প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

করো’নায় তছনছ চট্টগ্রামের হোটেল জামান পরিবার, ৮৫ বছরের অধ্যায় শেষ

24
করো'নায় তছনছ চট্টগ্রামের হোটেল জামান পরিবার, ৮৫ বছরের অধ্যায় শেষ
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে চলে গেলেন সহোদর তিন ভাই- এর মধ্যে দুই ভাই মাত্র একদিনের ব্যবধানে। এমন ট্রাজিক মুহূর্ত অ’পেক্ষা করছিল যাদের জন্য, সেই তিনজনের হাতেই তিল তিল শ্রমে গড়ে উঠেছিল চট্টগ্রামের নামি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্যাফে জামান বা হোটেল জামান।

গত ২ জানুয়ারি প্রথমে মা’রা যান মেজ ভাই মোহাম্ম’দ জামান। ক্যান্সারে এই ভাইটি মা’রা যাওয়ার পর জামান পরিবারে এলো করো’নার থাবা। করো’নার কাছে হেরে মাত্র একদিনের ব্যবধানে মা’রা গেলেন বাকি দুই ভাই- ২১ জুন প্রথমে ছোট ভাই নুরুজ্জামান এবং ২৩ জুন বড় ভাই মালেকুজ্জামান। জামান পরিবারে ৮৫ বছরের একটি অধ্যায় এভাবেই শেষ হয়ে গেল।

ছোট ভাই নুরুজ্জামানের মৃ’ত্যুর একদিন পর বড় ভাই মালেকুজ্জামানেরও মৃ’ত্যু হয় করো’নায়। কিন্তু তাদের একে অ’পরের বাসার দূরত্ব অনেক। ছোট ভাই নুরুজ্জামান লালখানবাজার বাঘঘোনার জামান ভবনের বাসিন্দা। অন্যদিকে বড় ভাই মালেকুজ্জামানের বাসা দক্ষিণ খুলশী মুরগির ফার্ম এলাকায় জামান ভবনে।

ঘটনাক্রমে দুই ভাইকে একই দিন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল চট্টগ্রাম নগরীর একটি হাসপাতা’লে। তখন তাদের মুখে ছিল অক্সিজেন লাগানো। দুই ভাই একে অ’পরকে দেখেছেন। কিন্তু কথা বলতে পারেননি। কারণ তখন দুজনেই ছিলেন করো’না আ’ক্রান্ত।

এর আগে গত ২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর আল ফা’লাহ গলির নিজ বাসভবনে মা’রা যান মেজ ভাই মোহাম্ম’দ জামান। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হোটেল জামান অ্যান্ড বিরানী হাউসের প্রতিষ্ঠাতা ও স্বত্ত্বাধিকারী ছিলেন তিনি। মৃ’ত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দুই ছে’লে ও তিন মে’য়ে রেখে গেছেন তিনি।

জামান পরিবারে এরপর এলো করো’নার থাবা। টানা ১৭ দিন করো’নাভাই’রাসের সঙ্গে ল’ড়ে গত ২১ জুন ঢাকা আজগর আলী হাসপাতা’লে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মা’রা যান ক্যাফে জামানের মালিক নুরুজ্জামান (৬৫)। তিনি ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবার ছোট।

অন্যদিকে এর মাত্র মাত্র একদিন পর ২৩ জুন চট্টগ্রামের সার্জিস্কোপ হাসপাতা’লে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮৫ বছর বয়সে মা’রা যান হোটেল জামানের আরেক মালিক মালেকুজ্জামান। পরিবারে তিনি ছিলেন সবার বড়।

এমন একটি পরিবারে কী’ভাবে ঢুকলো করো’নার বিষ, যার কবলে পড়ে পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ দুজন সদস্য মাত্র একদিনের ব্যবধানে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হল- এ প্রশ্ন বাইরে যেমন, পরিবারের ভেতরেও সবাইকে ভাবাচ্ছে।

জামান পরিবারে বিভিন্নজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, করো’না সংক্রমণের ঝুঁ’কি থাকার পরও বড় ভাই মালেকুজ্জামান নিয়মিত বাজারে যেতেন। বাজার থেকেই করো’নার সংক্রমণ হয়েছে বলে ধারণা করছেন তার মেজ ছে’লে সেলিম জামান। তিনি বলেন, বাবা নিয়মিত বাজার করতে যেতেন। ম’সজিদেও যাওয়া-আসা ছিল তার। এই দুই জায়গা থেকে আমাদের ঘরে করো’না ঢুকে থাকতে পারে।

বাবার পর সেলিম জামানের বড় ভাই সেকান্দর জামান ও তার মে’য়ে এবং ছোট ভাই মামুন জামানও করো’না পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। আক্ষেপ করে তিনি বললেন, এই ভাই’রাস আমাদের জীবনকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

সেলিম জামান বলেন, বাবার একটু জ্বর হয়েছিল রমজানের শেষের দিকে। একসময় জ্বর কমেও যায়। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছিলেন না তিনি। ঈদের পর করো’না পরীক্ষা করিয়ে দেখি পজিটিভ এসেছে। তখন নগরীর একটি হাসপাতা’লে ভর্তি করা হয় তাকে।

সেখান থেকে একটু সুস্থ হওয়ার পর তাকে বাসায় নিয়ে আসি। কিছুদিন পর হঠাৎ করে শ্বা’সক’ষ্ট শুরু হয় তার। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে তাকে আবার হাসপাতা’লে নিয়ে যাই। সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ থাকার পর অবস্থা যখন আরও খা’রাপ হতে থাকে, তখন আইসিইউ সাপোর্ট নিয়ে বাবাকে সার্জিস্কোপে ভর্তি করাই। ওখানে ৬ দিন থাকার পর আবার বাসায় নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। বাবাকে সুস্থ মনে করে আম’রাও বাসায় আনতে দ্বিধা করিনি। কিন্তু ২৩ জুন আবার শ্বা’সক’ষ্ট শুরু হয় বাবার। তখন তাকে দ্রুত হাসপাতা’লে নিয়ে যাই। কিন্তু তখন আর আম’রা আইসিইউ পেলাম না। ফলে বাবাকে আর রাখতে পারলাম না। সেদিনই মা’রা গেলেন তিনি।

চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ খুলশী মুরগির ফার্ম এলাকায় জামান ভবনে বসবাস করে পরিবারের বড় সন্তান মালেকুজ্জামানের পরিবার। মালেকুজ্জামানের পাঁচ ছে’লে ও এক মে’য়ে। এরা হলেন সেকান্দর জামান, সেলিম জামান, আলমগীর জামান, খোকন জামান, মামুন জামান এবং মে’য়ে বেবী জামান।

মেজ ভাই মোহাম্ম’দ জামানের পরিবারের বসবাস নগরীর আল ফা’লাহ গলির জামান ভবনে। তার দুই ছে’লে ও তিন মে’য়ে। এরা হলেন কায়সার জামান, ছোটন জামান, মে’য়ে রোখসানা পারভীন, সাবিনা ইয়াসমিন ও রেহেনা পারভীন মুন্নি।

অন্যদিকে ছোট ভাই নুরুজ্জামান লালখানবাজার বাঘঘোনার জামান ভবনের বাসিন্দা। তার দুই ছে’লে ও দুই মে’য়ে। তারা হচ্ছেন সাকিলা জামান রুবী, সালমা জামান রুণী, সাহেদ জামান ও সাজিদ জামান।

লালখানবাজার বাঘঘোনার বাসিন্দা নুরুজ্জামানের ছে’লে সাহেদ জামান বলেন, ‘ঈদের দিন বাসার পাশে একজন করো’না রোগী মা’রা যান। তার জানাজায় গিয়েছিলেন বাবা। আমাদের ধারণা, সেখান থেকেই আমাদের বাসায় হানা দিয়েছে করো’না। এখন আমা’র ছোট ভাই সাজিদ জামান ছাড়া আম’রা সব ভাইবোন করো’না পজিটিভ।’

তিনি বলেন, ‘বাবা যদি ওই করো’না রোগীর জানাজায় না যেতেন তাহলে হয়তো আম’রা বেঁচে যেতাম। বাবাও জানতেন না ওই লোক করো’না আ’ক্রান্ত ছিলেন। জানাজা শেষে দাফনের পর জানতে পারেন ওই লোক করো’না পজিটিভ ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। বাবার পরপর আম’রাও করো’নায় আ’ক্রান্ত হই। এখন ঘরেই আমাদের চিকিৎসা চলছে।’

মৃ’ত্যুর পর দুই ভাইকে গ্রামের বাড়ি রাউজানের কোতোয়ালী ঘোনার কাসেম ফকির বাড়ির একই কবরস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে জানুয়ারিতে মৃ’ত্যুবরণ করা মেজ ভাইকে দাফন করা হয়েছিল চট্টগ্রাম নগরীর চশমা হিল কবরস্থানে।

সূত্র: চট্টগ্রাম প্রতিদিন

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 3
    Shares