প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ছেন স্বাস্থ্য সচিব

28
স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ছেন স্বাস্থ্য সচিব
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

৯ জুন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দায়িত্ব পেলেন। নতুন দায়িত্ব, এমন একটি শাখায় দায়িত্ব যেখানটার প্রতি এই করো’নাকালে মানুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। কিন্তু সেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দু’র্নীতি। প্রায় সব কাজ থমকে যাওয়ার অবস্থা। এই করো’নাকালে যেখানটা সবচেয়ে সক্রিয় থাকার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে ব্যর্থতা নিষ্ক্রিয়তায় অ’ভিযোগ পাহাড়সম হচ্ছিল।

সেই মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী তার কাঁধে দেন। ভাগ্যের নি’র্মম পরিহাস, দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র ৪ দিন পর ১৩ জুন করো’নায় আ’ক্রান্ত হয়ে মা’রা গেলেন স্ত্রী’ কাম’রুন নাহার। এর মধ্যে ছে’লে মে’য়ে করো’নায় আ’ক্রান্ত। যারা দুজনেই চিকিৎসক। করো’নাকালে মানুষের সেবায় ল’ড়েছেন। এমন অবস্থায় ১৪ দিন থাকতে হলো হোম কোয়ারেন্টাইনে। একজন মানুষ এখান থেকে কিভাবে উঠে দাঁড়ায়?

উঠে দাঁড়িয়েছেন নতুন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান। আর তিনি যে কতটা দক্ষ ও কর্মঠ তার প্রমাণ রাখছেন প্রতিদিন প্রতি ঘন্টায়। কোয়ারেন্টাইনে থাকা অবস্থাতেও তিনি বিশ্রামে ছিলেন না। দাপ্তরিক কাজগুলো ঠিকই সামলাচ্ছিলেন। অফিসের ফাইলগুলো প্রতিনিয়ত তিনি দেখতেন ও স্বাক্ষর করতেন। যখন কোয়ারেন্টাইন শেষ হলো, ২৭ জুনই তিনি মাঠে নামলেন। ২৭ তারিখ অফিস করা শুরু করলেন। সেদিনই জুম মিটিংয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন ক্রিয়েটিভ মিডিয়া আয়োজিত ‘ক্যাম্পেইন ফর অ্যাওয়ারনেস বিল্ডিং টু প্রোমোট হেলদি লাইফস্টাইল টার্গেটিং মেন্টাল হেলথ’কর্মসূচীর সমাপনী অনুষ্ঠানে। সেখানে তিনি কথা বলেছেন নিজের মানসিক অবস্থার।

আবদুল মান্নান নিজের অ’ভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, গত ১৩ জুন আমি আমা’র স্ত্রী’কে হারিয়েছি। তিনি করো’নায় আ’ক্রান্ত হয়ে মা’রা গেছেন। এরপর ১৫ জুন থেকেই আমা’র দুটো সন্তান হাসপাতা’লে। তারা দুজনই ডাক্তার। তারা করো’না পজিটিভ হয়েছেন। তারাও করো’নার বি’রুদ্ধে ল’ড়ছেন। আমা’র ৪ রুমের বাসায় এখন আমি আর আমা’র ছোট ছে’লে থাকি। গত ১৩ দিন ধরে আমি কী’ভাবে বেঁচে আছি, কী’ভাবে চলছি, আমাকে অনেক ভেবে চলতে হচ্ছে। যেমন- আমি সকালে ঘুম থেকে উঠে আমা’র ছোট ছে’লেটার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছি যে, আমি তাকে ডাকবো কিনা, খেতে বলবো কিনা, পড়তে বলবো কিনা। আমাকে খুব মেপে, ভেবে চিন্তে কথা বলতে হচ্ছে। কিছুদিন আগেও আমাকে এটা করতে হয়নি। আমাকে ভাবতে হচ্ছে, আমা’র ছে’লেটা যদি আমা’র সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারে, তাহলে তো আরও বিপর্যয়ের মুখে আমাদের পড়তে হবে। আমা’র ছে’লেটা নটরডেম কলেজে পড়ে। তার মানসিক দিকটা আমাকে ভাবতে হচ্ছে।’

পারিবারিকভাবে বি’ধ্বস্ত এই মানুষটা প্রমাণ করে চলেছেন চাইলেই সব সম্ভব। সদিচ্ছা থাকলেই দেশের মানুষের জন্য কিছু করা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন তার জন্যে ঝাপিয়ে পড়লেন। করো’না মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা একের পর এক বাস্তবায়ন করছেন। ২৭ তারিখ অফিস শুরু করার পরই একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করলেন। ২৮ তারিখ গেলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি কোভিড ১৯ ইউনিট উদ্বোধন করলেন। কোভিড ১৯- এর জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক ইউনিট চালু করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রিতা এবং গড়িমসি করে। কিন্তু আবদুল মান্নান দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএসএমএমইউ– তে কোভিড ইউনিট চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেখানে নিজে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সবটা পর্যবেক্ষণ করেন।

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু আগে বলেছিলেন কোভিড ইউনিট চালু করার জন্য। সেই কোভিড ইউনিট তিনি দায়িত্ব পাওয়ার পরই চালু হয়েছে। ১৫৪ জন নতুন টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দিলেন এই অল্প সময়ের মধ্যে। যারা করো’না মোকাবিলায় অ’ত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সারা দেশের সব চিকিৎসক এবং হাসপাতা’লের সঙ্গে নিয়মিত তিনি যোগাযোগ করেন।

কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ, ডেটাবেইজ তৈরি এবং প্লাজমা দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে প্লাজমা সাপোর্ট সেন্টার তৈরী করলেন মেয়র আতিকুল ইস’লামের সাহায্যে।

প্রত্যেকটি জে’লা উপজে’লা মনিটরিং করার জন্য একজন এডিশনাল সেক্রেটারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই দায়িত্ব তিনি এসে বন্টন করেন। নতুন স্বাস্থ্য সচিব আসার পরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গতি আনার জন্য বিতর্কিতদের একে একে সরিয়ে দেওয়া হলো। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই চ্যালেঞ্জটিও তিনি যথাযথভাবে পালন করলেন। দেশের স্বাস্থ্যখাতের দু’র্যোগ মুহূর্তে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) নতুন পরিচালকের দায়িত্ব দিয়েছেন আবু হেনা মোরশেদ জামানকে। প্রশাসন ক্যাডারের এই অ’তিরিক্ত সচিবকে এমন দায়িত্ব দেওয়ার কারণ তার সততা।

এর আগে তিনি প্রশাসনে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এমন একটি জায়গায় এমন একজন মানুষকে দায়িত্ব দেওয়ার প্রশংসা করছেন সবাই। প্রতিষ্ঠানটি ঘিরে একশ্রেণির অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্য দূর করে সার্বিক কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের বড় চ্যালেঞ্জ এখন তাঁর কাঁধে। প্রতিষ্ঠানটি যে আকন্ঠ দু’র্নীতিতে নিমজ্জিত সেটাকে তিনি ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছেন। সেখানে যে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দু’র্নীতি তা দূর করার চেষ্টা করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে কিছু পরিবর্তন এনেছেন। তাতে যে ইতিবাচক ফল হয় সেটা প্রমাণ হলো এই দুইজন মানুষের জন্য। যেমন তিনি সবার মতো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতা’লের ২০ কোটি টাকা কেলেঙ্কারিকে ধামাচাপা দেওয়া নয়, তিনি এর ত’দন্তের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি আজ সরেজমিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে যেমন সব স্বাস্থ্যকর্মীদের উৎসাহ দিয়েছেন, তেমনি তদারকি করে এসেছেন উঠা দু’র্নীতির ত’দন্ত।

এভাবে তিনি একা ল’ড়ে যাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো যে, এই স্বাস্থ্য সেবা সচিব কি একা ল’ড়ে পারবেন? স্রোতের বিপরীতে একার ল’ড়াই কতটা কঠিন হতে পারে? তিনি আসার পর একটা ইতিবাচক পরিবর্তন সকলেই লক্ষ্য করছেন। স্বাস্থ্য সেবায় যে স্থবিরতা ছিলো তা অনেকটাই কে’টে যাচ্ছে। একের পর এক বিরামহীন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগগুলো দরকার ছিল ফেব্রুয়ারি থেকে। যখন বাংলাদেশে করো’না হানা দেবে আশ’ঙ্কা করা হচ্ছিল। কিন্তু কাজের কাজ না করেই আম’রা প্রস্তুত বলে অনেকে ধোয়া তুলেছেন। স্বাস্থ্য সচিব দায়িত্ব নিয়ে এই কাজগুলো করার চেষ্টা করছেন। এখনো স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্থবির পাথরের মতো ঘরে বসে আছেন। সংসদ সদস্যরা সংসদে দাড়িয়ে তাকে বলেছেন, আপনি সিন্দুক থেকে বেরিয়ে আসেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অদৃশ্য মানবে পরিনত হয়েছেন। হঠাৎ হঠাৎ এসে একটা বিতর্ক ছড়িয়ে দেওয়াই যেন তার একমাত্র কাজ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একের পর এক জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েই চলছে। যার সর্বশেষ উদাহ’রণ পাওয়া গেল ফি নির্ধারণ ও বেসরকারী হাসপাতালকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে করো’না পরীক্ষার অনুমতি। আর এসবের মধ্যে তিনি একা ল’ড়ছেন। তিনি এই ল’ড়াইয়ে জিতুক সেটা দেশবাসী চায়। তিনি পারবেন তো?

তিনি কর্মচারী কর্মক’র্তাদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা তৈরী হয়েছে। সর্বোপরি একটা টিম তৈরী হচ্ছে। এই টিমের মাধ্যমেই একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চাইলেই যে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে পারে তা দেখাচ্ছেন এই নতুন স্বাস্থ্য সচিব। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটা বড় ধরণের ক্ষত আছে। সেই ক্ষত কি দূর করতে পারবে আবদুল মান্নান ও তার টিম? সেটা সময়ই বলে দিবে। কিন্তু এই কয়দিনের বিবেচনায় তিনি আশা জাগিয়েছেন।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares