দেশে ফিরছেন ক্যাপ্টেন নওশাদ, তবে লাশ হয়ে

ওমানের মাস্কাট থেকে শুক্রবার (২৭ আগস্ট) ভোর সাড়ে ৬টায় ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়ন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-২২ ফ্লাইট। মাঝ আকাশে বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন বিমানের পাইলট ক্যাপটেন নওশাদ আতাউল কাইউম। এ সময় তিনি কো-পাইলটের কাছে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করেন।

এমন পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি এড়িয়ে ফ্লাইটটি ভারতের নাগপুরের ড. বাবাসাহেব আম্বেদকর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। ওই ফ্লাইটে যাত্রী ছিলেন ১২৪ জন। পরে জানা যায়, নওশাদের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।

ওই দিন রাতেই বিকল্প পাইলট ও ক্রু পাঠিয়ে বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। আর নওশাদকে ভর্তি করানো হয় নাগপুরের কিংসওয়ে হাসপাতালে।

এদিন নওশাদ ও তার ফার্স্ট অফিসারের বুদ্ধিমত্তায় নতুন জীবন পেয়ে যাত্রীরা নিরাপদে দেশে ফিরলেও শেষপর্যন্ত নিজে ফিরতে পারলেন না। ভারতের নাগপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পাইলট নওশাদ আতাউল কাইউম সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

টানা ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ‘কোমায়’ থাকার পর সোমবার (৩০ আগস্ট) স্থানীয় সময় ১০টা ৪৫ মিনিটে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে দেন ভারতের নাগপুরের কিংসওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুব সোমবার দুপুর পৌনে ২টায় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ক্যাপ্টেন নওশাদের ভ্যান্টিলেশন বাংলাদেশ সময় সকাল ১১টার দিকে খুলে দেয়া হয় এবং তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তার মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’

জানা যায়, ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম ১৯৭৭ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ২০০২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে পাইলট হিসেবে যোগদান করেন।

নওশাদ ও তার ফার্স্ট অফিসারের কারণে এবার ১২৪ জীবন রক্ষা পেলেও এটি প্রথম নয়। ২০১৭ সালেও এমন বীরত্ব দেখিয়েছিলেন তিনি। সেবার বাঁচিয়েছিলেন দেড়শ যাত্রীর প্রাণ।

ক্যাপ্টেন (প্রধান পাইলট), ফার্স্ট অফিসার (পাইলট) আর পাঁচজন কেবিন ক্রু। আর যাত্রী ১৪৯ জন। ২২ ডিসেম্বর ওমানের স্থানীয় সময় রাত তিনটায় দেড় শতাধিক আরোহী নিয়ে মাস্কাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে আকাশে উড়াল দিতে যাচ্ছিল বাংলাদেশ বিমানের বোয়িং। কিন্তু মাসকট বিমানবন্দরে রানওয়ে থেকে উড়াল দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে উড়োজাহাজটিতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

ক্যাপ্টেন নওশাদ আতাউল কাইয়ুম ও ফার্স্ট অফিসার মেহেদী হাসান বুঝতেও পারছিলেন কী ঘটেছে। ১৮ টন জ্বালানি আর উড়োজাহাজটির ওজন ৬০ টন। সব মিলিয়ে ৭৮ টন ওজনের বিশাল উড়োজাহাজের ওমানে জরুরি অবতরণ করাও অসম্ভব। একটু এদিক-সেদিক হলেই পুরোপুরি বিস্ফোরিত হতো উড়োজাহাজটি। তবে পাঁচ ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় জরুরি অবতরণ করান ক্যাপ্টেন নওশাদ।

সেবারের ঘটনায় অনবদ্য অবদানের জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছিলেন ক্যাপ্টেন নওশাদ। বৈমানিকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএফএএলপিএ) প্রশংসাপত্র পেয়েছেন ৪৪ বছর বয়সী এই বৈমানিক।

সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে-বিদেশে কথাও বলেছিলেন। নওশাদ বলেছিলেন, যখন আপনি উড়তে যাবেন সে মুহূর্তে ইট-পাথর যা–ই সামনে আসুক না কেন, উড়তেই হবে। উড়ার পরপরই ক্রুরা এসে জানিয়েছিল পেছনে বিকট শব্দ হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক। পেছনে যাত্রীরা শব্দ বেশি শুনতে পান। সবার আগে দরকার মাথা ঠান্ডা রাখা। ৬০০ ফুট উঁচুতে উড়োজাহাজটি উড়লে মাসকট এয়ারপোর্টের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারি রানওয়েতে টায়ারের অসংখ্য টুকরো কিন্তু উড়োজাহাজের কোনও টায়ারের ক্ষতি হয়েছে কিনা কেউ জানাতে পারেনি। এরপর পুরো পথ কেবল সম্ভাব্য কী কী ভাবে নামতে পারি সেইসব গবেষণা করতে শুরু করি।

সেবার চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা থাকলেও যেতে পারেননি। হিসেব নিকেশ তাদের বলেছিল ঢাকায় নামতে। নওশাদ তার অভিজ্ঞতা বর্ণনায় বলেছিলেন, সিদ্ধান্ত নেই যেভাবেই হোক ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করাতে হবে। কেননা টায়ার যদি ফাটে তাহলে উড়োজাহাজে আগুন ধরার আশঙ্কা থাকে, ঢাকায় সেটা সামলানো সহজ। এই জটিল সব হিসাব-নিকাশের সিদ্ধান্ত যখন নিচ্ছেন তখনও যাত্রীদের কিছু জানতে দেননি তিনি। কিন্তু বিপাকে পড়েন যখন তাদের জানানো হয় চট্টগ্রাম নয়, নামবেন ঢাকায়। এই কথা শুনেই যাত্রীরা ভয় পান কিছুটা। নওশাদ তার স্বভাবসুলভ তীক্ষ্নতায় যাত্রীদের জানান, চাকার সমস্যা ও কুয়াশার কারণে ঢাকায় ল্যান্ডিং, অন্য কিছু নয়।

Leave a Comment