প্রতারক নারীর ভুয়া কাবিননামার ফাঁদে ফেলে প্রবাসীর বাড়ী, ফ্ল্যাট ও জমি দখল

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ৬ দিন আগে

এক নারী ভুয়া কাবিননামা তৈরি করে এক প্রবাসীকে নিজের স্বামী দাবি করে তার ধানমন্ডির ফ্ল্যাট, কুমিল্লার বাড়ি ও রূপগঞ্জের ৩০ শতক জমি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঐ প্রবাসীর নাম মিনহাজুর রহমান। তিনি ইংল্যান্ডপ্রবাসী বাংলাদেশি এবং ইতালির নাগরিক।

অভিযুক্ত নারীর নাম নিশাত আহম্মেদ খান। একসময় কুমিল্লা দক্ষিণ মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে ২০২১ সালে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সম্পত্তি বেদখল হওয়ার খবর পেয়ে তিন সপ্তাহ আগে ঐ প্রবাসী বাংলাদেশে এসে তার সম্পদের দখল ফিরে পেতে এখন দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।

২০১৭ সালে মিনহাজ দেশে এসে পাসপোর্টের আবেদন করার সময় নিশাত জানান যে, পাসপোর্ট অফিসে তার পরিচিত লোক আছে। সব কাজ তিনি করে দেবেন। নিশাত মিনহাজের পাসপোর্টের সকল তথ্য অনলাইনে জমা দেন। মিনহাজ পাসপোর্ট অফিসে ছবি তোলার সময় বুঝতে পারেন যে নিশাত পাসপোর্টে নিজেকে মিনহাজের স্ত্রী বলে ভুয়া তথ্য দিয়েছেন।

তখন মিনহাজের করার কিছুই ছিল না। এরপর মিনহাজ ইংল্যান্ডে ফিরে যান। পরে নিশাত ধানমন্ডির সেই ফ্ল্যাটের ভাড়া তুলে মিনহাজের কাছে পাঠাতে গড়িমসি করতে থাকে। তখন নিশাত তাকে হুমকি দিয়ে বলে যে, ‘তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের নিকাহনামা আছে। তুমি প্রতিবাদ করলে আমি তোমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করব।’

ভুক্তভোগী প্রবাসী মিনহাজুর রহমান বলেন, ঘটনার সূত্রপাত ২০১৪ সালে। গ্রামের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় শহীদুল হক স্বপনের মাধ্যমে আইনজীবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচয় দেওয়া নিশাতের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ঐ সময় তার রূপগঞ্জের জমিজমা, কুমিল্লা হাউজিং এস্টেটের ৪ নম্বর সেক্টরে পাঁচ তলা বাড়ি ও ধানমন্ডির ৯ নম্বর রোডের ৪ নম্বর বাড়ির কুইন্স পার্ক নামের অ্যাপার্টমেন্টের সি-১ নম্বর ফ্ল্যাট দেখাশোনা ও ভাড়া সংগ্রহের জন্য একজন লোকের দরকার ছিল। এসময় নিশাত তাকে সাহায্য করার আগ্রহ প্রকাশ করলে তাকে সেই দায়িত্ব দেন তিনি।

২০২১ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মাধ্যমে মিনহাজ জানতে পারেন যে, জনৈকা নিশাত আহম্মেদ খান অজ্ঞাতনামা একজনকে মিনহাজ সাজিয়ে ভুয়া নিকাহনামা বানিয়েছে। ঐ বছরই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া ফ্ল্যাট ছেড়ে দেন। এই সুযোগে নিশাত তার মা, দুই সন্তান ও এক মেয়ের স্বামীসহ ঐ ফ্ল্যাটে জোর করে উঠে পড়ে। খবর পেয়ে তিনি ইংল্যান্ড থেকে ধানমন্ডি থানায় যোগাযোগ করেন।

ধানমন্ডি থানা পুলিশের একটি টিম গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে ঘটনার সত্যতা পায়। পুলিশ এ ব্যাপারে মিনহাজকে থানায় মামলা দায়ের করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু মিনহাজ মামলা দায়েরের আগেই নিশাত আহম্মেদ খান ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর কুমিল্লার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে হাজির হয়ে মিনহাজুর রহমান ও তার বড় ভাই মাহবুবর রহমানের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন অভিযোগে একটি মামলার আবেদন করে।

মিনহাজ বলেন, শুধু তাই নয়, নিশাত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বরুণা ও বসুলিয়া মৌজায় তার ৩০ শতক জমি হেবা দলিল করিয়ে নিয়েছে। ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি রূপগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একজনকে মিনহাজুর রহমান বলে হাজির করিয়ে হেবা দলিল সম্পাদন করা হয়েছে।

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ভুয়া মিনহাজকে হাজির করার সময় তার পাসপোর্টের ফটোকপিও জমা দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘দেশে এসে আমি ও আমার ভাই কুমিল্লার মামলা থেকে জামিন নিয়েছি। এই নারী আমাকে তার স্বামী দাবি করছে। অথচ বিয়ের যে তারিখ বলা হচ্ছে, সেই সময় আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম। মিনহাজ পরিচয়ে আরেকজনকে কাজির সামনে হাজির করে ভুয়া নিকাহনামা তৈরি করেছেন তিনি।

সেখানে নিজেকে তালাকপ্রাপ্তা বললেও তিনি তালাকপ্রাপ্তা নন। আবার সেই নিকাহনামায় নিশাত ও মিনহাজের জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে একই। এতে বোঝা যায় এটি ভুয়া। তিনি বলেন, আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ডে নিজ পরিবারের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না। আমি আমার কষ্টার্জিত সম্পত্তি ফেরত চাই। সব মিথ্যা অভিযোগ থেকে মুক্তি চাই আমি।’

এমন পরিস্থিতিতে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দেশে আসেন মিনহাজ। এরপর তিনি নিজের ফ্ল্যাটে গেলে নিশাত, তার মেয়ে ও মেয়ের স্বামী তাকে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়। হুমকি দিয়ে বলে ৮০ লাখ টাকা দিলে ফ্ল্যাট ছাড়বে তারা। এরপর মিনহাজ ধানমন্ডি থানায় গিয়ে সহযোগিতা চাইলে পুলিশ সেখানে যায়। কিন্তু নিশাত তার পূর্বের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুলিশকে ফিরে যেতে বাধ্য করে।

এ ঘটনার পর ২৮ এপ্রিল রাতে নিশাত তার স্থানীয় ভাড়াটে লোকজন নিয়ে কুমিল্লা হাউজিংয়ে মিনহাজের ৫ তলা বাড়িতে হামলা চালায় এবং বাড়ির কেয়ারটেকারকে মারধর করে পাঁচ তলার ফ্ল্যাট (যেটাতে মিনহাজ দেশে আসলে থাকতেন) দখল করে নেয়। ফ্ল্যাট দখলের পর বাধা দেওয়ার অভিযোগ এনে উলটো নিশাত ঐ বাড়ির কেয়ারটেকার জিলানী ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকিরকে আসামি করে থানায় একটি মামলা করেন।

১৯৮৯ সালে ইতালিতে প্রবাসজীবন শুরু করেন মিনহাজ। ২০০১ সালে ইতালি অভিবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণ ট্যাক্স প্রদান করে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরস্কৃতও হন তিনি। ২০০২ সালে সেরা অভিবাসী হিসাবে ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ইতালির পাসপোর্টের অধিকারী হয়ে ইংল্যান্ডে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ইংল্যান্ডের টনটনে ‘রয়েল ক্যাস্ট’ নামে ভারতীয় খাবারের একটি রেস্টুরেন্ট আছে তার। স্ত্রী-সন্তান ইংল্যান্ডে থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা বাংলাদেশে থাকেন।

এদিকে নিশাত আহম্মেদ খানকে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি অসুস্হ। হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছি। আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। মিনহাজুর রহমান মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে বিয়ে করেছে। বিয়ের প্রমাণও আছে।’