প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি

আমুর সঙ্গে যেভাবে দূরত্ব হলো শেখ হাসিনার

116
আমুর সঙ্গে যেভাবে দূরত্ব হলো শেখ হাসিনার
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

১৯৮১ সালের ১৭ই মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সময়ে ঘরে-বাইরে এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। একদিকে যেমন জগদ্বল পাথরের মতো চেপে ছিল স্বৈরাচার, মানুষের মৌলিক-মানবিক অধিকারগুলোকে হরণ করা হয়েছিল, বিচারের নামে হচ্ছিল প্রহসন, স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিদের মদদ দেওয়া হচ্ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের মধ্যেও বিশ্বাসঘাতক এবং সুবিধাবাদীদের ভিড়। শেখ হাসিনাকে পুতুল বানানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছিল প্রকাশ্যে। শেখ হাসিনাকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব দখলের এক নিরব লড়াই চলছিল। এরকম পরিস্থিতিতে জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণে শেখ হাসিনা এক কঠিন সংগ্রামের মধ্যে পড়েছিলেন এবং এই সংগ্রামে তাঁকে যারা সহযোগিতা করেছিল, দলের মধ্যে শেখ হাসিনা যে দু-চারজন বিশ্বস্ত লোক পেয়েছিলেন আমির হোসেন আমু তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

আমির হোসেন আমু শেখ হাসিনাকে দলে প্রতিষ্ঠিত করতে, তাঁর পক্ষে দলের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, আমির হোসেন আমুর কারণেই সারাদেশে যারা ত্যাগী-পরীক্ষিত ছিল তাঁদের সঙ্গে শেখ হাসিনার যোগসূত্র হয়েছিল এবং আস্তে আস্তে শেখ হাসিনা জাতির পিতার আদর্শে দলকে পুনর্গঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগকে নতুন জীবন দান করায় সক্ষম হয়েছিলেন। আর এই সবকিছুর জন্যে আমির হোসেন আমুর অবদান অনস্বীকার্য।

শেখ হাসিনা তাঁর প্রতিদানও দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগে ১৯৮১ সাল থেকে ৯৬ সাল পর্যন্ত আমির হোসেন আমু ছিলেন নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যদিও তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হতে পারেননি কখনো, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁর নাম আলোচিত হয়েছিল। সাধারণ সম্পাদক হোন না হোন, তিনি আওয়ামী লীগের যে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন, শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত পরামর্শক ছিলেন সেটা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কারো কাছেই অজানা ছিল না। আর একারণে দলে তাঁর প্রভাব ছিল অত্যন্ত বেশি। শুধু দলে নয়, ৮২ সাল থেকে যে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম নিউক্লিয়াস ছিলেন আমির হোসেন আমু। জোটবদ্ধ আন্দোলনে আমির হোসেন আমুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা নিয়ে এখনো রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়। সেসময় ১৪ দলের ভেতরে আওয়ামী লীগ নিয়ে ভীতি কাজ করতো, ১৪ দলের নেতা যারা আওয়ামী লীগ সরকারের অংশীদারও বটে তাঁদের ভেতরে নেতিবাচক আড়ষ্টতা ছিল। আর এই সবকিছুকে সামাল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে আমির হোসেন আমুর ভূমিকা ছিল অনবদ্য।

আরও পড়ুন:  ২১ আগস্টের ঘটনায় খালেদাকে আসামি করার দাবি তথ্যমন্ত্রীর

আমির হোসেন আমুকে বলা হতো যে, তিনি টেবিলের নেতা, তিনি ১৪ দলের নীতিনির্ধারণী যেকোন আলোচনায় দাবার পাশা উল্টে দিতে পারতেন, দীর্ঘ আলোচনায় আমির হোসেন আমুকে পরাস্ত করা ছিল এক কঠিন ব্যাপার। রাজনৈতিক পরিপক্কতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারণে তিনি ১৪ দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ২১ বছর পরে ক্ষমতায় আসেন। ঐ নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন আমির হোসেন আমু। কিন্তু পরাজিত হলেও তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন এবং অন্যতম নীতিনির্ধারক ছিলেন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরেও শেখ হাসিনা তাঁকে মন্ত্রী করেছিলেন।

২০০১ সালের পর থেকেই শেখ হাসিনার সঙ্গে আমির হোসেন আমুর সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন। যদিও এই সম্পর্কে কোন বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও ২০০১ এর নির্বাচন বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ সভাপতি যে রাজনৈতিক পুনর্গঠন শুরু করেন দলের ভেতর তাঁতে আমির হোসেন আমু কিছুটা কোণঠাসাই হয়ে পড়েন। শেখ হাসিনা চেয়েছিলেন তরুণদেরকে সামনে নিয়ে আসতে আর এই কারণেই তিনি সাবের হোসেন চৌধুরীকে তাঁর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেন মাহমুদুর রহমান মান্না, আখতারুজ্জামানের মতো তরুণ নেতাদেরকে। এই সময়ে শেখ হাসিনা একটি তারুণ্য নির্ভর এবং মেধাদীপ্ত দল গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। সেখান থেকেই আমির হোসেন আমুর সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্কে দূরত্বের সূচনা বলে অনেকেই মনে করেন। কিন্তু এই দূরত্বের সূত্রপাত কখনো প্রকাশ্য হয়নি, আমির হোসেন আমুর গুরুত্ব দল থেকে কমে গেলেও দলের আপামর কর্মীদের মধ্যে তাঁর অবস্থান যেমন ছিল, তেমনি দলেও তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে বিবেচিত হতেন। কিন্তু ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন আসার পরে হঠাৎ করেই বদলে যান আমির হোসেন আমু। এই সময়ে আমির হোসেন আমুর প্রয়াত স্ত্রী ছিলেন সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন, আমির হোসেন আমু সেসময় যদি সিঙ্গাপুরেই অবস্থান করতেন তাহলে হয়তো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায় অন্যরকম হতে পারতো। কিন্তু সেই সময় তিনি সিঙ্গাপুর থেকে বারবার ঢাকায় আসেন এবং আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থিদের প্রধান নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এই সময় তিনি একটি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যে সংস্কার প্রস্তাবে আওয়ামী লীগ সভাপতির কর্তৃত্ব খর্ব করা এবং সভাপতি পদে একজন যেন বারংবার না থাকেন সে ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন। আর এই কারণেই সারাদেশের তৃণমূলের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় থাকা আমির হোসেন আমুর জনপ্রিয়তায় ধস নামে। তিনি নায়ক থেকে খলনায়কে পরিণত হন। এখানেই শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দুরত্ব তৈরি হয়।

আরও পড়ুন:  যেকোনো সময় করোনা সংক্রমণ প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে : কাদের

এখনো কোটি টাকার প্রশ্ন যে কেন আমির হোসেন আমু সংস্কারপন্থী হয়েছিলেন? শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত-আস্থাভাজন হওয়ার পরেও কেন তিনি মাইনাস ফর্মুলার প্রবর্তক হয়েছিলেন? অনেক নেতাই যেমন বাধ্য হয়ে তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রোষানলে না পড়ার জন্যে সংস্কারপন্থি হয়েছিলেন, আমির হোসেন আমুর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তেমন না। একদিকে যেমন তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিষ্কলুষ, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন অভিযোগ নেই। অন্যদিকে তাঁর দেশে না থাকার যৌক্তিক কারণ ছিল স্ত্রীর চিকিৎসা। কিন্তু এতকিছুর পরেও কেন তিনি দেশে ফিরে এসে শেখ হাসিনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি আজও। আর এই কারণেই ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর আমির হোসেন আমু মন্ত্রিত্ব পাননি দলের অন্য হেভিওয়েট নেতাদের মতো। ২০১৪ সালে যদিও তিনি মন্ত্রী হন, তবে তিনি আর দলের নীতিনির্ধারক হতে পারেননি, দলে গুরুত্বপূর্ণ নেতার আসন থেকেও ছিটকে পড়েছেন। আর এখন তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য মাত্র। যেখানে দলের সাংগনিক কাজে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বহীণ। আর এই দুই নেতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পেছনে কতটা বিশ্বস্ততা ছিল, কতটা মান-অভিমান ছিল সেই বিতর্ক অনেক পরে। কিন্তু তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মনে করেন ২০০৭ সালে আমির হোসেন আমুর সংস্কারপন্থি হওয়াটা ঠিক হয়নি। আর একারণে দলের তৃণমূলের কাছেও এক সময়ের জনপ্রিয় নেতা আমির হোসেন আমুর দুরত্ব তৈরি হয়েছে। আমির হোসেন আমু একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, একথা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি যেকোন টেবিলের আলোচনাতেও তাঁর সঙ্গে পেরে ওঠাটা দুষ্কর। কিন্তু আমির হোসেন আমুর আগের অবস্থান যে এখন আর নেই সেটাও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অজানা নয়। আর এই দুরত্ব তৈরি হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ যে ওয়ান ইলেভেন- তা বিশ্বাস করে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।