প্রচ্ছদ গল্প

রাজহংসীর চোখ কাঁদে

21
রাজহংসীর চোখ কাঁদে
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

রোকেয়া আশা

সেখানে গল্প ছিলো রাজহংসী নারীর। রাজহংসীর মতন ধবধবে ফর্সা গলা সেই নারীর। শুধু ত্রুটির মধ্যে ছিলো, তার বেঢপ নাক। শাদা মুখের মানচিত্রে এমন আফ্রিকান নাকের অস্তিত্ব মানতে নারাজ নারীটি তটস্থ থাকতো। তবে, রাজহংসী নারীর ছিলো এক বোন। যমজ। যদিও, যমজ বোনটি শ্যামাঙ্গিনী। অথচ, শ্যামাঙ্গিনীর নাক ছিলো তিরের ডগার মতো তীক্ষ্ণ। চোখের মনিতে আবলুস কাঠের রঙ আর পাতলা ঠোঁটের ডগায় কালো বিন্দু জাগা তিল।

রাজহংসী সম্ভবত আগে বেশ গর্বিতই ছিলো, নিজের উজ্জ্বল রঙ নিয়ে, উদ্ধত কটির নিখুঁত ভাজ নিয়ে। শ্যামলা বোনকে নিয়ে সম্ভবত তার আগে মাথাব্যথা ছিলো না। শাদা সেই নারী নিয়মিত সাজতো এবং হাঁটতো খুব মোহিনী ভঙ্গিতে। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে, হঠাৎ করে কেন তাহলে সে একমাত্র নাকের খুঁত নিয়ে অস্বস্তিতে পড়লো?

এর উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে দু’বোনের শৈশবে। যেখানে, পার্শ্ববর্তী কোন স্কুলে এক কিশোর রোজ লাল রঙের সাইকেল চালিয়ে যেতো। সাইকেলের ক্যারিয়ার না থাকায় কিশোর চলাফেরা করতো একাই। আর সেই সাইকেলের মৃদু টিংটং পেলে দুই বোন ছুটে যেতো জানালার ধারে, যেখান থেকে দেখা যেতো লাল সাইকেলের ওপর কোঁকড়া অথচ সিল্কি চুলের কিশোরকে।

বালিকা দু’জনের বয়স তখন বারো। আর কিশোরের পনেরো। কিশোরের দোষ নেই। সে ভাবেনি ওরা যমজ। এমনকি আপন বোন হতে পারে তাও ভাবে নি। একজন শাদা ঠিক সুমেরুর বরফের ওপর সদ্য পড়া জোছনার রঙ। অন্যজন শ্যামামূর্তি ঠিক। ওদের মধ্যে কি সম্পর্ক – কিশোর ভাবার চেষ্টা করে নি।

কিশোর মাত্র তখন নবম শ্রেণির ছাত্র, যার কাছে জটিল বলতে ছিলো শুধু শূন্যে ছুড়ে মারা বলের ত্বরণ নির্ণয় কিংবা ইলেকট্রন বিন্যাসে এসের বদলে কোনটা পিতে চলে যাবে সেই ভয়ংকর সব প্রশ্ন। নারী, বিশেষত বালিকা নিয়ে খুব মাথা ঘামানোর প্রয়োজনও তার ছিলো না। কিন্তু, জীবন মাত্রই বদলায়। বদলানো জীবনের এই সেই প্রবাহের মধ্যে দিয়ে কিশোর এখন তরুণ হয়েছে। সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আর তার অনুরাগী বালিকারাও ফ্রক ছেড়ে সালওয়ার কামিজ ধরা সদ্য তরুণী। যারা দু’জনই কলেজছাত্রী। দেখা গেলো, দু’বোন পড়াশোনা এমনিতে ভালো করলেও রসায়নে ঠিকঠাক তাদের কি যেন একটা হচ্ছে না। এদিকে আবার একই পাড়ার সেই মেধাবী তরুণ পড়াশুনা করছে রসায়ন বিভাগে। ফলে যমজ কন্যার পিতা একদিন তরুণের বাড়িতে গিয়ে অনুরোধ উপরোধ করে এলেন, নিয়ম করে তার কন্যাদের রসায়ন পড়িয়ে যেতে৷ আকর্ষণীয় সম্মানীর কথা উঠলে তরুণ রাজিও হয়ে যায়।

আরও পড়ুন:  সাহিত্য : জীবন ও সমাজের মুখ

শৈশবের রাজকুমারের এই অপ্রত্যাশিত যাতায়াত শুরুতে দু’বোনই যে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠেছিলো সেটা স্বাভাবিক। তবে অস্বাভাবিক কিছু শুরু হয় মাসখানেকের মধ্যে। যখন, রাজহংসী টের পায়, পড়ার টেবিলের নিচে রাজকুমারের পা বারবার স্পর্শ করছে শ্যামাঙ্গিনীর পাকে। রাজহংসী বুঝতে পারে, কিছু একটা চলছে। আশাভঙ্গ হয়। ভাবতে শুরু করে – কেন সে নয়। ভাবতে গিয়ে দাঁড়ায় আয়নার সামনে। চকলেট রঙের বড় দু’চোখে খুঁটিয়ে দেখে নিজেকে। রঙ কিংবা ফিগার – উচ্চতা? সব তো ঠিকই আছে। তারপর খেয়াল হলো সহসা, নাকটা তার নিখুঁত নয়। বোনের নাক সুন্দর। চোখ সুন্দর। ঠোঁট সুন্দর।

ঠিকই তো করেছে রাজকুমার। শ্যামা সুন্দরীকেই বেছে নিয়েছে। বেচারি রাজহংসীর গলা ধরে আসে, কান্না পায়। সে সাবধানে চোখ মোছে। টেবিলে গিয়ে বসে। মান বের করে কেপি কেসির। এক একদিন বোন কলেজের ক্লাসে অনুপস্থিত থাকতে শুরু করে। রাজহংসী কিছু বলে না। কখনো সখনো আড়চোখে দেখে, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে তার বোনের চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে, যেন সে গনগনে কয়লা জ্বলা উনুনের পাশে দাঁড়ানো। এত রূপ মেয়েটির মধ্যে কোথা থেকে এলো হঠাৎ, রাজহংসী বুঝতে পারে না। দিন গড়ায়।

আরও পড়ুন:  বাজি

বিপত্তি বাঁধে এক সন্ধ্যায়, শ্যামাঙ্গিনী সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে যায় হঠাৎ – আর সাথে সাথে দু’উরুর মাঝের জায়গা ভরে ওঠে খয়েরী রক্তে। রাজহংসী আর তাদের মা বুঝে উঠতে পারে না কিছুই। অচেতন মেয়েটিকে নিয়ে তারা ছোটে হাসপাতালে।
ডাক্তার বেরিয়ে গম্ভীর মুখে বলে, ‘মা বা বাচ্চা – কাউকেই বাঁচানো গেলো না।’

হতভম্ব হয়ে যায় পরিবার। মেয়েটি মারা গেছে বলে, নাকি অবিবাহিত মেয়েটি গর্ভবতী ছিলো বলে – বোঝা যায় না। শ্যামাঙ্গিনী ছিলো যমজদের মধ্যে সাড়ে তিন মিনিটের বড়। তার শ্যামবর্ণ দেখে বাবা নাম রেখেছিলো ‘রাত্রি’। পরের মেয়েটির নাম রেখেছিলো ‘নক্ষত্র’।

নক্ষত্র নামের রাজহংসী নারী এখন আর উদ্ধত কটির ধনুক বাকিয়ে হাঁটে না। সে প্রতি রাত্রিতে ছাদে উঠে নক্ষত্রের ডাকনাম খুঁজে বেড়ায়। তার কান্নায় কখনও-সখনও হয়তো তারাদের মায়া হয়।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।