ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মসংস্থান প্রকল্প ‘অগ্নিপথ’বিরোধী বিক্ষোভ

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

ভারতজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সশস্ত্র বাহিনীর এই কর্মসংস্থান প্রকল্প ‘অগ্নিপথ’বিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভ সামাল দিতে শুক্রবার তেলেঙ্গানার সেকেন্দ্রাবাদে পুলিশ গুলি চালায়। এতে প্রাণ হারিয়েছেন এক যুবক। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। বিভিন্ন রাজ্যে আক্রান্ত হয়েছে ট্রেন, বাস, সাধারণ যানবাহন।

বিহারে দুটি ও তেলেঙ্গানায় তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেনে আগুন দেওয়া হয়েছে। বিহার, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশের মতো যেসব রাজ্য থেকে সেনাবাহিনীতে বেশি যুবক যোগ দেন, সেখানকার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। পশ্চিমবঙ্গেও দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।

কীভাবে পরিস্থিতির সামাল দেওয়া যায়, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তিত। গতকাল সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গে। এরপরই প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন প্রধান অগ্নিপথ প্রকল্প নিয়ে যুব সম্প্রদায়ের ভুল ভাঙাতে সচেষ্ট হন।

প্রকল্পে দ্রুত নিয়োগেরও ঘোষণা করা হয়। সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ পান্ডে বলেন, যেকোনো কারণেই হোক, যুব সম্প্রদায়ের মনে একটা ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। ভুল ভাঙলেই তারা বুঝতে পারবে এই প্রকল্প তাদের ও সেনাবাহিনীর জন্য কতটা মঙ্গলজনক।

নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল আর হরিকুমার বলেন, কারগিল রিভিউ কমিটির সুপারিশ মেনেই এই সংস্কার। জওয়ানদের গড় বয়স কমানোর জন্য এটা জরুরি। বর্তমানে জওয়ানদের গড় বয়স ৩২। এই প্রকল্প চালু হওয়ার পর তা কমে হবে ২৪ থেকে ২৬।

ভারতের রেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভের ফলে ৩০টি ট্রেন আক্রান্ত হয়েছে। ১২টিতে লাগানো হয়েছে আগুন। ২০০টির বেশি ট্রেন চলাচলে ব্যাঘাত ঘটেছে। ১১০টি ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। ৪৭টি ট্রেনের যাত্রাপথ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণ ট্রেনে আক্রমণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন। যুব সম্প্রদায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, ট্রেন জাতীয় সম্পত্তি। নষ্ট হলে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বে।

বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল ভি আর চৌধুরী বলেন, এই প্রকল্প অনুযায়ী বিমানবাহিনীতে লোক নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে ২৪ জুন। বয়সসীমা দুই বছর বাড়ানোর ফলে উপকৃত হবেন বহু যুবক, যাঁরা দুই বছর ধরে প্রস্তুতি সত্ত্বেও করোনার কারণে কোনো বাহিনীতে যোগদানের সুযোগ পাননি।

দেশজুড়ে সৃষ্ট বিক্ষোভ সামাল দিতে বৃহস্পতিবার রাতেই সরকার প্রথমবারের জন্য বয়সসীমা দুই বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গতকাল বলেন, এ থেকে প্রমাণিত, সরকার যুবাদের জন্য কতটা চিন্তিত। কিন্তু তাতেও ক্ষোভ কমেনি, বরং বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দক্ষিণাঞ্চলে।

বুধবার ‘অগ্নিপথ’ প্রকল্প চালু করা হয়। এই প্রকল্প অনুযায়ী সাড়ে ১৭ থেকে ২১ বছর বয়সীদের সশস্ত্র বাহিনীতে চার বছরের জন্য নিয়োগ করা হবে। চার বছর পর ২৫ শতাংশ চাকরিতে বহাল থাকবেন। বাকিদের চলে যেতে হবে। যাঁরা স্থায়ী হবেন না, তাঁরা হাতে পাবেন এককালীন ১১ লাখ ৭৭ হাজার করমুক্ত টাকা।

চাকরি স্থায়ী না হওয়ার অনিশ্চয়তায় ক্ষুব্ধ যুবাদের উদ্দেশে সরকার জানিয়েছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অগ্নিবীরদের আধা সামরিক বাহিনী ও পুলিশসহ অন্যান্য সরকারি, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এই কাজে সহায়তা করার জন্য অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গেও কথা বলেছেন।

সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ বিহারে। সে রাজ্যের পশ্চিম চম্পারণ জেলার বেতিয়ায় উত্তেজিত যুবকেরা আক্রমণ করেছেন উপমুখ্যমন্ত্রী রেণু দেবীর বাড়ি। সেখানে সমস্তিপুর ও লখিসরাইয়ে আগুন লাগানো হয় ট্রেনে। আগুন দেওয়া হয় বিজেপির পার্টি অফিসেও।

উত্তর প্রদেশের বালিয়াতেও ট্রেন আক্রান্ত হয় সকালে। এই রাজ্যের আগ্রা, আলিগড়, বারানসি, ফিরোজাবাদ, আমেথিতে ভাঙচুর করা হয় সরকারি বাস ও সরকারি অফিস। আলিগড়ে এক বিজেপি নেতার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। বিভিন্ন রাজ্যে রাস্তা অবরোধ করা হয়। যানবাহনে ছোড়া হয় ইটপাটকেল। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে চলে খণ্ডযুদ্ধ।

হরিয়ানায় অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সামাল দিতে ফরিদাবাদ ও গুরুগ্রামের বহু অংশে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। জনরোষের সামাল দিতে উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ যুব সম্প্রদায়কে প্ররোচিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

ভারতীয় নৌবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার দীপক আগরওয়াল প্রকল্পের বিরোধিতা করে বলেন, চুক্তির সেনারা দেশপ্রেমিক হতে পারে না। এই প্রকল্পে ভারতীয় বাহিনীর মঙ্গল হবে না। সরকার পেনশনের টাকা বাঁচাতে দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করতে চাইছে।

বিরোধীরা এই প্রকল্পের বিরোধিতায় নেমেছেন। প্রকল্প বাতিলের পক্ষে বিরোধীদের সমস্বর দাবির মুখে সরকার এই প্রকল্পের সার্থকতা প্রমাণে ব্যস্ত। প্রতিরক্ষার সঙ্গে যুক্তরাও এই প্রকল্প নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাকেশ শর্মা গতকাল বলেন, সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণে এই প্রকল্প জরুরি। ভারতীয় জওয়ানদের গড় বয়স যথেষ্ট বেশি। এই প্রকল্প তা কমিয়ে আনবে।

সাবেক মেজর রামবিলাস রাম বলেন, চীনের যুদ্ধের পরও ইমারজেন্সি কমিশনের মাধ্যমে চটজলদি সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হয়েছিল। এবারও তা হতে চলেছে। এর প্রতিক্রিয়া কতটা সুদূরপ্রসারী, প্রকল্প ঘোষণার আগে তা আরও ভাবা দরকার ছিল।