দাঙ্গায় বিচ্ছিন্ন শিখ ভাইদের সাথে মুসলিম বোনের ৭৫ বছর পর দেখা হলো

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ১ মাস আগে

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময় শুধু দেশবিভাগই হয়নি, ভেঙেছিল লাখো পরিবারের ভিটেমাটি, সামাজিক, পারিবারিক বন্ধন। সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিখ সম্প্রদায়ের এক মেয়েশিশু ৭৫ বছর পর দেখা পেলেন হারিয়ে ফেলা দুই ভাইকে। সিনেমার মতো এই ঘটনা ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে দুই ভাগ হয়ে যাওয়া পাঞ্জাব প্রদেশের।

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন দেশ। সে সময় প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ শরণার্থীতে পরিণত হয়। যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ ছাড়া বিশ্বের ইতিহাসে আর এত বেশি মানুষ স্থানান্তরিত হয়নি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পাঁচ থেকে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যুও হয়।

গুরমুখ সিং বলেন, ‘সহিংসতায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর আমার বাবা পালা সিং পাকিস্তান থেকে পাঞ্জাবের (ভারতীয়) পাতিয়ালা জেলায় চলে আসেন। বাবা ভেবেছিলেন স্ত্রীর সঙ্গে তার মেয়েকেও (মুমতাজ) হত্যা করা হয়েছে। এরপর তিনি এলাকার চল অনুযায়ী শ্যালিকাকে বিয়ে করেন। ’

আরেক ভাই বলদেব সিং বলেন, ‘প্রায় দুই বছর আগে আমার ছেলেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে আমাদের বোন মুমতাজের সন্ধান পায়। ’সে সময় মুমতাজও হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের খোঁজ করছিলেন। পাকিস্তানি ইউটিউবার নাসির ধীলোনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। দেশভাগের সময় বিচ্ছিন্ন হওয়া বেশ কয়েকটি পরিবারের স্বজনদের খুঁজতে সহায়তা করেছেন নাসির।

শিখ মেয়েশিশুটির বাবা জানতে পেরেছিলেন, দাঙ্গায় তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।স্ত্রীর সঙ্গে থাকা শিশু মেয়েটিও বেঁচে নেই ধরে নিয়ে ওই ব্যক্তি চলে গিয়েছিলেন ভারতের পাঞ্জাবে। কিন্তু বেঁচে যাওয়া মেয়েশিশুটি বেড়ে ওঠে এক পাকিস্তানি মুসলিম পরিবারে। ওই পরিবারের লোকজন তার নাম রাখেন মুমতাজ। শিখ ঘরের মেয়েটি বেড়ে ওঠেন মুসলিম হিসেবেই।

ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আবার দেখা হবে―এমনটা কল্পনাও করেননি মুমতাজ। তবে ৭৫ বছর পর মুমতাজের সন্ধান পান ভারতে অবস্থান করা তার দুই ভাই গুরমুখ সিং ও বলদেব সিং। অবশেষে গত এপ্রিল মাসে পাকিস্তানে অবস্থিত শিখ ধর্মের অন্যতম তীর্থস্থান কারতারপুর সাহিব গুরুদোয়ারায় পরস্পরের দেখা পান তারা।
গুরমুখ সিং বলেন, ‘জীবদ্দশায় নিজের বোনের সঙ্গে দেখা করতে পেরে আমরা খুবই খুশি। ’

গুরমুখ বলেন, ‘প্রথম দিকে মুমতাজের পরিচয় নিয়ে আমাদের সন্দেহ হচ্ছিল। প্রশ্ন জাগে, সে কি আসলে অন্য কেউ? ধীরে ধীরে আমরা প্রমাণ পেতে শুরু করি যে, মুমতাজই আমাদের হারিয়ে যাওয়া বোন। এরপর আমরা যেকোনো মূল্যে তার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু এতে বাগড়া দেয় ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা। ’

গত ২৪ এপ্রিল গুরমুখ ও বলদেব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কারতারপুর সাহিবে যান। মুমতাজও উপস্থিত হন তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। বলদেব বলেন, ‘আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকি। একে অন্যকে ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করছিল না। ঠিক করেছি, শিগগিরই ভিসার ব্যবস্থা করে মুমতাজ আমাদের সঙ্গে এপারে দেখা করতে আসবে। ’

গুরমুখ সিং বলেন, ‘মুমতাজ মুসলিম হিসেবে বেড়ে উঠেছে। আমরা এটা মেনে নিয়েছি। যখন দেখা হয়, তখন এসব কিছুই আমাদের মনে ছিল না। আমাদের বোন মুসলিম হলে কী হয়েছে? আমাদের শরীরে তো একই রক্ত বইছে। এটাই আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ…গুরু নানক বলেছেন, প্রত্যেক মানুষকে নিজের সমান মনে করবে। ’

সাক্ষাতের সম্ভাব্য একটি স্থান ছিল রাভি নদীর ওপারে পাকিস্তানের কারতারপুর সাহিব গুরুদোয়ারা। সেখানেই শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবের সমাধি। গুরুদোয়ারাটি পাকিস্তানের নারোয়াল জেলায় অবস্থিত, যা ভারতের ডেরা বাবা নানক সমাধিস্থল থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে।

২০১৯ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কারতারপুর করিডরের উদ্বোধন করেন। এর পর থেকে ভারতীয় শিখ তীর্থযাত্রীরা বিনা ভিসায় সেখানে যেতে পারেন। দেশভাগের সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন বহু মানুষের (বিশেষ করে শিখ) মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে জায়গাটি।