অপরাধএক্সক্লুসিভঢাকাবাংলাদেশরাজধানী

জেনেভা ক্যাম্প থেকে সার্বক্ষণিক মাদকের ‘হোম ডেলিভারি’ ব্যবস্থা চালু

ইয়াবার হটস্পট রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী ক্যাম্পে ইয়াবা ব্যবসা করছেন। টেকনাফ থেকে সরাসরি কিংবা বিভিন্নভাবে এখানে ইয়াবা আসে। আগে উচ্চশ্রেণির মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এসে ইয়াবা ক্রয় ও সেবন করত।

তবে এখন জেনেভা ক্যাম্পে প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রির চেয়ে বেড়েছে ‘হোম ডেলিভারি’। স্কুল-কলেজের ড্রেস পরা শতাধিক কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী আসক্তদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছে। কেউ কেউ বোরকা পরে ব্যাগে করে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে ইয়াবা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত আছে। তারপরও খোদ রাজধানীতে কীভাবে চলছে এই ইয়াবা ব্যবসা? এই প্রশ্ন এখন সর্বমহলে। জেনেভা ক্যাম্পের আশপাশে সরকারি-বেসরকারি চিকিত্সাসেবাকেন্দ্র ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে অনেক।

স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ ক্লাস বাদ দিয়ে ইয়াবা বহনের কাজ করছে। এমন তথ্যও বাসিন্দারা জানান। এ জন্য টাকাও পাচ্ছে তারা। তবে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে—তা যেন দেখার কেউ নেই।

ক্যাম্পের বাসিন্দারা জানান, ছাত্রছাত্রীদের কোথায়, কখন ইয়াবা পৌঁছে দিতে হবে তা ফোনেই বলে দেওয়া হয়। একটি মাত্র ফোন বা এসএমএসে মাদক পৌঁছে যাচ্ছে ক্রেতাদের কাছে। ইয়াবা বিক্রির টাকার ভাগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তারাও পান। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতাও এই ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত।

এসব কারণে ক্যাম্পে ইয়াবাসহ মাদকের ব্যবসা প্রকাশ্যেই চলে। স্থানীয় বাসিন্দারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধি জেনেভা ক্যাম্পে গিয়েছিলেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করেন। তারা ক্যাম্পে ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায় কারা জড়িত, কারা এখানে আসে—তার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন।

জেনেভা ক্যাম্পের চার পাশেই নানারকম দোকানপাট। ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পের ভেতরে প্রচুর অলিগলি। সেগুলোতেও অনেক দোকান। মনে হতে পারে, পুরো ক্যাম্পই যেন একটি মার্কেট! সেখানে প্রচুর লোকজনের আনাগোনা। এমন ভিড়ের মধ্যেই কিছু স্থানে চলছে ইয়াবা, গাঁজা ও হেরোইন বেচাকেনা।

ক্যাম্পের বাইরে হুমায়ুন রোডসংলগ্ন আলফালাহ মেডিক্যাল এলাকার ডাস্টবিন মোড় তেমনই একটি স্পট। স্থানীয় এক যুবককে সঙ্গে নিয়ে ঐ এলাকায় গিয়ে আলো-আঁধারির মধ্যে কয়েক জনকে ইয়াবা নিয়ে হোম ডেলিভারির উদ্দেশে রওনা হতে দেখা যায়।

এই প্রতিবেদককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক জন এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলেন, ‘কী লাগবে?’ তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর সঙ্গে থাকা যুবক জানালেন, আপনার ঠিকানা দেন, ঐ ঠিকানায় সময়মতো ইয়াবা পৌঁছে যাবে। এখানে আপনার আসার প্রয়োজন হবে না।

বাসিন্দারা জানান, ক্যাম্প থেকে সার্বক্ষণিক মাদকের ‘হোম ডেলিভারি’র ব্যবস্থা চালু আছে। এদিকে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন আগের চেয়ে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেন স্থানীয় বিহারি নেতারা। তারা জানান, ইয়াবা বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় বিভিন্ন সময়ে তাদের কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে।

জেনেভা ক্যাম্পে ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। এখানে আছে ৯টি সেক্টর। প্রত্যেকটি সেক্টর পরিচালনার জন্য ৯ সদস্যের কমিটি রয়েছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন সালিশ করে নিজেদের মধ্যে সমস্যার সমাধান করে থাকে। তবে জেনেভা ক্যাম্প পরিচালনা কমিটির কেউ কেউ ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কয়েক জন নেতা ক্যাম্পেও থাকেন না। কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও তারা নানা পন্থায় টিকে আছেন।

মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকা সন্তোষজনক। মাদক নিয়ে কারোর সঙ্গে কোনো আপস নেই। রাজধানীর স্ব স্ব থানা এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কঠোর ভূমিকায়। মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক নিয়ন্ত্রণেও আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।

তবে নিজের সন্তান যাতে সর্বনাশা মাদকের খপ্পরে না পড়ে—এই বিষয়ে অভিভাবক যদি সচেতন থাকে তাহলে মাদক সহজে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। অভিভাবকসহ সব পেশার মানুষ যদি সচেতন না হয়, তাহলে পুলিশের একার পক্ষে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার আজিমুল হক বলেন, ইয়াবাসহ মাদকের ব্যাপারে আমরা কোনো আপস করব না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। ইতিমধ্যে এক জন মূল হোতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া মাদকের হোম ডেলিভারি ঠেকানো বেশ মুশকিল বলে দাবি করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আকারে ছোট মাদকদ্রব্যগুলোর হোম ডেলিভারিতে চাহিদা বেশি। শরীরের গোপনস্থানে লুকিয়ে কিংবা স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা স্কুলব্যাগে এসব মাদকের ডেলিভারি দিচ্ছে।

বাংলা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Flowers in Chaniaগুগল নিউজ-এ বাংলা ম্যাগাজিনের সর্বশেষ খবর পেতে ফলো করুন।ক্লিক করুন এখানে

Related Articles

Back to top button