fbpx
প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

নারী মাত্রই দোষ!

12
Women Chapter

পড়া যাবে: 4 মিনিটে

আসমা সুলতানা প্রভা:

নারী! নারী মাত্রই তো দোষ! জগতে যা-ই ঘটুক, ওই নারীরই দোষ। নারীর চলনে দোষ, বলনেও দোষ। নারী ছলনাময়ী, নারী কলঙ্কিনী, নারী প্রতারক, নারী দুর্বল, নারী চরিত্রহীন—যত খারাপভাবে নারীকে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায় খুব সানন্দে করা হয়। এই হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছু খণ্ডচিত্র। প্রতিটি কাজে, প্রতিটি বিষয়ে নারীকে দায়ী করা বা অপদস্থ করা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুব ছোটবেলায় একটা কথা সবসময় শুনতাম:

‘ভাই বড় ধন রক্তের বাঁধন
যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ।’

ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে বাবা-মার থেকে আলাদা হলে এই প্রবাদের জুড়ি ছিলো দেখার মতই। শুধু তা-ই নয়, সন্তান খারাপ হলে মায়ের দোষ। অন্যদিকে সন্তান ভালো কিছু করলে বাপকা বেটা/বেটি। অর্থাৎ সন্তানের খারাপ কিছুর ভারটা মায়ের দিকেই যায় সবসময়। আর যা কিছু ভালো সব কৃতিত্ব বাবার। স্ত্রী থাকা স্বত্তেও যদি স্বামী অন্য সম্পর্কে জড়ান তো স্ত্রীর দোষ। স্বামীর কোনো দোষ থাকে না। স্ত্রী ঠিকভাবে স্বামীকে ধরে রাখতে না জানলে তো স্বামী এমন করবেই। খুব স্বাভাবিক। কিন্তু একই কাহিনি যখন স্ত্রীর ক্ষেত্রে ঘটে তখন স্ত্রীর চরিত্র নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। একজন পুরুষের দ্বিতীয় বিয়েকে যেভাবে আমরা অতি সহজে মেনে নিতে পারি ঠিক ততটা সহজে নারীর টাকে পারি না। নারী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে থাকে সেখানেও উঠে আসে তার চরিত্র নিয়ে কথার ফুলঝুরি। একজন ডিভোর্সী নারীকে যতপ্রকার কথার মুখোমুখি হতে হয় একজন পুরুষকে কিন্তু তা করতে হয় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী গত সাত বছরে ডিভোর্স দেওয়ার প্রবণতা ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। কারণ হিসেবে দেখা যায় স্বামীর সন্দেহবাতিক মনোভাব, পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক, যৌতুক,মাদকাসক্তি, স্বামীর অবাধ্য হওয়া, ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী না চলা ইত্যাদি। কিন্তু এতো কারণ থাকা সত্ত্বেও পুরো দায়ভার নারীকেই নিতে হয়।

আমাদের সময় ডট কম এর এক কলামে আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছেন– “চরিত্র শব্দটি শুধু নারীর সঙ্গে সম্পর্কিত। নারী ডিভোর্স দিলে দোষ, একাধিক বিয়ে করলে দোষ। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে সবসময় তার দোষ খোঁজা হয়। পুরুষ যা খুশি করবে, ডজন ডজন বিয়ে করবে , অগনিত মেয়ের সঙ্গে পরকীয়া করবে, গণিকালয়ে যাবে, কিন্তু এতে তার চরিত্রের সামান্য ক্ষতি হবে না।”

একদমই ভুল বলেননি বটে। পতিতাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করা নারীকে যেভাবে খারাপ বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করা হয়, এই পতিতালয় সচল থাকে যে পুরুষদের দ্বারা তাদের নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামানোর সময় আমাদের হয়ে উঠে না। পুরুষ হওয়ার এই সুবিধা যদি একজন নারী আগেই জানতেন, তবে হয়তো পুরুষ হয়েই জন্মাতে চাইতেন। এই যে আমরা সবকিছুতে নারীর দোষ খুঁজে বেড়াই, এটা আসলে ঠিক কোন কারণে করে থাকি?

আরও পড়ুন:  জীবন মানেই থামতে মানা

যদি উত্তর বলতে হয় তাহলে সেটা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’। আমরা একজন নারীকে যেভাবে দেখা উচিত সেভাবে দেখার চেষ্টাটুকু কখনোই করি না। আমাদের কাছে নারী মানেই একটা এলিয়েন। যেন ভুল পরিবেশে ভুলভাবে তাদের বেড়ে উঠতে হয় প্রতিনিয়ত। যুগে যুগে নারীকে শুধুমাত্র ‘যৌনতা’ বা ‘সেক্স’ এর অবজেক্ট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখনো মানুষ সেটা থেকে কিঞ্চিৎ বের হতে পারেনি। মানুষের মধ্যে এই বিষয়টা এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, কোনো নারী যদি অপরাধও করে থাকেন তবে তার অপরাধের চেয়েও মুখ্য হয়ে উঠে তার রূপ, তার শারীরিক গড়ন এবং তার চরিত্র।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই আলোচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। করোনার নমুনা পরীক্ষার নামে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার হন জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ। একই কারণে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ জাহেদি বা সাহেদ করিম এবং জেকেজি হেলথ কেয়ার এর মালিক আরিফুল চৌধুরীও গ্রেফতার হন। কিন্তু এই দুইজনকে ছাপিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে থাকেন সাবরিনা আরিফ। যে কারণে বা যে অপরাধে তিনি গ্রেফতার হয়েছেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে ব্যাক্তি সাবরিনা ও তার চরিত্র। গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তাকে নিয়ে যেভাবে অশ্লীল মন্তব্যগুলো করা হয়েছে, তা ছাপিয়ে গেছে তার অপরাধকেও। শুধুমাত্র নারী হওয়ার কারণেই কি এতোকিছু?

ডয়চে ভেলে’তে অমৃতা পারভেজ লেখেন, “এ ধরনের ঘটনায় যখন কোনো পুরুষ অভিযুক্ত হন তখন কিন্তু তার ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয় না। আমাদের সমাজে নারীদের যে কেবল ভোগের বস্তু মনে করেন বেশিরভাগ পুরুষ তা আবারও প্রমাণিত হলো সাবরিনার ঘটনায়।”

আমরা খুব সহজে সমাজের উপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে বিষয়টিকে এড়িয়ে যাই। আমরা কথায় কথায় বলি এইসবের জন্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দায়ী। প্রকৃতপক্ষে দায়ী হলো আমাদের ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ বা আমাদের দেখার চোখ। আমরা পুরুষের চরিত্র নিয়ে কথা বলি না। বলি নারীর চরিত্র নিয়ে। আমাদের চোখ যেভাবে পুরুষের কাজগুলোকে সহজে মেনে নিতে পারে, নারীর ক্ষেত্রে সেটা পারে না। এজন্যই তো ধর্ষণ করার পরও ধর্ষকের বিন্দুমাত্র কাঠখড় পোহাতে হয় না, যেভাবে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে পোহাতে হয়। মেয়েটির চরিত্র নিয়ে তো কথা হয়ই, তার উপর মা-বাবাকে শুনতে হয় মেয়ের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য। সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার যেন একজন নারী ধর্ষণের সাথে সাথেই হারিয়ে ফেলেন। যার ফলে বেশিরভাগ নারী সেটা চেপে যান।সহজে মুখ খুলতে চান না। আমরা অনেকেই ভেবে থাকি যে নারী যদি স্বাবলম্বী হন, তবে হয়তো এইসব থেকে মুক্ত থাকতে পারবেন। নারী যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে পুরুষকেও ছাপিয়ে যান, তবে সেখানেও তাকে শুনতে হয় অগনিত অশ্লীল মন্তব্য।

আরও পড়ুন:  আমাদের একজন পুরুষ অভিভাবকই কেন দরকার!

এই নিয়ে উইমেন চ্যাপ্টারে ইসরাত জাহান প্রমি লেখেন, “এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যেন পুরুষের সব দোষ সুনিপূণভাবে নারীর কাঁধে চাপাতেই বেশ পারদর্শী।”

খুব সাধারণত নারীদের সকল দিক থেকে পুরুষের চেয়ে দুর্বল ভাবা হয়। এক পরিসংখ্যানের ফলাফল চমকে দেওয়ার মতোই বটে। জাতিসংঘের এক নতুন প্রতিবেদনে উঠে আসে বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ শিক্ষায়, কর্মক্ষেত্রে ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বিষয়ে নারীদের চেয়ে পুরুষদের বেশি উপযুক্ত মনে করে। আরো বলা হয় বিশ্বের ৩০ শতাংশ মানুষের মতে, স্বামীর হাতে স্ত্রীর প্রহৃত হওয়ার পেছনে অবশ্যই কোনো না কোনো যুক্তি রয়েছে।”

এটাই আমাদের নারী সম্পর্কে চিন্তাধারা। আমাদের মনোভাব। একজন নারীকে শুধুমাত্র নারী নামক শব্দ দিয়ে অপদস্থ করার মানসিকতা থেকে যেদিন আমরা বের হয়ে আসতে পারবো, যেদিন একজন নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার চোখ আমাদের তৈরি হবে, যেদিন নারীকে একজন মানুষ হিসেবে যথার্থ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারবো, যেদিন নারীকে একটি শারীরিক অবয়বে চিন্তা না করার মানসিকতা তৈরি হবে আমাদের, সেদিন হয়তো নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া দোষের বোঝাও কমতে শুরু করবে। সেদিন আমরা সত্যিকার সভ্য জাতিতে পরিণত হবো। কিন্তু তার জন্য দরকার পরিবর্তনের। আমাদের ‘দৃষ্টিভঙ্গির’ পরিবর্তনের। একটি সুন্দর পৃথিবীর বুনিয়াদ হতে পারে আমাদের “অসাধারণ দেখার চোখ”।

 

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

প্রিয় পাঠক, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, [email protected] ঠিকানায়। অথবা যুক্ত হতে পারেন @banglanewsmagazine আমাদের ফেসবুক পেজে। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

  • 10
    Shares