প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

মাস্ক পুনর্ব্যবহারের বিপদ ও করণীয়

34
মাস্ক পুনর্ব্যবহারের বিপদ ও করণীয়
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বাজারে সাধারণত তিন ধরনের মাস্ক পাওয়া যায়- সার্জিক্যাল মাস্ক, N95 রেসপিরেটর এবং কাপড়ের তৈরি মাস্ক (এর মধ্যে আছে ফোম আর সিনথেটিক কাপড়ের তৈরি মাস্ক বা চাইনিজ মাস্ক)।

এই তিন ধরনের মাস্কের মধ্যে, N95 মাস্ক আর সার্জিক্যাল মাস্ক- দুটোই তৈরি করা হয় একবার মাত্র ব্যবহারের জন্য (ডিসপোজেবল) হিসেবে। দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে মাস্কের মধ্যে বাতাস থেকে আটকানো জীবাণুর সঙ্গে মুখ থেকে বের হওয়া জীবাণু (যার মধ্যে করোনাভাইরাসও থাকতে পারে) লেগে থাকার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। আর যেকোনো মাস্কের ক্ষেত্রেই পরিধানকারীর মুখ থেকে বের হওয়া থুথুর কণা এবং জলীয় বাষ্প জমে এগুলো সহজেই অপরিষ্কার হয়ে যায়। এটি সব মাস্কের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

এ-ধরনের পরিস্থিতি বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর বংশবিস্তার বা বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। এসব কারণে মাস্ক সাধারণত দ্বিতীয়বার ব্যবহার করার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তার সাথে, দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারের কারণে N95 মাস্কের আকার-আকৃতিতেও এক ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

কিন্তু করোনাকালীন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বের নিম্ন বা নিম্নমধ্যবিত্ত দেশগুলো তো বটেই, এমনকি আমেরিকা-ইউরোপের মতো দেশেও প্রয়োজনের তুলনায় মাস্কের জোগান অপ্রতুল। এমনকি এই মাস্ক আন্তর্জাতিক সাপ্লাই থেকে কার আগে কে কেনার সুযোগ পাবে, সেটা নিয়ে এসব দেশের মধ্যে নগ্ন প্রতিযোগিতা চলছে। তাই, বিশ্বজুড়ে একরকম বাধ্য হয়েই ব্যবহৃত মাস্ক পুনরায় ব্যবহার করার উপায় খুঁজতে হচ্ছে।

আমাদের দেশেও এর অন্যথা হওয়ার সম্ভাবনা তো নেই-ই, এমনকি ফ্রন্টলাইনে সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে N95 মাস্কের অপ্রতুলতা অনেক সময়ই খবরের কারণ হয়েছে। এমতাবস্থায় কোন ধরনের মাস্ক আবার ব্যবহার করা যাবে, আর তার জন্য কীভাবে এগুলো জীবাণুমুক্ত করতে হবে, এ ব্যপারে স্পষ্ট ধারণা থাকা সেবা প্রদানকারী সংস্থা থেকে শুরু করে জনসাধারণের জন্য জরূরি।

এখন মাথায় রাখতে হবে, প্রথমবার ব্যবহার করার কারণে যেসব মাস্কের কাঠামোগত সমস্যা (যেমন ফুটো হয়ে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া, আকৃতি পরিবর্তন হয়ে যাওয়া ইত্যাদি) হয়েছে, বা যেগুলোতে দৃশ্যমান ময়লা লেগে আছে, সেগুলো পুনর্ব্যবহার করা একেবারেই যাবে না। তাই শুরুতেই এগুলো ফেলে দিতে হবে।

এবার, N95 মাস্কের ক্ষেত্রে মোটামুটি তিনটা পদ্ধতির ব্যবহার আমেরিকার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) দ্বারা অনুমোদিত। এই তিনটি পদ্ধতি হলো- (১) জীবাণু মারার পক্ষে কার্যকর এমন অতিবেগুনি রশ্মিতে, (২) বাষ্পীভূত হাইড্রোজেন পারক্সাইডে, এবং (৩) গরম জলীয় বাষ্পে নির্দিষ্ট সময় ধরে রেখে দেয়া। পদ্ধতিগুলোর বিস্তারিত এবং এদের কার্যকারিতার আপেক্ষিক তুলনা আমারিকান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশনের (CDC) ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে ।

আরও পড়ুন:  এই পাপীদের দায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তিকে নিতে হবে

এ ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, জীবাণুমুক্ত করতে গিয়ে কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো পদ্ধতি বেছে নেওয়া যাবে না যার কারণে মাস্কের মূল কার্যকারিতা (মানে ছোট কণা বা ড্রপলেট ঠেকানো) ব্যাহত হয়, অথবা মাস্কের কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে পরেরবার ব্যবহারকারীর মুখে ঠিকমতো লেগে না থাকার সুযোগ তৈরি হয়। তাই, যেকোনো পদ্ধতি বেছে নেয়ার আগে এ-বিষয়ে অভিজ্ঞ মাইক্রোবায়োলজিস্টদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। আর প্রক্রিয়া শেষ হবার পরে জীবাণুমুক্তকরণ ঠিকঠাকমতো হলো কি না, এটা পরীক্ষা করে নিতে পারলে ভালো হয়। নাহলে সামান্য ভুলের কারণে ডাক্তার-নার্স বা অন্যান্য সেবা প্রদানকারীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। তারপরও খেয়াল রাখতে হবে, সবগুলো ধাপ ঠিকঠাকমতো সম্পন্ন করার পরেও জীবাণুমুক্ত করা মাস্ক পরিধান করা অবস্থায় জলীয় কণা (যা এরোসল নামেও পরিচিত) সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো কাজ করা যাবে না।

এ তো গেল N95 মাস্কের কথা। কিন্তু কাপড়ের বা সার্জিক্যাল মাস্কের ক্ষেত্রে বিধান কী? এক্ষেত্রে CDC বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে কাপড়ের তৈরি মাস্ক অন্যান্য সাধারণ কাপড়ের মতো সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুলে করোনাভাইরাস বেঁচে থাকার কথা না। সাবান বা ডিটারজেন্টের পরিমাণ ঠিক থাকলে ধুয়ার সময় পানি গরম না হলেও চলবে। তার সাথে রোদে শুকিয়ে নিয়ে পুনরায় ব্যবহার করতে আর কোনো বাধা থাকবে না।

কিন্তু সার্জিক্যাল মাস্কও কি একইভাবে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়া যাবে? উত্তর হচ্ছে, না। সার্জিক্যাল মাস্ক সাধারণ কাপড় দিয়ে তৈরি হয় না বিধায় একে সাধারণ মাস্কের মতো ধুতে গেলে এর কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন হয়, যার কারণে এর কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশিংকা থাকে। তাই এসব মাস্ক কোনো অবস্থাতেই ধোয়া ঠিক হবে না। কিন্তু প্রতিবার এত এত মাস্ক কিনে ব্যবহার করা কি আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বিবেচনা সবার পক্ষে সম্ভব? আর তা যদি না হয়ে থাকে, তাহলে সমাধান কী?

এক্ষেত্রে সুন্দর একটা সমাধান হতে পারে, যদি একেকজনের জন্য কয়েকটা মাস্ক নির্দিষ্ট করা থাকে (ধরে নিলাম পাঁচটা)। একবার একটা মাস্ক পরার পরে সেটা যদি খুব ময়লা না হয়ে থাকে বা অন্য কাঠামোগত কোনো সমস্যা না হয়ে থাকে, তাহলে এটাকে ফেলে না দিয়ে কিছুটা বাতাস চলাচল করতে পারে এমনভাবে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে রেখে দেয়া যেতে পারে। এভাবে (ধরে নিলাম পাঁচ দিন পর) পাঁচ নম্বর মাস্ক ব্যবহার শেষ হলে, প্রথম মাস্কটা (যেটা প্লাস্টিক ব্যাগে আছে) বের করে পরা যেতে পারে।

আরও পড়ুন:  মাফিয়া সাজলেন ক্ষমতার দাপট দেখালেন, তারপর?

এই পদ্ধতি সার্জিক্যাল ও N95 মাস্কের ক্ষেত্রেও খুব কার্যকর একটা সমাধান হতে পারে।

কিন্তু পাঁচ দিন গেলে পরেই যে ভাইরাস মরে যাবে এর নিশ্চয়তা আছে কি? এটা নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, পরিবেশভেদে SARS-CoV-2 ভাইরাস (কোভিড-১৯) কমবেশি তিন দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। তাই, পাঁচ দিন পরে মাস্কগুলো অনেকাংশেই ব্যবহার-উপযোগী হবে এমনটা আশা করাই যায়। এভাবে, যতদিন মাস্কের কাঠামো আর গুণগত মান ঠিক থাকবে, এগুলো ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু N95 মাস্কের ক্ষেত্রে তিনবারের বেশি ব্যবহার না করার ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

সবশেষে ব্যবহৃত মাস্ক কী করবেন

খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ব্যবহৃত মাস্কে করোনাভাইরাস উপস্থিত থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই, এই মাস্ক যত্রতত্র ফেলে দেয়া নিজের বা অন্যদের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে। সেজন্য, ‘বায়োহ্যাজার্ড’ হিসেবে ব্যবহৃত মাস্কগুলো যথাযথ সতর্কতার সাথে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।

হাসপাতাল বা যেকোনো মেডিক্যাল সেন্টারে জীবাণু-বর্জ ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে, যা অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কোনো বিকল্প নেই। আর সাধারণ মানুষেরা বাসায় বা অফিসে, ফেলার আগে সম্ভব হলে মাস্কটি টিস্যু দিয়ে পেঁচিয়ে ‘বায়োহ্যাজার্ড-ব্যাগ’, বা ময়লা ফেলার জন্য আলাদা ‘বিন-ব্যাগ’, অথবা নিদেনপক্ষে পলিথিন ব্যাগের মধ্যে ভরে রেখে দিতে হবে। এতে করে বাইরে ফেলার আগে নিজের বাসাতেই ভাইরাস মরে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।

পরিশেষে, এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে, মাস্ক জীবাণুমুক্ত করে পুনরায় ব্যবহার করার পরামর্শ যদিও স্বাভাবিক সময়ে কখনোই দেয়া হয় না, তথাপি করোনা মহামারির এই দুর্যোগের মধ্যে আমাদের মতো দেশে এটা দরকার হতে পারে। কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিলে, এটা করতে যাওয়ার আগে অনেকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। সর্বোপরি, জনসাধারণের মধ্যে এ-বিষয়ক সচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই এ মহামারি একসময় আমরা জয় করতে পারব সেই প্রত্যাশা করি।

লেখকঃ অণুজীববিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্য গবেষক। কো-অর্ডিনেটর, মাইক্রোবায়োলজি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 6
    Shares