টা ।

রাত তখন ১১টা। সারাদিন দুর্গম চরাঞ্চল এলাকা থেকে আসা মানুষের চিকিৎসা’সেবা দিয়ে অনেকটা ক্লান্ত ডা. নিজাম উদ্দিন মিজান। শরীর কোনো কাজে সায় দিচ্ছে না। পিপিই খুলে একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য যখন চেষ্টা করছেন ঠিক তখনই তার কাছে খবর এলো নিচে একজন রোগী এসেছেন। তার অবস্থা ভালো নয়।

পিপিই পরেই নিচে নেমে গেলেন ডা. নিজাম। দেখলেন হাসপাতা’লের সামনে রাস্তায় এক কি’শোর তার নিথর বাবাকে কোলে নিয়ে রাস্তায় বসে আছে। কাঁদতে কাঁদতে সাহায্য চাইছে সবার। তার বাবাকে বাঁ’চানোর জন্য আর্তনাদ করছে সে। আশপাশে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেউই সাহায্য করছে না।

ডা. নিজাম দ্রুত গিয়ে রোগীর নাড়ি চেক করলেন। পালস নেই। রোগীকে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে সিপিআর দেয়া শুরু করলেন তিনি। একটা সময় পরে গিয়ে পালস পেলেন। তখনও সিপিআর চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সারাদিনের ক্লান্তির পর এই ক’ষ্ট’কর কাজটা করার জন্য শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই তার। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বিকেল থেকে পিপিই পরা, মুখে এন ৯৫ মাস্ক। ক্লান্তির সঙ্গে শ্বা’স নিতেও অ’সুবিধা হচ্ছিল তার। একটা সময় পরে গিয়ে আর পারেন না তিনি।

ডা. নিজাম ক্লান্ত হয়ে থেমে যেতেই কি’শোর ছে’লেটা দায়িত্ব নেয়। পাশে থেকে দেখে বুঝে গেছে কী’ভাবে সিপিআর দিতে হয়। বাবাকে বাঁ’চানোর চেষ্টায় ক্রমাগত সিপিআর দিয়ে চলে সে। পাশে বসে রোগীর দিকে নজর রাখছিলেন ডা. নিজাম। হঠাৎ করেই রোগীর চোখ স্থির হয়ে গেল। এটা দেখেই দ্রুত পালস চেক করলেন তিনি। পালস নেই। তার চোখের সামনেই রোগী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। ছে’লেটা তখনও সিপিআর দিয়ে চলেছে। ওর কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন তিনি। ডাক্তারের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ছে’লেটা, তারপর বাবার মুখের দিকে। স্থির হয়ে গেল তার হাত দুটো।

করো’নাযোদ্ধা ডা. নিজাম উদ্দিন মিজান জাগো নিউজকে বলেন, প্রা’ণপণ চেষ্টা করেও পঞ্চাশোর্ধ্ব পবন দাসকে বাঁ’চাতে পারিনি। কারণ আমাদের হাসপাতা’লে ভেন্টিলেটর সুবিধা নেই। ভেন্টিলেটর থাকলে হয়তো তাকে বাঁ’চানো যেত। তিনি বাঁচলে নিজেও স্বস্তি পেতাম।

ডা. নিজাম উদ্দিন মিজান জানান, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর তিনি হাতিয়া উপজে’লা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যোগ দেন। তিনি ৩৯তম বিএসএসে সরকারি চাকরি পান। মানবসেবার ব্রত নিয়ে এ পেশায় এসেছেন। জন্মস্থান নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজে’লার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের পদিপাড়া হলেও ঢাকায়ই লেখাপড়া করেছেন। তবে দুর্গম হাতিয়া উপজে’লা কর্মস্থল হলেও এখানে তার চিকিৎসাবসেবা দিতে কোনো ক’ষ্ট হয় না। তবে ক’ষ্ট লাগে যখন প্রা’ণপণ চেষ্টা করেও কাউকে বাঁ’চাতে পারেন না।

হাতিয়া উপজে’লা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মক’র্তা ডা. নাজিম উদ্দিন বলেন, ভেন্টিলেটর থাকলে পবন দাস হয়তো বেঁচে যেতেন। পবন দাসের করো’না উপসর্গ থাকায় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও তার রিপোর্ট আসেনি।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 13
    Shares