ভার্চুয়াল জগতের মোহ-প্রেম, বেশীরভাগ প্রবাসীর স্ত্রীর সর্বনাশ

লেখক: বাংলা ম্যাগাজিন
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

এক স্কুল শিক্ষার্থী। বাড়ি শিবগঞ্জ উপজেলায়। ফেসবুকে পরিচয় হয় নাচোলের এক যুবকের সঙ্গে। প্রেমিকের আবদার রাখতে ম্যাসেঞ্জারে আপত্তিকর ছবি দিয়েই চরম বেকায়দায় পড়েছে স্কুল ছাত্রী। ওই যুবক এখন ছবি ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অনৈতিক আবদার করছে। এনিয়ে পুরো পরিবার এখন আতঙ্কে। পুলিশের কাছে যাওয়া ঠিক হবে কি-না সেটি নিয়েও ভাবছেন। 

স্বামীকে বিদেশ পাঠোনোর সময় জিহাদের (ছদ্মনাম) সঙ্গে এক গৃহবধূর পরিচয় হয়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইমোতে ভিডিও কলে কথা বলার সময় জিহাদ ওই নারীর নগ্ন অবস্থার কিছু ছবি ধারণ করেন।

পরে ওই ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এসব ভিডিও ধারণ করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন সময় ধারণকৃত ওইসব ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয়ভীতি দেখিয়ে বাধ্য করে ওই নারীর মেয়েকেই বিয়ে করেন।

মায়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর জিহাদকে ডিভোর্স দেয় মেয়েটি। এ ঘটনায় মামলা হয়। বিস্তর তদন্ত শেষে চাঁপাই নবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ আদালতে অভিযোপত্র দিয়েছে। চাঁপাই নবাবগঞ্জের বিভিন্ন থানা পুলিশ এমন অপরাধের অভিযোগ পাচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই উঠতি বয়সের তরুণী। বেশির ভাগ মামলাই সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রচারের অভিযোগে করা। এ ছাড়া আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের ঘটনাও অহরহ ঘটছে। ভিডিও কলে প্রেমিকাকে নগ্ন হতে বাধ্য করা।

পরে প্রেমিককে খুশি রাখতে বয়ফ্রেন্ডের কথামতো ভিডিও কলে নিজেকে নগ্নভাবে উপস্থাপন করেন নারীরা। কৌশলে ভিডিও কলে স্ক্রিনশট দিয়ে নগ্ন ছবি সংরক্ষণ করে রাখেন। এরপর বাধ্য করে অনৈতিক দাবি আদায় করেন। এভাবেই বিপদ ডেকে আনছেন নারীরা।

ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছেন। গুনতে হচ্ছে অর্থ। লোকলজ্জার ভয়ে নীরবে-নিভৃতে সয়ছেন অনেকেই। কেউ কেউ থানা পুলিশের কাছে অভিযোগ নিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রবাসীর স্ত্রীরা এ অপরাধের শিকার হচ্ছেন বেশি।

চাঁপাই নবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, সাধারণ অপরাধের পাশাপাশি ভার্চ্যুয়াল অপরাধও সংঘটিত হচ্ছে। অভিযোগকারীরা সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ নিয়ে থানায় এলে মামলা নেয়া হচ্ছে। অভিযোগগুলো অনুসন্ধান পর্যায়ে সত্যতা পাচ্ছে পুলিশ। বিভিন্ন স্কুল- কলেজের ছাত্রীরা এ অপরাধের শিকার হচ্ছে বেশি। তার মতে, শিক্ষার্থী-অভিভাবকসহ সবাই সচেতন হলে এ ধরনের অপরাধ কমবে।

ভার্চ্যুয়াল অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁপাই নবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাহফুজুল হক চৌধুরী বলেন, প্রেম, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের সুযোগে ধারণ করা আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ফেসবুক, ইউটিউবে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

এসব ঘটনায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা যতটা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। কারণ ভুক্তভোগীরা সামাজিক ও পারিবারিক কারণে মামলা করতে চান না। তিনি আরও বলেন, ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নারীদের আরও সচেতন হতে হবে।

অপরিচিত কাউকে ফ্রেন্ড লিস্টে নিয়ে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যাবে না। আর ঘনিষ্ঠ হলেও ভিডিও কলে খোলামেলাভাবে আসা যাবে না। কারণ এগুলো অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বা দাঁড়াতে পারে। এ ধরনের ঘটনা কারো সঙ্গে ঘটলে অবশ্যই পুলিশকে জানাতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এসএম শহিদুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সমাজের কিছু মানুষের মারাত্মক নৈতিক অধঃপতন ঘটছে।

ফলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন চরমভাবে স্খলনের শিকার হচ্ছে। ভার্চ্যুয়াল জগতে হেনস্তার শিকার হয়ে কেউ আত্মহত্যার পথেও পা বাড়াচ্ছেন। অনেকের দাম্পত্যকলহ স্থায়ী হচ্ছে। ফলে ভাঙছে সংসার। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভার্চ্যুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।