প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি

❝সময় থাকতে দুঃসময়ের কর্মীদের মূল্যায়ন করুন❞

21
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

‘রাজনীতিকে কঠিন বানাবেন না। শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করবেন না। জমিনে উত্থান দেখেছি, পত’নও দেখেছি। পত’ন হইলে কেউ নাই, বউ ছাড়া কেউ নাই।’ ২০১৯ সালে রাজধানীতে ওয়ার্ড যুবলীগের এক সম্মেলনে কথাগুলো বলেছিলেন তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী। এ সময় যুবলীগ নেতারা করতালি দিয়ে উঠেন। বির’ক্তি প্রকাশ করে ওমর ফারুক চৌধুরী আরও বলেছিলেন, ‘ওই দেখেন তালি পার্টি। এই তালি পার্টিটা কী? আমি একটা কিছু। হনু আসছে, মনে হয় রাজা বাদশা আসছে। যুবলীগে হনুরে দরকার নেই। পত’ন হইলে কেউ নাই, বউ ছাড়া কেউ নাই।’

বিদায়ী যুবলীগ চেয়ারম্যানকে নিয়ে শত সমালোচনা থাকলেও গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে বলতে পারি, রাজনৈতিক বা সহযোগী সংগঠনগুলো যে গবেষণা করে, মূল সংগঠনের নেতার কর্মময় জীবন ও সরকারের সাফল্য বই আকারে প্রকাশ করে, দেশ বিদেশে তরুণ প্রজন্মকে পড়তে ও রাজনীতিতে আগ্রহী করে তোলে, তা তিনি করেছিলেন। তিনি নিজেও পড়ালেখা করতেন। তার বক্তব্য থাকতো লিখিত। দীর্ঘ সময় ধরে বক্তৃতা করতেন, এতে গণমাধ্যমকর্মীসহ অন্যরাও বির’ক্ত হতেন। তবে প্রতিটি কথা ও শব্দ থাকতো সুনিদিষ্ট তথ্যের আলোকে। তিনি গবেষণা করতেন বলেই হয়ত, ঠিকই উপলব্ধি করেছিলেন- ‘পত’ন হলে বউ ছাড়া কেউ থাকে না।’ দাপুটে এই নেতার ধানমন্ডির বাসায় কিংবা অফিসের সামনে ভিড় লেগেই থাকতো। এখন কেউ নেই। ভিড় অন্যত্র।

‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’ এই কথাটি বলার পর কি পরিষ্কার করার দরকার আছে, এটা কার কথা? তারপরও মনে করিয়ে দিচ্ছি, এটা বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কথা। দেশের যত জন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিনোদিত, আলোচিত ও সমালোচিত ছিলেন এই ব্যক্তিটি। সরাসরি হাওয়া ভবনের সঙ্গে কানেকশন। কে ঠেকায় তাকে! আধো বাংলা, আধো ইংরেজিতে কথা বলতেন তিনি। কি দাপুটে লোক ছিলেন! ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট গ্রেনেড হাম’লা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কেরানীগঞ্জের জেলের কনডেম সেলে নিঃসঙ্গ সময় কাটছে এখন তার।

গত ২৮ জুন একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যম অনুসন্ধানী সংবাদে লিখেছে, ‘২০ মাস ধরে বাবরের খোঁজ নেয়নি পরিবার’। এতে বলা হয়, ২০১৮ সালের নভেম্বরের পর থেকে এখন পর্যন্ত তার পরিবারের সদস্য বা আইনজীবীরা কেউ জেলে দেখা করতে যাননি তার সাথে। তাহলে কি ওমর ফারুক চৌধুরীর কথা মিথ্যা প্রমাণ হলো? তিনি বলেছিলেন- পত’ন হলে বউ ছাড়া কেউ থাকে না! বাবরের সন্তান আছে, স্ত্রীও আছেন। তার স্ত্রী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৪ আসন থেকে ধানের শীষ নিয়ে প্রার্থী হয়েছিলেন। প্রার্থী হওয়ার আগেই স্বামীর সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করেছিলেন বলেও ওই সংবাদে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন:  বরিশাল মহানগর থেকে ছাত্রদলের সদস্য সংগ্রহ ফরম বিতরণ

প্রতিষ্ঠার পর ছাত্রলীগকে সবচেয়ে বেশি কল’ঙ্কিত করা- চাঁদা’বাজির দায়ে পদচ্যুত গোলাম রাব্বানীর কথা মনে আছে? বাসার সামনে কত হোন্ডা, কত ছাত্রনেতার ভিড়! সব সময় দেখা যেত, পদ-প্রত্যাশী, দাবি তদবির নিয়ে হাজির বিভিন্ন পর্যায়ের ছাত্রনেতা আর সেলফিবাজ কর্মীদের। শত শত হাত বাড়িয়ে দিতো শুধু ‘ভাইয়ের’ হাতটি ছোঁয়ার জন্য। আর এখন তার বাসার সামনে হোন্ডার শোডাউন দেখা যায়? ফেসবুকময় ‘মানবতার ফেরিওয়ালা’ আখ্যা দেয়া তৈলাক্ত পোস্ট তেমন চোখে পড়ে না। সেই গাড়ি, সেই ভাই ঠিকই ভিড় করে, তবে অন্যখানে। অথচ কি ক্ষমতাধরই না ছিল এই ছাত্রনেতা! এক দিনের মধ্যে যার তার চাকরি খাওয়ার মতোও ক্ষমতা তার ছিল!

কিছুদিন আগে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা একজন মন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে আ’ক্ষেপ করেই বললেন, বিরো’ধী দলে থাকা অবস্থায় তাকে কত সাপোর্ট দিয়েছি। জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে তার সঙ্গে দলীয় কর্মসূচি পালন করেছি। কত রাত জেগে, না খেয়ে থেকেছি। বাইকের পেছনে গ্রামের পর গ্রাম নিয়ে ঘুরেছি। এখন মন্ত্রী হওয়ার পর আর আমরা তার দপ্তরে ঢুকতে পারি না। সেই সময়ে যে সব ছাত্রদল আর শিবির ক্যাডাররা আমাদের পে’টাতো, আমাদের নামে একাধিক মামলা দিত, মন্ত্রী মহোদয় তাদেরকে নিয়েই এখন একান্তে বৈঠক করেন। যত কাজ তাদেরকেই দেন। মনে হয়, আমরাই এখন বিরো’ধী দলে। কথায় কথায় বললেন, এর চেয়ে বিরো’ধী দলেই ভাল ছিলাম। এই দৃশ্য দেখতো হতো না। দীর্ঘ আড্ডা শেষে বললেন, এত কিছু পরও শান্তি, বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আছেন। দেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রা’সের জনপদ এখন শান্তিতে আছে।

করোনার কারণে আর আগের মতো আড্ডা দেই না। তবে সেদিন এক বড় ভাইয়ের বিশেষ অনুরোধ রক্ষা করতে হয়েছে। এই বড় ভাইয়ের সঙ্গে দীর্ঘ আড্ডা হলো। জিজ্ঞেস করলাম ব্যবসা কেমন চলছে? জবাবে বললেন, আমাদের ব্যবসা তো নাম মাত্র চলছে। সব সেক্টরে বিএনপি জামায়াতিদের দাপট। আমরা কাজ পাই না। আমার হাতে গড়া কর্মীর গাড়িতেও পতাকা আছে। কেউ কেউ কেন্দ্রীয় নেতাও হয়েছেন। অনেকে ফোনই ধরেন না। নিরুপায় হয়ে কখনো কারো কারো দরজায় কড়া নাড়লেও নানা ব্যস্ততা দেখায়। কেউ কেউ না চেনার ভান করে। এসব কারনে তাই আর কোথাও যাই না। বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসা দেখভাল করে কোনমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছি।

আমারও উপলদ্ধি- ক্ষমতা আর যৌবন কারোই চিরদিন থাকে না। সবারই সময় এক সময় ফুরায়। তাই সময় থাকতে দুঃসময়ের কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করুন। তেলবাজ, সেলফিবাজদের এড়িয়ে চলুন। এমন অনেকেই জনপ্রতিনিধিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন, যারা জীবনে কখনো জয় বাংলা বলেননি। মাঠে ঘাটে, রাজপথে স্লোগান কিংবা মিছিল করেনি। এমনকি দলের গঠনতন্ত্র সর্ম্পকেও ধারণা নেই। এমন জনপ্রতিনিধি কিংবা ক্ষমতাধরকে ঘিরে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী গড়ে উঠেছে। তারাই এখন সর্বাগ্রে থাকেন। অথচ নিজ এলাকার দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা উ’পেক্ষিত।

আরও পড়ুন:  চোরের খনি এখন ডাকাতের খনিতে রূপান্তরিত হয়েছে : রিজভী

সেই উ’পেক্ষিত ও ত্যাগী পরীক্ষিত নেতারা কেউ কেউ প্রকাশ্যে এ নিয়ে ক্ষো’ভও প্রকাশ করেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নিচ্ছেন। যারাই ক্ষমতাবান আছেন, তারা সত্যকে স্বীকার করেন। ক্ষমতায় থাকলে ভুল ত্রু’টি চোখে পড়ে না। চারদিকে চাটুকার দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকেন। সেজন্যই বলি কী, সময় থাকতে সতর্ক হোন। তেলের সাগরে গা ভাসাবেন না। মনে রাখবেন দুঃসয়ের পাশে থাকারা কখনো আপনাকে তেল মাররে না। মিথ্যা প্রশংসায় আপনাকে সাগরে ভাসিয়ে দেবে না। মানবতার ফেরিওয়ালাও বানাবে না। আপনার শ্যালিকা, শ্যালকের বান্ধবীকে নিয়ে তেল মার্কা স্ট্যাটাস দেবে না। সময় থাকতে তাদের মূল্যায়ন করুন। দুঃসময়ের পাশে থাকাদের সত্য কথা তিতা হলেও কানে নিন। দুঃসময়ের কর্মীরা কখনো নেতার অ’মঙ্গল চান না। তারা বেঈমানি করবে না। কারণ তাদের ত্যাগ ও ঘামের বিনিময়েই আজকে আপনি দায়িত্বশীল পদে কিংবা পতাকা নিয়ে ঘুরছেন।

একটা কথা মনে রাখবেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রীই যাদের উপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছেন, তারা কেউই আর দাঁড়াতে পারেননি। আপনি আজ পদে বা দায়িত্বে আছেন, কালও থাকবেন- এর কোন গ্যারান্টি আছে? কিন্তু আপনি রাজনীতি করতে চাইলে কর্মীদের প্রয়োজন হবেই। খোঁজ নিয়ে দেখুন, যখন আপনি যখন ক্ষমতাবান ছিলেন না, তখন কারা পাশে ছিল? কারা আপনার জন্য কাজ করেছেন? তাদেরকে মূল্যায়ন করুন।

অথচ আজকে আপনি তেলবাজদের মূল্যায়ন করছেন! কালকে পতাকা নেমে যাক, কিংবা দলীয় পদ চলে যাক, আপনার পাশে কেউ থাকবে না। তখন নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হবে। আপসোস করবেন, দুঃসময়ের পাশে থাকা কর্মীদের জন্য। এখন যাদের ভিড়তে দিচ্ছেন না, হয়ত তাদের কাউকে কাউকে পাশে পাবেন, আবার কেউ কেউ অভিমানে দূরেই থাকবে। তাই আবারও বলছি সময় থাকতে দুঃসময়ের কর্মীদের মূল্যায়ন করুন।

লেখক: রফিকুল ইসলাম রনি
পরিচিতি: সাংবাদিক

বাংলা ম্যাগাজিন ডেস্ক !

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 26
    Shares