প্রচ্ছদ Featured News

ফলের জুসে ফল নেই, যা আছে তা দেখে হতভম্ব মেজিস্ট্রেট !

111
ফলের জুসে ফল নেই, যা আছে তা দেখে হতভম্ব মেজিস্ট্রেট
ছবি : সংগৃহীত
পড়া যাবে: 2 মিনিটে

সোমবার নারায়ণগঞ্জের জেলার সিদ্ধিরগঞ্জে একটি ভেজাল জুস তৈরির কারখানায় অভিযান চালানোর সময় যা দেখেছেন তাতে হতভম্ব হয়েছেন অভিযান পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট এবং তাকে সহায়তাকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউটের কর্মকর্তারা।

সরজমিনে গিয়ে ভ্রাম্যমান আদালত দেখেন, এই কারখানায় তৈরি করা আমের জুসে ব্যবহার করা হচ্ছে না আম কিংবা অন্য কোনো ফলের রস। পরীক্ষাগার ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন করা হচ্ছে এই পণ্য। কারখানায় রঙ ও কেমিক্যাল দিয়ে এখানে তৈরি করা হচ্ছিল কমলার জুস। রঙ ও কেমিক্যালের মিশ্রণ ভরা হয় বোতলে।বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডের নকল ক্যান্ডি ও নিম্নমানের পাউডার ড্রিংকসে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘ট্যাং’-এর নাম।

অভিযান পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম গোটা দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে যান। শিশুরা এই জুস খাচ্ছে দেখে অসহায় বোধ করেছেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এর মালিক ও ব্যবস্থাপকসহ সাত জনকে আটক করে প্রত্যেককে ১৫ দিন থেকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি জরিমানা করেছেন ১১ লাখ টাকা।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, কারখানায় যে রঙ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি খাবারের নয়। কাপড়ে ব্যবহার করা হয় এই রঙ। ম্যাঙ্গো জুস নামে বেচলেও তাতে আমের কোনো পাল্প নেই। পানির সঙ্গে গন্ধের জন্য দেয়া হয় ম্যাঙ্গো ফ্লেভার। আর মিষ্টি করতে দেয়া হয় স্যাকারিন।

তিনি বলেন, ‘এই জুসগুলো সাধারণত শিশুরাই পান করে। যে আম বা কমলার জুস খাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরণের বায়না ধরে থাকে, সেগুলো যে কী দিয়ে তৈরি হয় তা নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। ফলের জুসের কথা বলা হলেও বাস্তবে ফলের কোন পাল্প এসব ফ্যাক্টরিতে পাওয়া যায় না।’

প্রাণের ফ্রুটিক্স, আকিজের আফি, হাশেম ফুডের সেজান ও এএসটি লিমিটেডের ম্যাংগো কিং জুসেও আম নেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রাসায়নিক পরীক্ষায় এ চিত্র ফুটে উঠেছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে সংগ্রহকৃত উল্লেখিত চারটি ম্যাংগো জুসের নমুনা বুয়েটে পাঠানোর পর গত বছরের ১৭ অক্টোবর বুয়েট রাসায়নিক পরীক্ষার পর যে রিপোর্ট দিয়েছে তাতে দেখা যায়, প্রতিটি ফুড ড্রিংকসে ১০ শতাংশ ফলের রস থাকার নিয়ম থাকলেও তার অর্ধৈক পাওয়া গেছে।

বুয়েটের পরীক্ষায় প্রাণ কোম্পানীর ফ্রুটিক্স জুসে পাল্পের পরিমাণ পাওয়া গেছে শতকরা ৪ দশমিক ৮। আকিজ গ্রুপের আফিতে এর পরিমাণ শতকরা ৬ দশমিক ২। হাশেম ফুডের সেজানে ৫ দশমিক ৪ এবং এএসটি লিমিটেড নামক কোম্পানীর ম্যাংগো কিং-এ পাল্পের পরিমাণ শতকরা ৪ দশমিক ৪। বিএসটিআই-এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি জুসে কমপক্ষে শতকরা ১০ ভাগ পাল্প বা সংশ্লিষ্ট ফলের রস থাকা বাধ্যতামূলক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারে যে সব ফ্রুট জুস পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই ভেজাল। কাপড় তৈরীর রঙ, ঘনচিনি ও স্যাকারিন দেয়া হয় জুসে। আর আম বা ফলের রসের বদলে দেয়া হয় মিষ্টি কুমড়া।

বিএসটিআই-এর একজন কর্মকর্তা জানান, এর আগে প্রাণের ম্যাংগো জুসে আমের পরিবর্তে মিষ্টি কুমড়া মেশানোর প্রমান পাওয়া গেছে।

খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোমল পানীয় ও জুসের নামে আমরা যা পান করছি তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। জুসে ব্যবহার করা হচ্ছে নিষিদ্ধ সোডিয়াম সাইক্লামেট, কাপড়ের রং, সাইট্রিক এসিড ও প্রিজারভেটিভ ( সোডিয়াম বেনজোয়িক ও পটাশিয়াম)। ফসফরিক এসিড এবং ঠান্ডা রাখতে ইথিলিন গ্লাইকলও মেশানো হচ্ছে। জুসের নামে এসব পানীয় দীর্ঘদিন পানের ফলে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদরোগ, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, দাঁতের ক্ষয়, কিডনির সমস্যাসহ নানা রোগ হতে পারে।

শিশু ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পানীয় মানবদেহের জন্য ভয়াবহ হয়ে দেখা দিচ্ছে। ১০ বছর আগেও দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা ছিল ৮০ লাখ। এখন এ সংখ্যা দুই কোটির বেশি এবং তাদের অর্ধেকই শিশু। এ ছাড়া দেশে বছরে অন্তত ৮৪ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। কৃত্রিম সুগন্ধি মেশানো এসব পানীয় গর্ভবতী ও বৃদ্ধদের জন্যও ক্ষতিকর।

সর্বশেষ আপডেট