ঢাকায় ছিনতাইকারী পুলিশের চেনা, তবুও দমানো যাচ্ছেনা

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ১ মাস আগে

রাজধানীতে কারা ছিনতাই করে, সেই তালিকা আছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাছে। নগরের কোন জায়গায় কোন চক্র ছিনতাইয়ে সক্রিয়, কে নেতৃত্ব দেয়, তা–ও জানা পুলিশের। কিন্তু অপরাধীদের দমানো যাচ্ছে না।

পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসতেই ঢাকায় ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বিপরীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান বাড়াচ্ছে। কিন্তু ছিনতাই থামছে না। গত বুধবারও ঢাকার আজিমপুরে কবির হোসেন (১৮) নামের তরুণকে ছুরিকাঘাত করে তাঁর মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীদের একটি চক্র।এর আগে গত ২৭ মার্চ ভোরে রাজধানীর কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ড–সংলগ্ন মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে ‘ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে’ নিহত হন দন্তচিকিৎসক আহমেদ মাহি ওরফে বুলবুল।

ডিএমপি সদর দপ্তর বলছে, ঢাকা মহানগরের ৫০ থানা এলাকায় ৫৭৫টি জায়গায় প্রায় ৫০০ ছিনতাইকারী সক্রিয়। এর বাইরে ‘অজ্ঞান পার্টি’,‘মলম পার্টি’ ও ‘টানা পার্টি’র সদস্য রয়েছেন প্রায় ৮৫ জন। মাস দুয়েক আগে অপরাধীদের এই তালিকা তৈরি করেছে পুলিশ।

ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, বাজারে আর্থিক লেনদেন বেড়েছে। আবার কর্মসংস্থানের অভাব ও বেকারত্ব রয়েছে। এসব কারণে কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে তা অস্বাভাবিক পর্যায়ে যায়নি। তিনি বলেন, ঈদ সামনে রেখে ছিনতাইকারীরা যাতে বেপরোয়া হয়ে না উঠতে পারে, সে জন্য পুলিশ তৎপর আছে।

ছিনতাই যে বেড়েছে, তা দেখা যায় পুলিশের পরিসংখ্যানেই। ডিএমপির হিসাব বলছে, গত ডিসেম্বরে রাজধানীতে ৬টি ছিনতাইয়ের (দস্যুতাসহ) ঘটনা ঘটে। জানুয়ারি মাসে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫। ফেব্রুয়ারিতে ১৯টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। মার্চের হিসাব পাওয়া যায়নি।

ঈদ সামনে রেখে ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারে র‍্যাবও অভিযানে নেমেছে। ১২ এপ্রিল রাতে র‍্যাব রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে ২০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে। বাহিনীটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল কে এম আজাদ বলেন, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে বিপণিবিতান ও বাজারকেন্দ্রিক কেনাকেটা বৃদ্ধি পাওয়ায় পথে–ঘাটে ছিনতাই বেড়েছে। র‍্যাব ইতিমধ্যে ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।

অবশ্য পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিএমপি যে হিসাব দেখায়, ছিনতাইয়ের প্রকৃত ঘটনা তার চেয়ে বেশি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। অনেক ক্ষেত্রে থানা পুলিশ মামলা না নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কোনো মূল্যবানসামগ্রী ‘হারিয়ে যাওয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত করে। এর উদ্দেশ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নথিপত্রে ভালো দেখানো।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এলাকাভিত্তিক হিসেবে ছিনতাই বেশি হয় বাড্ডা, ভাটারা, মিরপুর ও পল্লবী এলাকায়। শাহবাগ, মগবাজার, রমনা, মালিবাগ রেলগেট, চানখাঁরপুল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকা, গুলিস্তান, ধানমন্ডি, জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড, নিউমার্কেট, পান্থপথ মোড় ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায়ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।

রাজধানীতে ছিনতাইকারীরা এখন মূলত মধ্যরাত থেকে ভোরে ছিনতাইয়ে তৎপর থাকে। তারা ভোরে রিকশায় বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলস্টেশন থেকে বাসামুখী অথবা বাসা থেকে স্টেশনমুখী যাত্রীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন আড়তমুখী কাঁচামাল ও মাছ ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করেও তাঁরা ছিনতাইয়ে নামে। নির্জন অলিগলিতে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে পথচারীদের টাকাপয়সা কেড়ে নেয় কোনো কোনো ছিনতাইকারী চক্র।

পুলিশ বলছে, ছিনতাইকারীরা ধরা পড়লেও বারবার জামিনে বেরিয়ে একই অপরাধে জড়ায়। যেমন কাজীপাড়ায় দন্তচিকিৎসক খুনের ঘটনায় রায়হান ওরফে সোহেল, রাসেল হাওলাদার, আরিয়ান খান হৃদয় ও সোলায়মান নামের চার ‘ছিনতাইকারী’কে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাইয়ের অভিযোগে রায়হান ও রাসেলকে আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে ঘটনার কিছুদিন আগে জামিনে বেরিয়ে আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েন তাঁরা।

ছিনতাইয়ের ঘটনা নিছক টাকাপয়সা বা মুঠোফোন খোয়া যাওয়া নয়, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি হারান তাঁর সর্বস্ব। কারও কারও পরিবারে নেমে আসে বিপর্যয়।যেমন দন্তচিকিৎসক আহমেদ মাহি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি।

তাঁর মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী শাম্মী আখতার শুধু স্বজনই হারাননি, দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে চরম সংকটেও পড়েছেন। গত রাতে তিনি বলেন, ‘একমাত্র উপার্জনকারী সদস্যকে হারালে একটি পরিবার যেভাবে চলার কথা, আমরা সেভাবেই আছি।’