প্রচ্ছদ গল্প

নীড় ও নিসুখ

34
নীড় ও নিসুখ
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

শফিক নহোর

ক.

সামেদ আলী ব্যাপারীর শরীরে টরে শার্ট বুক পকেটে পাঁচশত টাকার নোট অনেক দূর থেকেই তা দেখা যায়। শাদা জামার বুক পকেটে টাকা রাখা তার অভ্যাস।এলাকার মাতব্বর শাদা পোশাক, মাথায় ছাতা পিছনে দুই চারজন মানুষজন হাঁটবে, গা ঘেঁষে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। বাজারের বড় ইলিশ-মাছ, সেরা সবজি, পানের দোকান থেকে শতশত পান সুপারি,জর্দা, এগুলো না নিলে সন্ধ্যায় মর্জিনার সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক হবে,কাচারি ঘরের জন্য এসব লাগে। মাতব্বর মানুষ বলে কথা, তার বাড়িতে গেলে কেউ খালি মুখে ফিরে আসবে অন্ততপক্ষে পান মুখে দিয়ে যাবে। আশে পাশের লোকজন কেউ কেউ তাকে খারাপ বলে, কিপটে বলে চরিত্র নিয়েও টানাটানি করেছে ; এলাকার মানুষ।
প্রচলিত নিয়মেই সমাজে চলতে হয়। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ, ¯‘ুল, কলেজ বাজার, চরের মিটিং-মিছিল সব জায়গায় তার আধিপত্য আছে। সুঠাম দেহের অধিকারি দারাজ কণ্ঠ, ভাসা-ভাসা চোখ, দেখে মনে হতো লোকটা প্রেমিক কখনো দেখে মনে হতো ভিলেন কোয়ালিটির মানুষ। ‘মানুষকে বিচার করতে বসলেই সব মানুষেরই দোষ বের হয়ে আসে।’
ছেলে মেয়ে বড় হয়ে যে যার মতো দূরে চলে গেছে। সেই খেলার মাঠ, বাড়ির বিশাল উঠোন, দক্ষিণে বড় পুকুরপাড় ছেলে মেয়েদের স্মৃতি চোখের কোণায় ভেসে ওঠে তার। বছরের পর বছর, পার হয়ে গেছে কেউ বাড়িতে আসতে চায় না। গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ থাকেনা, রাস্তায় কাদা, মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। কত রকম তাল বাহানা করে তাঁর বাবার সঙ্গে। এবারের ঈদে ছেলে-মেয়ে কেউ আসবে না। ফোন করে আগেই তাকে জানিয়ে দিয়েছে ; এ নিয়ে ব্যাপারীর ভীষণ মন খারাপ, সকালে মুখে কিছু না দিয়েই বাসিমুখেই বের হয়েছে ; চরের সালিশ করতে।
এই মানুষটাকে দেখেছিলাম,তার ছেলেমেয়েদের জন্য পরম মায়া মমতায় দিনের-পর-দিন খেয়ে —না খেয়ে মাঠে-ঘাটে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, সন্ধ্যা অবধি বাজার থেকে মাছ কিনে নিয়ে এসেছে, এবং-নিজে তা রান্না করে বা’চাদের খাইয়ে মানুষ করেছে। লেখাপড়া শিখিয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ছেলে-মেয়েদের। ‘তবে একটাও মানুষ হয়নি।’ ব্যাপারী এবার খুব আহ্লাদ করে ছেলে মেয়েদের সঙ্গেই ঈদ করতে চেয়েছিল ৃ!
মেয়ের ঘরে নাতি আসছে ; তাকে নিয়ে খেলবে,বাজারে যাবে। ছেলেমেয়েদের অনেক অর্থকরী হয়ে গেছে এখন। গ্রামের- প্রতি এক ধরনের ঘৃণা তৈরি হয়েছে মনে। গ্রামে গরিব মানুষ থাকে, টাকার জন্য কেউ আসবে। অথবা বড় ধরনের সাহায্য চাওয়ার জন্য সাত সকালে এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিবে। এ ঝামেলা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে বুদ্ধি মানের কাজ করছে, ছেলেমেয়েরা হয়তো এভাবেই ভাবছে ; তা না হলে নিজের জন্ম ভিটাকে কেউ এমন ঘৃণা করে, বাবাকে অবহেলা করে। অমানুষ,অমানুষ, অমানুষ — ব্যাপারী নিজেই বিরবির করতে করতে কাচারি ঘরে বসে বাড়ির সামনের ধানের জমির দিকে মায়াবী চোখে কি যেন অপলক দৃষ্টিতে দেখছে।
একদিন বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে নুয়ে পড়েছে ধানের বোঝা নিয়ে ব্যাপারী, সারাদিন বৃষ্টি হয়েছে, রাস্তায় কাদা, ভেজা লুঙ্গি গামছা মাথায় করে ছুটছে। কেউ এসে সহযোগিতা করবে হাত বাড়িয়ে দেবে, এমন মানুষ বাড়িতে নেই। বউ মারা যাওয়ার পর থেকেই সামেদ আলী ব্যাপারী নিঃস্ব, অপারগ। ছেলে-মেয়ে গুলো চাঁড়াল। গ্রামের সোঁদা মাটির গন্ধে মানুষ হয়েছে ; গ্রামের আম,তরমুজ, বেদানা,আতা, পেয়ারা, তরমুজ, পুকুরের মাছ, বিলের মাছ, পদ্মার ইলিশ। এসব রেখে শহরের চার দেয়ালের কয়েদী জীবন মেনে নিতে পারবে না ব্যাপারী। সবুজের সঙ্গে বেড়ে ওঠা, যার সময় কাটে প্রকৃতির সঙ্গে- মাটির সঙ্গে, নিবিড় মমতায় ভালবাসায় সেই মানুষ ইট পাথরের ভেতর থাকতে পারবে না কখনো। যদিও বউ মরে যাবার প্রথম দিকে ব্যাপারীর আদর-যতœ ছিল বেশ ভালই ছেলেমেয়ের কাছে। কিছু জমিজমা ছেলেমেয়ের নামে দিয়েছে, তার পর থেকেই পল্টি বাপের সঙ্গে।
তবুও তো নিজের ছেলেমেয়ে বাবার খবর নিতে পারে, কখনো নেয়নি। বউ মরে যাবার পরে যেই মুখ ফুটে ব্যাপারী বলেছিল, বিয়ে করবে, সেই জাত গেল জাত গেল বলে, মেয়ে-ছেলে শহর মুখী হয়েছে ; সেই থেকে কেউ আর কোন খবর নেয়নি। নিজের দেখভাল করবার জন্য হলেও একজন মানুষ প্রয়োজন। বিয়ে শুধু জৈবিক চাহিদার জন্যই নয়,একে অপরের সাহায্য সহযোগিতায় পাশে থাকার জন্য হলেও একজন মানুষ প্রয়োজন। ছেলে-মেয়ে এত শিক্ষিত, তার বাবাকে বুঝতে শিখেনি, চেনেনি। নিজেদের স্বার্থ নিয়ে পড়ে আছে ; নিমকহারামি। দবুড়া মানুষের প্রসাব-পায়খানা পরি®‘ার করবে কে?’ রান্না করবে কে? গ্রামের মাতব্বর এখনো এলাকার মানুষ তার কাছে আসে। ভালমন্দ দুটি কথা শোনার জন্য। পরামর্শ নেবার জন্য। গ্রামের সালিশ দরবার এখনো নিজেই করে। গ্রামের মানুষ সম্মান দেয়। শুধু নিজের ছেলে-মেয়েদের কাছে নিজের ইজ্জত পায়নি কখনো ব্যাপারী।
খ.
গোয়ারিয়া বাজারে পাচুর, চায়ের দোকানে বসলে, লোকজন নানা রকম কথা বলে, বয়¯‘ মানুষ সবাই ছেলে-মেয়ে নাতি, নাতনী মেয়ের বাড়ির গল্প করে। বউকে ডাক্তার দেখানো, প্রেসার, ডায়াবেটিস, হাঁপানি বেড়েছে, আগের ডাক্তার ভাল ছিলো না কত কথা ব্যাপারীর কানে আসে। কেউ একজন পিছন থেকে বলে উঠলো, আমাদের দুলাল মাস্টারের ছাওয়াল কানু পোদ্দার কিন্তু খুব ভাল ডাক্তার। আমি দুলাল মাস্টারের বাড়ির উপরে গেলাম। কানুর বাড়ি আসার কথা শুনে, কি ভদ্র মানুষ গো বাবা, আমার প্রেসার মেপে দেখল, কিছু ওষুধ লিখে দিলো, বললো কাকা ঢাকা আসবেন, কিছু টেস্ট করানো দরকার?
আমার মুখ ফসকে বের হয়ে গেল,
– ডাক্তারা শুধু টেস্ট দেয় এখন।
– কাকা আমার উপর ভরসা রাখবেন, আমি টাকার লোভে আপনাকে বেশি টেস্ট দিবো না। ভয় পাবার কোন কারণ নেই, তাছাড়া শুনেছি, ছেলে-মেয়েরা আপনাকে দেখতে পারে না। গান বাজনা করেন বলে এই বয়সে। তাহলে সংসার চলে কি ভাবে? কত কথা হলো, আমাকে পান খাবার কথা বলে পকেটে পাঁচশত টাকার একটা নোট গুঁজে দিলো। আমার চোখ দিয়ে অশ্রæ গড়িয়ে পড়ল। চোখের জল সবসময় বেদনার হয়না, আনন্দের ও হয়। আমার গর্ব হয়। আমাদের গ্রামে এমন একজন মানুষ আছে।
গ.
সামাদ আলী ব্যাপারীর মন খারাপ হয়ে গেল। তার ছেলে গুলো হয়েছে হারামি। এ বয়সে- ছেলে মেয়েদের কেউ প্রশংসা করলে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে, বাবা মায়ের। কিন্তু সেখানে যদি উল্টো দুর্নাম শুনতে হয়, তখন বুকের জমিনে ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়। আহা এ জীবন বড়ই বৃথা। মর্জিনা দাদা মনে করেই সামাদ আলী ব্যাপারীর রাতে ভাত রান্না করে দিতো, সেই প্রথম থেকেই কত মানুষের বাজে কথা শুনতে হয়েছে ; ত্রি-ভুবনে মর্জিনার কেউ নেই, বিয়ে হয়েছিল অনেক বছর হলো। স্বামী নেশা করতো, রাত করে বাড়ি আসত, ঘরে অভাব, সংসারে আলো জ্বলে -নিভুনিভু করে, সন্তান হয়না বলে স্বামী তাড়িয়ে দিয়েছে। এ বাড়ির ভিটাটুকু ছাড়া কিছু নেই। আকার ইঙ্গিত দিয়ে ব্যাপারী বিয়ের কথা বলেছিল,
-মর্জিনা তোর আপত্তি না থাকলে, আমাদের বাড়িতে থাকতে পারিস, আমার বয়স একটু বেশি। আমার ছেলে-মেয়ে তোকে কখনো মা বলে মেনে নিবে না। আমার ও যে একজন মানুষ দরকার —রে, মর্জিনা। শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করে। কতদিন হলো তোর দাদী মরছে। সে মরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে আমার সবকিছু মরে গেছে। আমি আর এখন কোন পুরুষ মানুষ নাই—রে। শুধু একজন মানুষ হয়ে বেঁচে আছি।আমার এক পা কবরে এক পা ডাঙ্গায়।
– দাদা আপনাকে আপন করে নিতে আমার কোন আপত্তি নাই, আমিও মন থেকে আপনাকে সেবা করতে চাই, সমাজের কুচোখ বন্ধ করতে আমাদের সমাজের আইনে ঘর করতে হবে। রাতবেরাতে আপনাকে রান্না করে দেওয়া, সেবা করা, আমার কোন সমস্যা নেই। তবে মানুষ তা ভাল চোখে দেখে না।‘ এ সমাজে কেউ চায় না কারো দিয়ে কারো উপকার হোক।’
মর্জিনা তোকে লাল শাড়িতে এত সুন্দর লাগে কখনো কল্পনা করিনি। আমি কথা দি’িছ তোকে ঠকাবো না। তোর নামে দুবিঘা সম্পত্তি লিখে দিবো। যাতে আমি মরে যাবার পরে, তোকে কেউ এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে না পারে। আমার ছেলে –মেয়ে শিক্ষিত, ভদ্র, কিন্তু অমানুষ। শেষ বয়সে মানুষের একজন সঙ্গী লাগে, সত্যিই একজন সঙ্গী লাগে। আমার ছেলে-মেয়েরা কখনো তা বোঝেনি। আমার ঘরে নতুন মানুষ আসলেও সেলিমের মাকে কোনদিন, কোন সময়ের জন্য ভুলে থাকা সম্ভব হয়নি। সেলিমের মা বড় ভাল মানুষ ছিল। আমার ছেলে-মেয়েরা মনে করছে বাপ বিয়ে করে, ভুলে যাবে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক কেউ কখনো ভুলে যায় না। তবুও ছেলে-মেয়েদের জন্য আমার দোআ ওরা যেন ভাল থাকে সর্বক্ষণ।
নোট : ্রএই গল্পের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই, কেউ যদি মিল খুঁজে পান তাহলে তা অনি’ছাকৃত এবং কাকতালীয় ঘটনা মাত্র।’

আরও পড়ুন:  বুক রিভিউ : সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares