প্রচ্ছদ আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরিতৃপ্তি থাকলেও নেতৃত্ব নিয়ে চাপা ক্ষোভ আওয়ামী লীগে

সরকার গঠনের পরিতৃপ্তি থাকলেও নেতৃত্ব নিয়ে চাপা ক্ষোভ আওয়ামী লীগে

14
চাপা ক্ষোভ আওয়ামী লীগে
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠনের পরিতৃপ্তি থাকলেও নেতৃত্ব নিয়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে রংপুর আওয়ামী লীগে। তাই দলীয় কার্যক্রমে সবাই একযোগে অংশ নিলেও বিচ্ছিন্নতা ও অন্তর্দ্বন্দ্ব তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে স্থানীয় নেতাকর্মী সবাইকে। সাম্প্রতিক উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে- মনোনয়নবঞ্চিত নেতারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধিতা করেছেন।

গত দু’বারের মতো এবারের জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি মহাজোটগতভাবে ভোটের মাঠে ছিল। আসন সমঝোতার মাধ্যমে রংপুরের ছয়টি আসনের প্রতিটিতেই জিতেছেন মহাজোট প্রার্থীরা। এতে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি এখানে আরও শক্তিশালী হয়েছে।

তবে আওয়ামী লীগে বিভেদ তৈরি হয়েছে সদ্যসমাপ্ত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে। এর মধ্যে রংপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে দল থেকে নাসিমা জামান ববিকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কিন্তু দলের একাংশের সমর্থনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) রংপুর জেলা সভাপতি ডা. দেলোয়ার হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হন। এতে জেলা ও মহানগরের নেতাকর্মীরা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বেশির ভাগ নেতা ববিকে সমর্থন দিলেও একাংশের নেতারা নির্বাচনী প্রচারণা চালান ডা. দেলোয়ারের পক্ষে। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভেতরের দ্বন্দ্ব বাইরে চলে আসে।

এদিকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ও রংপুর-৫ আসনের এমপি এইচ এন আশিকুর রহমানের সঙ্গে জেলা ও মিঠাপুকুর উপজেলা নেতাদের আগেকার দ্বন্দ্ব এখনও দূর হয়নি। সরকারের কোনো উন্নয়নমূলক কাজেও এই এমপির পাশে জেলা নেতাদের দেখা যায় না। মিঠাপুকুর উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গেও তার দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দল থেকে জাকির হোসেনকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও এমপি তার পছন্দের প্রার্থী মেজবাহুর রহমান মঞ্জুকে ভোটের মাঠে নামান বলে অভিযোগ রয়েছে। আশিকুর রহমান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জাকির হোসেন সাধারণ সম্পাদক হলেও দলীয় অনুষ্ঠান আলাদা আলাদাভাবে পালন করে আসছেন।

স্থানীয় নেতারা জানান, আশিকুর রহমানের ছেলে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রাশেক রহমানের কারণে মিঠাপুকুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তাকে ঘিরে দলের স্থানীয় পর্যায়ে নতুন করে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন:  একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার টিকিট পেলেন না যারা

এসব প্রসঙ্গে আশিকুর রহমানের বক্তব্য জানা যায়নি। কারণ তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন। তবে তার ছেলে রাশেক রহমান সমকালকে বলেছেন, উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির হোসেন সরকার মাদকব্যবসায়ী ও অসৎ লোকদের নিয়ে চলাফেরা করেন। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বার কেউই তার পক্ষে নেই। রাজনীতিতে তার অবস্থান কী, তা সময়ই বলে দেবে। অন্যদিকে আশিকুর রহমান কেন্দ্রীয় নেতা। তার গ্রহণযোগ্যতা মিঠাপুকুরের গণ্ডি ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশেও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জাকির হোসেন জানান, রাজনীতি থেকে তাকে মাইনাস করতে গত ৩-৪ বছর ধরে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। তার বিরুদ্ধে নারী কেলেঙ্কারির মিথ্যা মামলা দেওয়ার পাশাপাশি জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে জনগণ তাকে বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত করেছেন। অথচ আশিকুর রহমান ও রাশেক রহমান মনোনীত চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই আসতে পারেননি। এতেই বোঝা যায় উপজেলায় কার জনপ্রিয়তা বেশি। তিনি যাতে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার না নিতে পারেন, সে জন্যও অপচেষ্টা চালিয়েছেন তারা দু’জন। কিন্তু এসবে কোনো কাজ হয়নি। জনগণ তার পক্ষেই রয়েছে।

দ্বন্দ্ব ও ক্ষোভ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলায়ও। সেখানে বিএনপি থেকে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নূর মোহাম্মদ মণ্ডলকে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ায় দলের স্থানীয় পর্যায়ে ফাটল ধরেছে। দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করার দাবিতে উপজেলা নেতারা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচিও পালন করেছেন। এর পরও দলীয় সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না এলে পীরগঞ্জে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোকাররম হোসেন চৌধুরী জাহাঙ্গীর এবং পীরগঞ্জ ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন ভোটের মাঠে নামেন। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নূর মোহাম্মদ মণ্ডল জয়ী হলেও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের তিনজনই এখন দলের আলাদা আলাদা গ্রুপ নিয়ে চলছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন:  মনোনয়নে নতুন মুখের হাসি আওয়ামী লীগে

কার্যালয় জরাজীর্ণ, নেতারা ফুরফুরে : টানা এক দশক ক্ষমতায় থাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতারই আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। যদিও দলের জেলা কার্যালয়ের পুরনো অবকাঠামো পাল্টায়নি।

স্টেশন এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী আনোয়ার হোসেন ও সালেকীন রহমান বলেন, দলের নেতারা শুধু নিজের আখের গোছাতেই ব্যস্ত। অথচ রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে মিটিং পর্যন্ত সবই করতে হয় এ জরাজীর্ণ কার্যালয়ে। জায়গা হয় না বলে অনেক নেতাকর্মীই জেলা কার্যালয়ে গিয়ে সভায় অংশ নিতে পারেন না। তার পরও জরাজীর্ণ কার্যালয়েই চলছে রাজনৈতিক কার্যক্রম।

এদিকে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় রংপুরে ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করতে দেখা যাচ্ছে না তাদের। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে নেতৃত্ব নির্বাচনও তাদের ব্যস্ততার কারণ।

অবশ্য রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাফিয়ার রহমান সফি বলেন, মহানগরের সব ওয়ার্ডেই দলের শক্তিশালী কমিটি রয়েছে। নেতাকর্মীরা সব কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছেন স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে।

সভায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু বলেন, রংপুরে দল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী। দলের নেতাকর্মীরাও ঐকবদ্ধ রয়েছেন। কারা দলের স্বার্থে কাজ করছেন আর কারা দলের নির্দেশ অমান্য করে কাজ করছেন, তা মনিটরিং করছেন তারা। দলীয় নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর দলকে শক্তিশালী করতে প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলার নেতাদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন তারা। যেসব জায়গায় দলীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, সেখানে নতুন কমিটি দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সর্বশেষ আপডেট: