দুর্বৃত্তের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে প্রীতি ও তার বাবা-মায়ের দেখা স্বপ্নগুলো

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ২ মাস আগে

শোকে স্তব্ধ প্রীতির পরিবার। চোখের কোণে লেগে থাকা পানি শুকিয়ে গেছে। কারও দেয়া 
সান্ত্বনায় কাটছে না বুকের মানিককে হারানোর শূন্যতা। পরিবারের নীরব কান্না যেন ক্ষতবিক্ষত করে চলছে। প্রীতির পড়ার টেবিলটিও অগোছালো পড়ে আছে।

স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার। ছোট ভাইকে নিয়েও দেখতেন স্বপ্ন। একমাত্র ভাইটিও যেন হারিয়েছে তার খেলার সঙ্গীকে।দুর্বৃত্তের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে প্রীতি ও তার বাবা-মায়ের দেখা স্বপ্নগুলো।

প্রীতির বাবা মো. জামাল উদ্দিন মিরপুরে একটি কারখানায় প্রডাকশন ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেন। তিনি বলেন, সন্তান ছাড়া বাবা-মা কীভাবে থাকে। বুকে একটি বড় পাথর বেঁধে আছি। মনে হচ্ছে পাথরটি অনেক ভারী। মেয়ের লাশের বোঝা বহন করা আরও যন্ত্রণার। দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রীতি বড় ছিল। 

পশ্চিম শান্তিবাগের ২১৮ নম্বর ভাড়া বাসায় মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন রাজধানীর বদরুন্নেসা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সামিয়া আফরান জামাল প্রীতি (২২)। গতকাল বাসায় ঢুকতেই দেখা যায় কাঁদতে কাঁদতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন প্রীতির বাবা-মা। সান্ত্বনা দিচ্ছেন স্বজনেরা।

প্রীতির রুমে গিয়ে তার পড়ে থাকা ব্যবহৃত জিনিসপত্র ধরছেন মা হোসনে আরা। কিছুক্ষণ পরপর মেয়ের কিছু প্রিন্ট দেয়া ছবি বুকে জড়িয়ে রাখছেন। পড়ার টেবিলে রাখা মেয়ের ছবি দিয়ে প্রিন্ট করা একটি পানি খাওয়ার মগে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। কিছুতেই যেন বুক ভরছে না।

প্রীতির পোষা বিড়ালটিও তাকে না দেখতে পেয়ে অসুস্থ হয়ে ঘরের এক কোণে বসে আছে। ছোট ভাইটিও প্রিয় বোনের বিছানায় গিয়ে নীরবে কেঁদে আড়ালে চোখের পানি মুছছে। বোন হারানো ক্ষত ও ব্যথা যেন মিটছে না কোনো কিছুতে।

প্রীতির বাবা বলেন, ১৭ বছরের একমাত্র ছেলে সোহায়েদ জামাল সামি এই বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী। মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলো। এখনো মামলা করার কোনো চিন্তাভাবনা করিনি। মামলা যেটা হয়েছে সেটার সঙ্গে আমরাও বিচার পেয়ে যাবো। ঘটনার পরের দিন সাবের হোসেন চৌধুরী, কাউন্সিলরসহ এমপি রাশেদ খান মেনন এসেছিলেন। আজ সকালে প্রীতির কলেজ থেকে স্যার-ম্যাডামরা এসেছিলেন। তারা এসে সান্ত্বনা দিয়েছেন। সবাইকে আমার পরিবারের দিকে সুদৃষ্টি দেয়ার জন্য বলেছি। 

প্রীতিকে দাফন করা হয়েছে শাহজাহানপুর কবরস্থানে। ২২ বছরের মেয়েটি আমার অন্ধকারে একা একা শুয়ে আছে। পরিবার অসচ্ছল হওয়ায় সে এখন থেকে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিল। আমার একার ইনকাম দিয়ে পরিবার চালানো কষ্টকর। পড়াশোনার পাশাপাশি মেয়েটি চাকরি করে মাঝে মাঝে সহযোগিতা করতো। নতুন চাকরির জন্য বিভিন্ন জায়গায় সিভি জমা দিচ্ছিলো। চাকরির জন্য কম্পিউটার কোর্সও করতে ছিল। এখন আমার হাল ধরার কেউ নেই। আমি এখন হতাশ। মেয়েতো পাবোই না, এদিকে আবার আর্থিক কষ্ট থেকে গেল।

তিনি আরও বলেো, ১১ বছর ধরে ঢাকায় থাকি। গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। গাজীপুরে বড় হয়েছি। এটি একটি দুর্ঘটনা। পথচারী হিসেবে আমার মেয়ে যাচ্ছিলো, হঠাৎ আমার মেয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। তবে এই রকম দুর্ঘটনা কোনো বাবা-মা চায় না। আমিও চাই না। এটা আশা করি সরকার তদন্ত করে সঠিক বিচার করবেন। বিচার দিয়ে রেখেছি আল্লাহর কাছে। শুধু লিখিতভাবে দিচ্ছি না।

মামলা করা নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। মামলা না করার একটি কারণ হলো আর্থিক দিক থেকে অসচ্ছল। তাছাড়া মামলার কাজে সময় দিতে পারবো না। এসব ঝামেলার জন্য সংসার চালানো আরও ক্ষতি হবে। যে চলে গেছে সে আর ফেরত আসবে না। আমরা নিরিবিলিভাবে  থাকতে চাই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রীতির বাবা বলেন, কয়েকদিন আগেও প্রীতি বলেছে- বাবা আমি ডাক্তারি পড়বো। আমিও চেয়েছিলাম মেয়েকে ডাক্তার বানিয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু আর্থিক দিকের কথা চিন্তা করে ঠিকমতো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। এখন ছেলেটিকে নিয়ে চিন্তায় আছি।

প্রীতি থাকলে ছেলেটির পড়াশোনায় আর্থিকভাবে অনেক সাপোর্ট পেতাম। বাসা ভাড়া ও লেখাপড়ার খরচ বেশি চলে যায়। আমি একা সামলাতে পারছিলাম না, এজন্য প্রীতিকে দেখে কষ্ট লাগতো। সে আমার বড় অবলম্বন ছিল।

আমি সরকারের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে দাবি করি তিনি যেন এই বিষয়ে একটি সুষ্ঠু বিচার করেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এভাবে যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোলের সন্তানকে না হারাতে হয়। মেয়ে তো আর ফিরে পাবো না যেন ছেলেটিকে মানুষ করতে পারি। মেয়ের শোকতো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকবে। এই বুকের ব্যথাতো আর কমবে না।

দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত প্রীতির মা হোসনে আরা বলেন, মালিবাগের একটি কারখানায় চাকরিতে ঢুকেছিলাম চার-পাঁচমাস আগে। কিন্তু মেয়ের পছন্দ ছিল না তার মা চাকরি করুক। বলতো যা বেতন পাও সে টাকা আমি চাকরি করে তোমাকে দিবো। ওর কথা শুনে ছেড়ে দিয়েছি।

মাঝে দুই মাস নামাজ পড়তো, রান্না শিখতো দেখে খুব ভালো লাগতো। খুব চঞ্চল, অস্থির প্রকৃতির ছিল কিন্তু কোনো জিদ ছিল না। বাবা-মাকে কখনো কোনো কিছুর জন্য জোর করতো না। পরিবারের সমস্যাগুলো খুব বুঝতো। বাবার কষ্ট দেখে সচ্ছল হওয়ার চেষ্টা করতো। প্রীতি বাইরে থেকে আসলে কখনো খালি হাতে আসতো না। ভাইয়ের জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসতো। ও অপেক্ষায় থাকতো কখন তার বোন আসবে।

বাসায় এত মানুষ যাচ্ছে আসছে শূন্যতাটা তো কাটছে না। দরজায় এসে তো আর প্রীতি মা বলে ডাকছে না। আমার ছেলেটিরও পড়াশোনায় অনেক ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। টেস্ট পরীক্ষা চলছে ওর। আজ পরীক্ষা দিতে যেতে চায়নি। জোর করে পাঠিয়েছি।

প্রীতির মা আরো বলেন, মেয়ে বাইরে থাকায় শেষ কথা ফোনে হয়েছিল। শুধু বলেছে, আম্মা আমি বাসায় আসতেছি। এর কিছুক্ষণ পরেই আমার মেয়ের কি হয়ে গেল এটা। কীভাবে থাকবো আমার মেয়েকে ছাড়া। সে আমার কলিজার টুকরা ছিল। সংসারের হাল ধরার জন্য চাকরিও করেছে অনেক জায়গায়।

সংসারে কিছু না হলেও একটু সহযোগিতা করতো। আমি নিজেও সেলাই মেশিনে কাজ করি। কিন্তু একদম প্রফেশনালভাবে করি না। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল ও ধীরে ধীরে সংসারের হালটা ধরুক। ছোট ভাইকে নিয়ে জড়িয়ে থাকতো সবসময়। ছেলেটিও আমার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। বোনের বিছানায় গিয়ে চুপ করে শুয়ে থাকে। যেন তার খেলার সঙ্গী হারিয়েছে।

ঘরের মধ্যে যেন সবসময় মাতিয়ে রাখতো দুই ভাইবোন। তিনি আরও বলেন, বাবার একার বেতন দিয়ে টেনেটুনে সংসার চলে। নিজেরও ভারী কাজ করার মতো বয়স নেই। একটা মেয়ে মায়ের কাছে অনেক দামি। আমার বুক খালি করে নিঃস্ব করে আমাকে রেখে গেছে। আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি। এমন আহাজারি যেন কোনো মায়ের করতে না হয়। গান, টিকটক করে নিজেকে আনন্দে রাখতো সবসময়। তার পোষা বিড়ালের সঙ্গে ঘুমাতো। বিড়ালটিও অসুস্থ হয়ে পড়ছে।