প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

আমার বন্ধন নেই, মুক্তিও নেই

6
Women Chapter

পড়া যাবে: 4 মিনিটে

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

আগে স্বামী মারা গেলে সহমরণের জন্য চিতায় নেয়া হতো হিন্দু মেয়েদের, এরপর সেটা বন্ধ হলো আইন করে। এরপর শুরু হলো স্বামী মারা গেলে গয়নাগাঁটি খুলে, চুল কেটে,সাদা থান পরিয়ে, নিরামিষ খাইয়ে বিধবাকে সংযত ভাবে রাখা। মোডিফাইড ওয়েতে এটার ধারাবাহিতা এখনও চলছে হিন্দু পরিবারে, যদিও অনেক ব্রাহ্মণ নারীও এইসব কুসংস্কার মানতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করছেন এখন। কিন্তু ইদানিং একটা ভয়াবহ নিউ ট্রেন্ড দেখছি হিন্দু পরিবারে, সেটা হলো স্বামী মারা যায়নি, বিধবা নয়, ডিভোর্সডও না, কিন্তু সম্পূর্ণ একা স্ত্রীকে সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে চলতে হচ্ছে। স্বামীটি তার সঙ্গী হিসেবে একাধিক মানুষ বেছে নিচ্ছে, স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে যা তা করছে লাগামহীনভাবে। সাতজন্মের বন্ধন তার ক্ষেত্রে শাস্ত্রে প্রযোজ্য হলেও বাস্তবে হচ্ছে না।

আর স্ত্রীটি সন্তানকে একা মানুষ করছে, ভরণপোষনসহ সব করছে আর আর জীবিত স্বামী ওরফে পিতা তার পছন্দমতো কোনপ্রকার জবাবদিহিতাহীন জীবন যাপন করছে। একটা মেয়ে একা সব দায়িত্ব পালনে বাধ্য, কারণ সে মা, সন্তানকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার নেই, নিচে নামার ক্ষমতা নেই, একবার বিয়ে হয়েছিলো তাই তার জীবনে নতুন করে প্রেম, ভালবাসা নিয়ে ভাবার অধিকার নেই, কিন্তু যে স্বামী, বাবা, সে কিছুতেই বাধ্য নয়। বিষয়টা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। ষাট বছরের একজন হিন্দু ব্যক্তি সেদিন শুনলাম স্ত্রীর মৃত্যুর সাথে সাথে একাকিত্ব ঘুচানোর জন্য পারিবারিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু এরাই আবার বুঝেন না জীবিত স্বামীর সংসার করার অক্ষমতায়ও হিন্দু নামকা ওয়াস্তে বিবাহিতা অল্প বয়সী মেয়েরও একাকিত্ব হয়, তারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে, তারও শরীর থাকে।

হিন্দু বিবাহিত পুরুষের জীবনে স্ত্রী জীবিত অবস্থায় স্ত্রী, সন্তানের দায়িত্ব অস্বীকার করে একাধিক নারীসঙ্গের উপস্থিতির শাস্ত্রসম্মত বিধান শাস্ত্রের কোন পাতায় আছে একটু দেখতে চাইছি। হিন্দু ব্রাহ্মণসহ অন্যান্য পরিবারের মেয়েকে বিয়ের নামে তিলে তিলে মেরে, তাদের জীবন নষ্ট করার অধিকার হিন্দু শ্বশুরবাড়িগুলো কী করে পেলো, তা একটু জানতে চাচ্ছি! হিন্দু সমাজের নির্লিপ্ততা, প্রশ্রয়ের ফলে এই নোংরামির চর্চা হিন্দুদের মধ্যে জঘন্যভাবে হচ্ছে সেটাই দেখছি! যদি ডিভোর্স দিয়ে আবার বিয়ের অধিকার একটা হিন্দু মেয়ের না থাকে, তাহলে তার সংসার কেড়ে নেয়ার অধিকার কী করে তার স্বামী ও তার পরিবারের থাকে, সেটাও জানতে চাচ্ছি! কারো বিবাহিত স্বামী হয়ে নিজেকে যত্রতত্র বিতরণের অধিকার কোনো হিন্দু পুরুষ রাখে কিনা তাও জানতে চাচ্ছি।
ব্রাহ্মণত্ব, হিন্দুত্ব বজায় কিংবা টেনে নেয়ার দায় শুধু হিন্দু বিবাহিতা মেয়েদের উপর অর্পিত হয়ে গেলো কেন বুঝতে পারছি না!

সীমাহীন কাণ্ডকীর্তির কোন জবাবদিহিতা নেই এই হিন্দু সমাজে! যা ইচ্ছা করা যায়! আমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার যোগ্যতা কয়জনের আছে? চুপ সব চোখের সামনে দেখে! কোন নারী, শিশুর জীবন নিয়ে খেলার একছত্র অধিকারী কীভাবে একটা শ্বশুরবাড়ি হয় হিন্দু পরিবারে? এরপরও এরা যখন হিন্দুত্ব ফলায় এবং ধর্ম শেখায়, জাস্ট ঘেন্না লাগে! এরা মাটির মায়ের আরাধনায় বসে জ্যান্ত মায়ের জীবন দুর্বিষহ করে, এরা ঠাকুরের মাথায় দুধ ঢালে শিশুর জন্য এক প্যাকেট দুধের ব্যবস্থা না করে…বিয়ের নামে একটা মেয়ের সন্তানসহ আজন্মের নরক যন্ত্রণা চলে বন্ধনহীন, মুক্তিহীনভাবে!

আরও পড়ুন:  বিচ্ছেদের কারণে প্রাক্তন স্ত্রীকে হেনস্তার প্রতিবাদ করতে পারবেন না অপূর্ব?

হিন্দু মেয়ের জীবন নরকে পরিণত করার, সন্তানের জীবন দুর্বিষহ করার অধিকার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি কারো নেই… অথচ এই হিন্দু সমাজের নাকের ডগায় এটা হচ্ছে…আর মেয়েরা সেটা সহ্য করতে করতে শেষ হচ্ছে।

ঐসব মানুষ হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা উড়ায় কীভাবে? হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে মেয়ে, শিশুর জীবন নষ্ট করে কীভাবে? হিন্দু সমাজের উচ্চস্তরে বসে যারা এসব করে পার পেয়ে যাচ্ছে, তারা কি হিন্দু সমাজের সকল স্তরের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে না যে একটা উচ্চশিক্ষিত হিন্দু পরিবারের মেয়ের সাথেও যা তা করা যায়! এখানে সব মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকা ছাড়া মেয়ের পরিবারের কোন করণীয় নাই? জীবন তো একটা হিন্দু মেয়েরও একটাই, দশটা না যে শ্বশুরবাড়ির নামে বলি চড়াবে! সেও তো সন্ন্যাস নেয়নি যে যৌথ জীবনের আশা ত্যাগ করবে? তবে কেন এই অন্যায়?

এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই বলতে পারেন মেয়ে কেন দ্বিতীয় বিয়ে করছে না ডিভোর্স দিয়ে! দ্বিতীয় বিয়ে করার স্কোপ কোথায়? দ্বিতীয় বিয়ে তো স্বীকৃত নয়। একটা শিশু, একটা মেয়েকে এই সমাজে বাবা এবং স্বামীর জন্য যেভাবে হ্যারাসম্যান্ট এর শিকার হতে হয়, সেটা সহ্য করতে না পেরে হিন্দু মেয়েদেরর সকল রকম উল্টাপাল্টা স্টেপ নেয়ার দায়ভার এই হিন্দু স্পেশালি ব্রাহ্মণ সমাজের সচেতন মানুষ কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। চুপ করে বসে থাকলে অন্তত ব্যর্থ দাম্পত্য জীবন ছুঁড়ে ফেলে, সন্তানকে বাবা নামক ট্রমা থেকে বের করে নতুন জীবন যাপন সম্ভব নয়। বিয়ের মতো একটা পবিত্র বিষয়কে যেসব হিন্দু পরিবার মডিফাইড রেপের সমতুল্য করে দিয়েছে, যারা আমৃত্যু যন্ত্রণা ভোগের জন্য হিন্দু মেয়েদের জীবন নিয়ে কোনরকম জবাবদিহিতা ছাড়া যাচ্ছেতাই করে যাচ্ছে, তাদের সেই বিকৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া আসলেই প্রয়োজন। সবাই সরব হোক, এই অন্যায়ের সমাপ্তি ঘটুক।
না হয় ডিপ্রেসড হিন্দু বিবাহিতা মেয়ে আর ফুলের মতো শিশুর মানসিক বিপর্যয় নিয়ে বেড়ে উঠা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

ইন্ডিয়ায় তো হিন্দুদের জন্য ডিভোর্স স্বীকৃত, কিন্তু এখানে তা নয়… তাই নিউ ট্রেন্ড চালু হয়েছে… স্বামী বেঁচে আছে কিন্তু কোন দায়িত্ব পালনে নাই, বিবাহিত, কিন্তু সংসার নাই….বাচ্চার গলায় স্কুলের আইডি কার্ডে ঝুলে থেকে শিশু নির্যাতন, আর স্ত্রীর ত্রিসীমানায় না থেকে হ্যাজব্যান্ড নাম নিয়ে নারী নির্যাতনের এক অন্য মাত্রা এটা! সংসার করার কোন ক্ষমতা না থেকে বিয়ে করে একটা হিন্দু মেয়ের জীবন আর বাচ্চা জন্ম দিয়ে সেই শিশুর জীবন নিয়ে নোংরামো জনসম্মুখে করে হিন্দু সাত জন্মের অবিচ্ছেদ্য বন্ধনের ট্যাগ ঝুলিয়ে ফাইজলামির চূড়ান্ত সীমা বেশ ভালোভাবেই এখানে হচ্ছে!

সন্তান, স্ত্রী বিবেচ্য না হলে হিন্দু নামও তাদের জন্য প্রযোজ্য কেন হবে? কেন সেই পরিচয়ে বর্ণ, গোত্র মিলিয়ে বিয়ে করে স্মৃতি শক্তি ভ্রষ্ট হবে! এই হিন্দু সোসাইটির হিপোক্রেসির খেসারত কেন কোন শিশু এবং নারী দেবে? সভ্য মানুষ এই একতরফা হিন্দুত্বের, ব্রাহ্মণত্বের ঘানি টেনে নেয়া বন্ধন কিংবা মুক্তিহীন ব্রাহ্মণ বা অন্যান্য হিন্দু বিবাহিতা মেয়েদের দেখলে জ্ঞান হারাতে পারে!

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যে মেয়েই এই অবস্থার সম্মুখীন হয় সেই মেয়েই তো পুরুষবেষ্টিত। এই জায়গায় পুরুষ কাঁদেন, কষ্ট পান স্নেহের কাছের মেয়েটির জন্য… কিন্তু প্রতিরোধ গড়তে পারেন না…যতক্ষণ পর্যন্ত পুরুষেরাও তার ঘরের মেয়েটির সাথে হওয়া অন্যায়ে তীব্র প্রতিবাদী হবেন না ততক্ষণ এসব বন্ধও হবে না…হিন্দুত্ব বয়ে নেয়ার দায়িত্ব শুধু নারীর নয়…যে বন্ধন শুধু একটা মেয়ের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার পথে বেড়ি হয় সেটা আর বন্ধন থাকে না নির্যাতনের সমতুল্য হয়…সংসারও করবে না, ডিভোর্সও হবে না.. এটা কী জীবন..! হিন্দুদের ডিভোর্স নেই খুব ভালো, তাহলে সংসার নেই কেন?

আরও পড়ুন:  গৃহকর্মি, বেবি সিটার, চাইল্ড কেয়ার নিয়ে সংশয়

পুরুষেরা এসব কীর্তি সনাতন ধর্মের কোন রুলস ফলো করে করছে? সনাতন ধর্মে ব্যাভিচারী পুরুষকে প্রশ্রয় দেয়ার কথা তো দেখলাম না…তাহলে আইনের কোন ফাঁক গলে তারা তা করছে? ধর্মীয় রীতি মেনে যে স্ত্রী বা সন্তান তার জীবনে এসেছে তাদের নির্যাতন করে, বঞ্চিত করে সে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অন্য মেয়েদের নিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করবে তা সনাতন ধর্মের কোন পাতায়, কোন পৃষ্ঠায় উৎসাহিত করা হয়েছে? পুত্রবধুকে শ্বশুর, শাশুড়ি কেনা গোলাম ভেবে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, নির্যাতন, নিপীড়ন করবে, তাকে সংসার ত্যাগে বাধ্য করবে, তাইবা কোন শাস্ত্র মেনে তার জবাবদিহিতাও থাকতে হবে।

জৈবিকভাবে রিপুর তাড়না যদি সেসব পুরুষের নিকৃষ্ট লেভেলে চলে যায় তাহলে তাদের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিৎ। যে অপদার্থ পুত্র নিজের স্ত্রী, সন্তানের দায়ভার এড়ায়, সেসব পুত্রের বাবা,মায়ের উপর পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনির সমস্ত দায়িত্ব বর্তানো উচিৎ। দুশ্চরিত্র ছেলের বাবা, মা হয়ে, বধূ ও নাতি-নাতনির জীবন দুর্বিষহকারী হয়ে তাদের কোন অধিকার নেই বুক ফুলিয়ে, মুখ উঁচিয়ে ঘুরে বেড়ানোর। যেহেতু হিন্দু পারিবারিক বিয়েতে বর শুধু না বরের বাবা, মাও বিয়েতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাই তারা নাটের গুরু হয়ে সব দায়িত্ব কীভাবে এড়ান?

তাদের জন্য ধর্ম তো হুমকির মুখে পরতে পারে না। কারণ যে ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েরা নির্যাতিতা হলেও ডিভোর্সের অধিকার স্বীকৃত হয় না, যার দোহাই দিয়ে নারী উত্তারাধিকারী স্বয়ংক্রিয়ভভাবে হয় না, সেই ধর্ম তো পুরুষকে ব্যাভিচারী হতেও শিক্ষা দেয় না, সেই ধর্ম তো শ্বশুর-শাশুড়িকে বধূ নির্যাতনে পুত্রকে মদদসহ নিজেদের অংশগ্রহণকে সমর্থন করে না!

ছেলেদের নোংরামি না দেখার জন্য যে হিন্দু সমাজ চোখে পট্টি বেঁধে গান্ধারী সাজে, এরাই আবার শেখায় শ্বশুর -শাশুড়ি অমানবিক হলেও তাদের পা ধরে, বরের গোপিনীদের সাথে ঠেলাঠেলি করে সংসার করতে পারলে না..
মেয়েগো তুমি বড্ড বাজে…

Shame on hindu society… তোমরাই মারছো মেয়েদের, আর মরলে ন্যাকা কান্না কাঁদছো!

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

প্রিয় পাঠক, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার সাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন, [email protected] ঠিকানায়। অথবা যুক্ত হতে পারেন @banglanewsmagazine আমাদের ফেসবুক পেজে। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবরটি বিবেচিত হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে।

  • 4
    Shares