প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জেলা

একমাত্র ছেলে হারিয়ে পাগল প্রায় রাব্বির মা

21
একমাত্র ছেলে হারিয়ে পাগল প্রায় রাব্বির মা
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

শাহ তানভীর আহমেদ

একমাত্র ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৬) কে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা পারভীন বেগম। তিনি ছেলের নাম ধরে বিলাপ করতে করতে বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। জ্ঞান ফিরলে আবার ছেলেকে খুঁজছেন।  খুলনা শহরের দৌলতপুর থানার পশ্চিম সেনপাড়া এলাকায় রাব্বির বাড়িতে শোক নেমে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় যশোরের পুলেরহাটে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাব্বিসহ তিন কিশোরকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।  নিহত রাব্বি খুলনা বিভাগীয় ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা মো. রোকা মিয়ার একমাত্র ছেলে।  সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে শনিবার (১৫ আগস্ট) রাব্বির লাশ স্থানীয় মানিকতলা খাদ্যগুদাম সংলগ্ন মসজিদের সামনে জানাজা শেষে মহেশ্বরপাশা কবরস্থানে দাফন করা হয়। রাব্বিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা সন্তান হারিয়ে বিলাপ করছেন। নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা পরিবারসহ এলাকাবাসী মেনে নিতে পারছেন না। এলাকাবাসী এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। দ-প্রাপ্ত কিশোর অপরাধী এবং যে সকল কিশোর বিচারাধীন তাদের সংশোধনের জন্য এ ধরনের উন্নয়ন কেন্দ্রে বন্দি রাখা হয়। কেন্দ্রের কর্মকর্তা মুশফিক আহমেদ দাবি করেন, কেন্দ্রে বন্দি কিশোরদের দুই গ্রুপের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এরই জের ধরে বিকেলে তারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তখন রড ও লাঠির আঘাতে ১৭ কিশোর মারাত্মক জখম হয়।

এর মধ্যে খুলনার দৌলতপুর থানার পশ্চিম সেনপাড়া গ্রামের রোকা মিয়ার ছেলে পারভেজ হাসান রাব্বি (১৮), বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মহিপুর গ্রামের আলহাজ নুরুল ইসলাম নুরুর ছেলে রাসেল ওরফে সুজন (১৮) এবং একই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার তালিপপুর পূর্বপাড়া গ্রামের নানু প্রামাণিকের ছেলে নাঈম হোসেন (১৭) মারা যায়।  তবে জাবেদ হোসেনসহ আহত কয়েক কিশোর জানায়, কর্মকর্তা এবং বন্দি কিশোররা তাদের লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। এতে তারা অচেতন হয়ে পড়ে। জ্ঞান ফিরলে তাদের একইভাবে আবার পেটানো হয়। এতে হতাহত হয়েছে।

আরও পড়ুন:  দাতা সদস্য পদ থেকে পাইকগাছায় ইউপি চেয়ারম্যান মজিদ গোলদারকে অব্যাহতি

বালকদের জন্য দেশে দুটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। এর একটি গাজীপুরের টঙ্গিতে, অন্যটি যশোর শহরতলির পুলেরহাটে। যশোর কেন্দ্রে মোট বন্দির সংখ্যা ২৮০ জন বলে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, মৃত্যুর সাত দিন আগে ফোনে পরিবারকে রাব্বি জানিয়েছিল সে সেখানে থাকতে চায় না। তাকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে। সন্তানের কথা শুনে রোকা মিয়া যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে ছেলেকে অন্যত্র নিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। রোকা মিয়া সন্তানকে শান্ত¡না দেন, একটু অপেক্ষা করতে। দ্রুত তাকে ছাড়িয়ে আনবেন। কিন্তু বাড়িতে এলো ছেলের নিথর দেহ।  পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বন্ধু মহলের বিরোধে গত বছরের ৩১ আগস্ট একই এলাকার মোস্তফা ফরাজীর ছেলে মো. জনী ফরাজী (১৮) খুন হয়। ওই মামলার তিন আসামির মধ্যে রাব্বিও রয়েছে। সে অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে তাকে যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। গত ৮/৯ মাস ধরে সে ওই কেন্দ্রে ছিল।

রোকা মিয়া বলেন, রাব্বি মাঝে-মধ্যে ফোনে তাকে বলতো কেন্দ্রে ঠিকমত খেতে দেয় না। খাবার চাইলে কারণে-অকারণে নির্যাতন করে। দুই সপ্তাহ আগে খাবার নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কয়েকজন বন্দির কথা কাটাকটি হয়েছে। সেখানকার কর্মকর্তাদের মদদপুষ্ট কিছু বন্দি একজোট হয়ে তাদের নির্যাতন করছে। রোকা মিয়া বলেন, ‘‘আমার ছেলে আমাকে বলেছিল ‘বাবা আমি আর যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকতে চাই না, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও’। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সকালে ফোন করে জানায় ‘এখানে ঝামেলা হচ্ছে। তোমরা আমাকে নিয়ে যাও’। ওইদিনই ছেলের মৃত্যুর খবর আসে।’’ রোকা মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলের লাশ আনতে গিয়ে আহত বন্দিসহ অনেকের কাছে নির্মম নির্যাতনের কথা শুনেছেন। ‘‘২/৩ দিন না খাওয়া আমার ছেলেসহ কিশোর বন্দিদের প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারী ও তাদের মদদপুষ্ট বন্দিরা অডিটরিয়ামের সিঁড়ি ঘরের নিচে গ্রিলের সঙ্গে হ্যান্ডকাপ দিয়ে বেঁধে, মুখে গামছা ঢুকিয়ে লোহার রড, লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারপিট করে। ‘‘এরপর মুমূর্ষু অবস্থায় তাদের চিকিৎসা না করে অডিটরিয়ামের মেঝেতে ফেলে রাখে। পরে তাদের হাসপাতালে নেয়, কিন্তু তার আগে রাব্বি, নাঈম হোসেন ও রাসেল ওরফে সুজন মারা যায়।’’ শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা একই এলাকার মো. আলমগীরের ছেলে মো. জনী গুরুতর আহত অবস্থায় যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে বলে জানান তিনি। রোকা মিয়া বাদী হয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বন্দিদের আসামি করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন:  শার্শায় ১০ কিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান : ৬টি স্থায়ীভাবে বন্ধ

পুলিশ এই মামলায় কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares