কোরআনে হাফেজ হয়েও চুরি করা তার পেশা

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ১ মাস আগে

পাঁচ বছর বয়স থেকে ছিলেন সৌদি আরবে। সেখানে থেকেই হয়েছেন কোরআনে হাফেজ। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থাতেও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু হাফেজ হয়েও কাজ নিয়েছিলেন সৌদি আরবের একটি গাড়ির শো-রুমে। এরপরই অসৎসঙ্গে জড়িয়ে পড়েন হাফেজ আজিজ মোহাম্মদ।

ডিবির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান বলেন, ২০১৮ সালে দেশে ফেরার পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন হাফেজ আজিজ মোহাম্মদ। তার পুরো পরিবার সৌদি আরবে থাকে। তার বাবা সেখানকার একজন স্বনামধন্য ইমাম। কিন্তু অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে ছেলে। চুরির ঘটনায় তাকেসহ মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় মামলা করা হয়েছে।

সৌদি আরবে শো-রুম থেকে বিএমডব্লিউ, পোরশে, জাগুয়ার, লেপাসের মতো দামি গাড়ি ও সেগুলোর যন্ত্রাংশ চুরি করতে শুরু করেন আজিজ মোহাম্মদ। ২০১৫ সালে হাতেনাতে ধরা পড়ে চুরির মামলায় তিন বছর কারাভোগ করেন তিনি। কিন্তু তাতেও শোধরাননি আজিজ। দেশে ফিরে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করলেও চুরির কারণে চাকরি চলে যায়। তখন থেকে চুরিই হয়ে ওঠে আজিজ মোহাম্মদের মূল পেশা।

ডিবি সূত্র জানায়, দেশে ফিরে চট্টগ্রামে নিজ বাড়িতে বসবাস করা শুরু করেন আজিজ। এরপর কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে এক শিক্ষকের মোবাইল ফোন চুরি ও মাদক সেবনের দায়ে তার চাকরি চলে যায়। তখন তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান। মেসে থাকতে শুরু করেন। ভোরবেলায় মেস থেকে বের হতেন। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চুরি ও পকেট মারাই ছিল তার কাজ। চোরাই মালপত্র বিক্রির টাকায় নিয়মিত মাদক সেবন করতেন।

সম্প্রতি কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ারের দুটি মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ চুরির ঘটনা তদন্তে নেমে আজিজ মোহাম্মদসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসময় চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।এর আগে গত ২৩ এপ্রিল কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের সময় মাসুদ সারওয়ারের মোবাইল ও মানিব্যাগ চুরি হয়।

গত ২৩ এপ্রিল কমলাপুর রেলস্টেশনের ম্যানেজার মাসুদ সারওয়ারের অফিসকক্ষ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, একটি মানিব্যাগ ও ৪৫ হাজার টাকা চুরি করেন আজিজ। তখন সেখানে ঈদ টিকিটের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন চলছিল।এ ঘটনায় টুপি মাথায় এক ব্যক্তির সন্দেহজনক গতিবিধির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এ বিষয়ে ঢাকা রেলপথ থানায় মামলা হয়। মামলাটির ছায়াতদন্ত করে ডিবি গুলশান বিভাগ। এক পর্যায়ে গত বুধবার দুই সহযোগীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপর দু’জন হলেন- রনি হাওলাদার ও জাকির হোসেন। তারা চোরাই মোবাইল ফোন কেনাবেচা করেন। পরে তাদের তথ্যমতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে ১৭টি দামী চোরাই ফোন উদ্ধার করা হয়।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, মোবাইল ফোন চুরিতে বিশেষ দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন আজিজ। মাত্র পাঁচ সেকেন্ডেই তিনি একটি ফোন হাতিয়ে নিতে পারতেন। এরপর সেগুলো রনি ও জাকিরের কাছে দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করে দিতেন।

জাকির চোরাই ফোনগুলো কিছুদিন তার কাছে রেখে লক ভেঙ্গে ও আইএমইআই নম্বর বদলে বিক্রি করতেন। কখনও সরাসরি সাধারণ মানুষের কাছে, আবার কখনও অনলাইন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিটি ফোন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করতেন। যেসব ফোন আনলক বা আইএমইআই বদলানো যেত না, সেগুলোর যন্ত্রাংশ খুলে আলাদা বিক্রি করত এ চক্রের সদস্যরা।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতি সপ্তাহে ৮-১০টি মোবাইল ফোন চুরির টার্গেট ছিল আজিজের। চুরির জন্য জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় চলাফেরা করতেন তিনি। বিশেষ করে স্টেশন, শপিং মল ও মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে এমন এলাকা বেছে নিতেন। লেবাস হিসাবে পরতেন টুপি ও পাঞ্জাবি। এতে অনেকের সন্দেহ এড়ানো যেত।

তারা আরও জানান, কমলাপুরে সংবাদ সম্মেলনের দিন সাংবাদিকদের ফোন চুরি করার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু সামনে পেয়ে যান স্টেশন ম্যানেজারের দুটি ফোন ও টাকা। ওই টাকা দিয়ে তিনি কিছু দেনা শোধ করেন। বাকি টাকা ব্যয় হয় নেশার পেছনে। চুরি করা মোবাইল ফোন ফকিরাপুলে রনি হাওলাদারের কাছে বিক্রি করেন। রনি ফোন দুটির আইএমইআই নম্বর বদলে বিভিন্ন অনলাইনে নতুন বলে বিক্রি করে দেন।