প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

সমঝোতা করতে করতে আর কত ছোট হওয়া!

13
Women Chapter

পড়া যাবে: 4 মিনিটে

মেহেরুন নূর রহমান:

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রীর স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ী কর্তৃক খুন করার অভিযোগ নিয়ে খুব কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচারের শিকার হচ্ছিলো মেয়েটি। মেয়েটির পরিবারও তার প্রতি হওয়া অত্যাচারের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলো। মেয়েটি যেহেতু জীবিত নেই তাই তার পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য শোনার উপায় নেই, তবে এটা পরিস্কার যে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মেয়েটির ওই সম্পর্কেই ছিলো, ওখান থেকে বের হয়ে আসেনি।
সাংবাদিক সাজিদা ইসলাম পারুলকে নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে এখনও। পারুল তার উপর হওয়া অত্যাচারের বিচার চেয়ে লড়াই করছে। পারুল শিক্ষিত, সাংবাদিক এবং তারপরও সে অনেকদিন ধরে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করে যাচ্ছিলো। স্বামীটি বিভিন্ন নারীদের সাথে সম্পর্ক রেখেছে, মারধর করে এবরশন করিয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত স্বামীটি যখন পারুলকে ডিভোর্স করে অন্য এক নারীকে বিয়ে করতে যাচ্ছিলো তখনো পারুল চেষ্টা করেছিল সেই বিয়ে থামাতে, অর্থাৎ তখনও পারুল চাচ্ছিলো বিয়েটা টিকিয়ে রাখতে। শেষ পর্যন্ত পারুল সম্পর্কটিকে আর টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এখন পারুল বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। স্বামীরটির এই বিয়ে করার চেষ্টার আগ পর্যন্ত কিন্তু পারুল তেমন করে কঠোরভাবে তার উপর করা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেনি। বিয়ের পর পারুলের ফেসবুক স্ট্যাটাসগুলো দেখলে আমরা দেখতে পাবো সে স্বামীকে নিয়ে প্রেমময় সব স্ট্যাটাস দিয়ে গেছে ক্রমাগত। যদিও কার্যত সেসময় সে নিয়মিত স্বামী দ্বারা অত্যাচারিত হচ্ছিলো।

আমার পরিচিত এক আর্টিস্ট দম্পতিকে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে। স্টুডেন্ট থাকাকালীন তারা বিয়ে করে ফেলেছিলো। ছেলেটির বাবা মা বিয়েতে রাজি ছিল না বলে ছেলেটি দীর্ঘদিন শ্বশুরবাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করেছে এবং শ্বশুরবাড়িই তার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছে। সেই সময় টিউমার হবার কারণে মেয়েটির জরায়ু কেটে ফেলতে হয়েছিলো। তখন বিমর্ষ স্ত্রীকে স্বামী কিন্তু সাহস যুগিয়েছিলো, বলেছিলো তারা দুজনেই যথেষ্ট, কোন সন্তানের প্রয়োজন নেই। কিন্তু স্বাবলম্বী হবার পর, ফ্ল্যাট গাড়ি কেনার পর স্বামীটির রূপ পরিবর্তন হতে থাকে। খুঁতযুক্ত মেয়ে তার আর পছন্দ হয় না, এবং সে সন্তানের পিতা হবার ইচ্ছা পোষণ করে। এ ব্যাপারে ছেলেটির বাবা-মায়ের যথেষ্ট মদদ ছিল।

এরপর স্বামীটি ক্রমাগত নানা সম্পর্কে জড়ায়। এই নিয়ে ঝগড়াঝাঁটিতে ঘরে মেয়েটির উপর মারধর, অশান্তি, অত্যাচার চলতে থাকে। একসময় স্বামীটি দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলে। বলে রাখা ভালো এসব কিছু যখন হচ্ছে তখন মেয়েটি কিন্তু একটি বিজ্ঞাপন সংস্থাতে কাজ করছে। সুতরাং মেয়েটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল এ কথা বলা যাবে না। স্বামী দ্বিতীয় স্ত্রীকে ফ্ল্যাটে তুলে আনার চেষ্টা করলে মেয়েটি তাতে বাধা দেয়। কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রী যখন প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলো, তখন স্বামী তাকে ফ্ল্যাটে তুলে আনে এবং মেয়েটিকে টেনেহিঁচড়ে জোর করে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেয়। পুরোটা সময় স্বামীর পরিবার স্বামীটিকে সাপোর্ট করে গেছে। মেয়েটির ভাইদের সাহায্য নিয়ে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করেও কোন লাভ হয়নি। এই ঘটনার পর মেয়েটি দীর্ঘদিন কঠিন ডিপ্রেশন এর মধ্যে দিন কাটিয়েছে এবং এখনও সে ডিপ্রেশন থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।

আরও পড়ুন:  মা খুব বাজে বাজে পিক পাঠায়

জিজ্ঞেস করেছিলাম কেন এতো সহ্য করলেন? আগে কেন বেরিয়ে এলেন না? মেয়েটি বলেছিল, চেষ্টা করেছি শেষ পর্যন্ত সংসার টিকিয়ে রাখা যায় কিনা। উনি আমাকে উনার বাসার কাজের সহকারির একটি উক্তি বলেছিলেন। সেই সহকারি মেয়ে নাকি তাকে বলেছিলো, “আপা দাঁত চাইপা পইরা থাকেন, একটু সহ্য করেন, ছাইড়া দিলেই তো সব শেষ”। কাজের সহকারির এই বক্তব্য মেয়েটির কাছে তখন খুব গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল তার। জিজ্ঞেস করেছিলাম, কী লাভ হলো এতো সহ্য করে? এই প্রশ্নের উত্তর যদিও মেলেনি।

উপরে বর্ণিত ঘটনা তিনটির দিকে তাকালে দেখতে পাই তিনজন নারীই শিক্ষিত। তাদের উপর করা অত্যাচার তারা সহ্য করেছে দীর্ঘদিন। প্রত্যেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সংসার টিকিয়ে রাখার। উপরোক্ত কোন ঘটনায় সন্তানের দায় ছিল না যে সন্তানের জন্য তাদেরকে সংসার টিকিয়ে রাখতে হয়েছিলো। মূলত তিনটি নারী নিজের জন্যই অত্যাচারী, নৃশংস, অবিশ্বস্ত স্বামীদের ধরে রাখতে চেয়েছে শেষ পর্যন্ত। কিন্তু কেন? কেন একজন নারী এতোটা সহ্য করে? কেন নারীরা নিজের জীবন দিয়ে হলেও সংসার টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে? কীসের আশায়? তারা কি জানে না এরকম একটি সংসারে সে কখনোই সুখী হতে পারবে না?

জানে, কিন্তু তারপরও সমঝোতা করে করে টিকিয়ে রাখতে চায়। এটি আসলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ফলাফল। এই সমাজব্যবস্থা নারীদের সহ্য করতে বলে, মানিয়ে নিতে বলে। নারীকে বলে সর্বংসহা হতে। বলে পুরুষরা এমন করতেই পারে। অন্য নারী গমন, স্ত্রীকে মারধর, অপমান করার পরও একটি পুরুষকে ক্ষমা করা যায়। যেকোনো মূল্যে সংসার টিকিয়ে রাখা একজন নারীর প্রধান কর্তব্য। সংসার টিকিয়ে না রাখতে পারলে নারী হিসেবে সে অসফল, মূল্যহীন এবং ব্যর্থ। এসব ভাবনা বেশিরভাগ মেয়েদের মাথা এবং মগজে এমনভাবে গেঁথে যায় যে পরবর্তীতে চেষ্টা করলেও এর থেকে তারা বের হতে পারে না। দুঃখের বিষয় শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সব নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায়।

আরও পড়ুন:  পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া …

একটি প্রবাদ পড়েছিলাম যা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। “তুমি যদি তোমার বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করার জন্য কারো সাহায্যের অপেক্ষায় থাকো তবে সেই মানুষটির জন্য আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াও। আয়নাতে যাকে দেখতে পাবে একমাত্র সেই পারে তোমার ভাগ্যের পরিবর্তন করতে”। অর্থাৎ নিজে ছাড়া নিজের ভাগ্য কেউ আসলে পরিবর্তন করতে পারে না। নিজের চেষ্টা ছাড়া কোন কিছুই হয় না।

উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলোতে আমরা দেখতে পাই নারীগুলো স্বামীর ঘর থেকে বের করে দেয়ার আগ পর্যন্ত সব অত্যাচার সহ্য করে সংসারে পড়ে থেকেছে এবং পড়ে পড়ে মার খেয়েছে। একজনকে তো মেরেই ফেলা হলো। ভুল একবার মাফ করা যায়, দুবার মাফ করা যায়, তিনবার মাফ করা যায়, কিন্তু একই ভুল যখন বারবার হয়, তখন সেটা আর ভুল থাকে না, সেটা হয় অভ্যাস।

আপনার উপর হওয়া শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার যাই হোক না কেন সেটা যদি ক্রমাগত হয় তবে কতক্ষণ আপনি ক্ষমা করবেন? কতক্ষণ আপনি সহ্য করবেন? আপনি অত্যাচারিত হবার পর, আপনিই ভিকটিম হবার পরও শেষ সিদ্ধান্ত কেন আপনার স্বামী নেবে? কেন আপনার স্বামী আপনাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পরেই আপনি প্রতিবাদী হবেন?

নিজেকে প্রশ্ন করুন। শারীরিকভাবে কাউকে আঘাত করা কিন্তু একটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, সুতরাং আপনাকে কেউ যদি শারীরিকভাবে ক্রমাগত আঘাত করে যায় এবং আপনি তাকে যদি শাস্তির আওতায় না এনে মাফ করে দেন, তাহলে আপনিও সেই অপরাধের ভাগীদার।

নারীরা আর একটু সাহসী হোন, সিদ্ধান্ত নেবার মতো সাহসী। চেষ্টা করা ভালো, কিন্তু আপনার চেষ্টা যেন অরণ্যে রোদন না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। সমঝোতা করতে করতে নিজেকে এত ছোট করে ফেলেন না যে যে কেউ পা দিয়ে কচলে দিতে পারে আপনাকে। অসুস্থ, অত্যাচারের, অসম্মানের সংসারের চেয়ে মাথা উঁচু করে নিজের মতো থাকা অনেক সম্মানের। নিজেকে ভালোবাসুন, নিজেকে সম্মান করুন। আপনি যদি আপনাকে সম্মান না করেন, ভালো না বাসেন, তাহলে অন্য কেউ আপনাকে ভালোও বাসবে না, সন্মানও করবে না। এই সারসত্য কথাটি জেনে নিন।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

  • 5
    Shares