প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

দিশেহারা মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা

48
দিশেহারা মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

রাজধানীর মিরপুরে একটি মা’র্কে’টের ম’সজিদে খতিব ছিলেন মা’ওলানা মেহেদী হাসান মুরাদ। পাশাপাশি একটি স্কুলে ধ’র্মীয় শিক্ষার ক্লাস নিতেন তিনি। এপ্রিল মাসে ম’সজিদের চাকরি হারান, আর স্কুলের বেতন বন্ধ অনেক আগে থেকেই। দুই বছর বয়সী কন্যা ও স্ত্রী’কে নিয়ে সাদামাটা জীবন আরও ফ্যাকাশে হয়ে যায় বাসা ভাড়া দিতে না পারায়।

একদিকে বাড়িওয়ালার চাপ, অন্যদিকে আয়ের কোনও পদ খোলা ছিল না। বাধ্য হয়ে শহরজীবনের ইতি টেনে পরিবার নিয়ে ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়েছেন মা’ওলানা মেহেদী হাসান মুরাদ। গ্রামে ঘর ভাড়া না লাগলেও ধার-দেনা করে অনেক ক’ষ্টে টেনে নিচ্ছেন সংসার। আত্মসম্মান বোধ থেকে সাহায্য চেয়ে হাত বাড়াতেও পারছেন না। করো’নার আ’ঘাতে মা’ওলানা মেহেদী হাসানের মতো দিশেহারা দেশের অনেক ম’সজিদের খতিব, ই’মাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম’রা।

মা’ওলানা মেহেদী হাসান মুরাদ ম’সজিদ থেকে মাসে বেতন পেতেন ৮ হাজার টাকা। তাতে সংসার চলতো না। বাড়তি আয়ের জন্য স্কুলে চাকরি নিয়েছিলেন। করো’নার প্রভাবে এখন তিনি বেকার। দিশেহারা মা’ওলানা মুরাদ এখন উপায় খুঁজছেন কী’ভাবে সংসার চালাবেন। তিনি বলেন, ‘যখন ম’সজিদে মু’সল্লিদের প্রবেশে বিধি-নিষেধ আরোপ হলো, তখন থেকেই সংকটের শুরু। হুট করে ম’সজিদ কমিটি বলে দিলো—আর আসা লাগবে না। ৪-৫ মাস ধরে স্কুলেও বেতন নেই।

বাসা ভাড়া দিতে না পারায় বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। বুঝতে পারছিলাম না কী’ করবো। শেষমেশ বাধ্য হয়ে ঢাকা ছেড়েছি। গ্রামে এসে হয়তো এখন বাসা ভাড়া লাগে না। কিন্তু অন্যসব খরচ তো আছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে কিছুদিন চললাম। এখন কী’ করবো?’

স্বাভাবিক সময়েই নানা সংকটের মধ্যে দিন কাটে দেশের ম’সজিদের খতিব, ই’মাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম’দের। করো’নাভাই’রাসের মহামা’রি নতুন করে আরও সংকট বাড়িয়েছে তাদের। শহরের তুলনায় গ্রামের ম’সজিদগুলোতে সংকট আরও প্রকট। আত্মসম্মান আর লোকলজ্জার ভ’য়ে অনেকেই সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারছেন না।

জানা গেছে, মূলত সংকটের শুরু হয় দেশে করো’নার কারণে ম’সজিদে মু’সল্লিদের প্রবেশের বিধিনিষেধ আরোপের পর। গত ৬ এপ্রিল সরকার মু’সল্লিদের ঘরে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ফলে সেই সময় থেকে ম’সজিদগুলো মু’সল্লি শূন্য হয়ে পড়ে। মু’সল্লিরা ম’সজিদে না আসায় দান বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব অনুসরণসহ নানাবিধ কারণে ম’সজিদের জন্য অনুদান ও সাহায্য সংগ্রহের কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে।

ফলে অনেক ম’সজিদই ই’মাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম’দের বেতন দিতে পারছে না। প্রায় এক মাস পর গত ৭ মে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুস্থ মু’সল্লিদের জন্য ম’সজিদে নামাজ আদায়ের নিয়ম করে সরকার। তবে মু’সল্লিরাও আর্থিক সংকটে থাকায় আগের মতো দান-অনুদান দিতে পারছেন না।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়াতে ২৪ ঘণ্টা সাপ্তাহিক ছুটিবিহীন দায়িত্ব পালন করলেও খুব বেশি বেতন পান না ই’মাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম’রা। এমনকি এই পেশার মানুষদের জন্য নেই কোনও নির্ধারিত বেতন কাঠামো। বিভিন্ন স্থানের ই’মাম ও মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীতে এলাকা ভেদে ই’মাম’রা বেতন পান ৬ থেকে ১৫ হাজার টাকার পর্যন্ত। তবে অ’ভিজাত এলাকার কিছু ম’সজিদের ই’মাম’রা ২০-২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পেয়ে থাকেন। মুয়াজ্জিনদের বেতন সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। গ্রামাঞ্চলে এই বেতনের হার আরও কম।

করো’নাভাই’রাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে আর্থিক অনুদান দিতে মে মাসে দেশের ২ লাখ ৪৪ হাজার ৪৩টি ম’সজিদের জন্য ১২২ কোটি ২ লাখ ১৪ হাজার টাকা বরাদ্দ করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ম’সজিদগুলোর আর্থিক অসচ্ছলতা দূর করতে প্রত্যেক ম’সজিদের অনুকূলে পাঁচ হাজার টাকা হারে অনুদান প্রদানের অনুমোদন দেন। ইস’লামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই অনুদান বিতরণ করা হয়।

যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনের তুলনায় অনুদানের এই টাকা অ’প্রতুল। একটি ম’সজিদে ই’মাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম মিলিয়ে কমপক্ষে তিন জন কাজ করেন। সেখানে এককালীন মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বণ্টন করা কঠিন। আর বরাদ্দপ্রাপ্ত তালিকার বাইরে থাকা ম’সজিদগুলো একেবারেই বঞ্চিত। এদিকে অনুদানের টাকা প্রাপ্তি নিয়েও রয়েছে নানা অ’ভিযোগ। জুন মাসে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অনুদানের টাকা চাওয়ায় চাকরি হারিয়েছেন মাগুরার সদর উপজে’লার শত্রুজিতপুর ইউনিয়নের সিংহডাঙ্গা উত্তরপাড়া ম’সজিদের ই’মাম। ৩১ মে ওই ম’সজিদ কমিটির সভাপতি মীর খোরশেদ আলমের কাছে টাকা চাইলে ম’সজিদের ই’মাম আবু সাঈদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

যু’ক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আলেম’দের সহায়তায় পরিচালিত ‘আন-নূর হেল্পিং হ্যান্ড বাংলাদেশ’ ২ হাজার পরিবারকে খাদ্য ও অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। এদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক ই’মাম মুয়াজ্জিন সহায়তা পেয়েছেন বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। বাংলাদেশে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক মা’ওলানা আনছারুল হক ইম’রান বলেন, ‘আম’রা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করেছিলাম, যারা সংকটে আছেন, তারা যেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আম’রা সাহায্য গ্রহণকারীর নাম পরিচয় প্রকাশ না করেই সহায়তা করবো। সাধারণ মানুষ যেমন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, তেমনি ম’সজিদের ই’মাম, মুয়াজ্জিন, আলেম’রাও যোগাযোগ করেছেন। আমাদের কাছে কেরানীগঞ্জ, চাঁদপুর, গাজীপুর থেকে অনেকেই যোগাযোগ করেছেন—যারা ম’সজিদের ই’মাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেম। দুই-তিন মাস ধরে এদের মধ্যে কেউ পুরো বেতন পাচ্ছেন না, কেউ অর্ধেক পাচ্ছেন। লোকলজ্জায় তারা কারও কাছে হাতও বাড়াতে পারছেন না। আম’রা তাদের আর্থিক সাহায্য করেছি। তবে আমাদের একার পক্ষে সবাইকে সহযোগিতা করা সম্ভব নয়, সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

ইস’লামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আনিস মাহমুদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রোজার ঈদের আগে ই’মাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য এককালীন বরাদ্দ দিয়েছিলেন। সেটির বিতরণ প্রায় শেষ। আর তালিকার বাইরেও কোনও ম’সজিদ চাইলে আম’রা বিতরণ করছি।’

আবারও বরাদ্দ দেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে আনিস মাহমুদ বলেন, ‘ইস’লামী ফাউন্ডেশন থেকে এমন কোনও পরিকল্পনা নেই। তবে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কোনও সিদ্ধান্ত আছে কিনা, তা আমাদের জানা নেই।’বাংলা ট্রিবিউন

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।