প্রচ্ছদ এডিটরস পিক

করোনাকালে অনিয়ম, সড়ক দুর্ঘটনা ও অপরাধ বৃদ্ধি

20
করোনাকালে অনিয়ম, সড়ক দুর্ঘটনা ও অপরাধ বৃদ্ধি
পড়া যাবে: 4 মিনিটে
প্রতীকী ছবি

সাহাদাৎ রানা

করোনাভাইরাসের কারণে নতুন এক চ্যালেঞ্জের সামনে পুরো বিশ্ব। সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই যেন প্রতিদিন, দিন পার করছে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। তাই সারা বিশ্বে এখন আলোচনার প্রধান ও একমাত্র বিষয় হলো করানোভাইরাস। কেননা এর বিরূপ প্রভাবে প্রায় থমকে সবকিছু। যেন থেমে গেছে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রাও। এমন পরিস্থিতির মূল কারণ প্রতিদিনই সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। কঠিন এমন অবস্থা থেকে বিশ্ববাসী কবে নাগাদ মুক্তি পাবেন তা কেউ বলতে পারছেন না। কারণ এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস প্রতিরোধে কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। তাই করোনাভাইরাস বিষয়ে সবার মধ্যে কাজ করছে ভয়। বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এমন খবরে সবার মধ্যে কাজ করছে অস্বস্তি। রয়েছে আরও অনেক অস্বস্তির জায়গা। বিশেষ করে করোনাকালে করোনাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষ করছেন সীমাহীন দুর্নীতি আর কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন অনিয়মের সঙ্গে। যার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

দুর্নীতি ও অনিয়ম একটি রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার পথকে সবসময়ই বাধাগ্রস্ত করে। ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে মাঝারি সব পর্যায়ে পড়ে এর নেতিবাচক প্রভাব। বিশেষ করে যা অর্থনীতির জন্য অশনি সংকেত। বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে দুর্নীতির চিত্র তুলনামূলক বেশি। তবে সবাই আশা করেছিল করোনাকালে কিছুটা হলেও দুর্নীতি কমবে। কিন্তু ক্ষেত্রে বিশেষে দুর্নীতি বেড়েছে। যখন করোনার সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম দুর্নীতি হওয়ার কথা সেখানে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। মূলত করোনাকালে করোনাকে পুঁজি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িয়ে পড়েন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি চেয়ারম্যান ডাক্তার সাবরিনার হাসপাতাল। তারা হাজার হাজার ভুয়া করোনা রিপোর্ট দিয়েছে জনগণকে। বিনিময়ে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। তাদের এমন কর্মকান্ডে বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হাসপাতালের অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসার পর বেরিয়ে এসেছে আরও অনেক তথ্য। যা এত দিন অনেকের কাছেই ছিল অজানা। এখানে আরও উদ্বেগের খবর হলো- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সেবা প্রদানের অনুমতি দিয়েছে এসব অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই লাইসেন্স নবায়ন। অন্য অনেক বিভাগের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি না জানা থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ জানবে না এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ স্বাস্থ্য বিভাগের যাচাই-বাছাইয়ের পরই অনুমোদনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হলো- তাহলে কারা যাচাই-বাছাই করল। কোন প্রক্রিয়ায় করা হলো। নিশ্চয় সেখানে কোনো ফাঁকি রয়েছে। এটা সত্য- এ ক্ষেত্রে কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে পরীক্ষা করার অনুমোদন নিয়েছে কিছু হাসপাতাল। এখানে দুঃখজনক তথ্য হলো- অনেক হাসপাতাল ‘পিসিআর’ পরীক্ষার অনুমোদন নিয়ে রাখলেও এজন্য প্রয়োজনীয় মেশিন ও সরঞ্জাম নেই তাদের। মেশিন ও সরঞ্জাম না থাকলেও অজানা ক্ষমতার প্রভাবে এসব বেসরকারি হাসপাতালগুলো অনুমোদন পেয়েছে করোনা পরীক্ষার। আর এ সুযোগে পরীক্ষার নামে সেই অসাধুচক্র রোগীদের কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। হাজার হাজার ভুয়া করোনা রিপোর্টের তথ্যই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণপত্র। অথচ নিয়ম হলো- কোনো বেসরকারি হাসপাতালকে অনুমোদন দেওয়া হলে সবার আগে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় করোনা রোগীর সেবা দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে কিনা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমন নিয়ম মানা হয়নি। কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে এসব করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:  পশ্চিমা গণতন্ত্রের পতন এবং রিজিম চেইঞ্জ : ত্রিপলিতানিয়া থেকে বেলারুশ

আমাদের দেশের বাস্তবতায় মানুষ সরকারি হাসপাতালের ভোগান্তির কথা ভেবে বেসরকারি হাসপাতালমুখী হন। সবার বিশ্বাস টাকা বেশি লাগলেও ভালো সেবা পাওয়া যাবে বেসরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বাসের জায়গায়ও বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে করোনাকালে এমন খবর সবার মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। শুধু করোনা রোগী নয়, অন্য সাধারণ রোগী নিয়েও স্বজনদের ভয় কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। আমাদের দেশে অবশ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিষয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে অনেক আগে থেকেই। তারপরও মানুষ সরকারি হাসপাতালের অবহেলার কারণে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যেত। কিন্তু এমন তথ্য সবার সামনে প্রকাশিত হওয়ায় সবাই এখন নড়েচড়ে বসেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- সারা দেশে এমন অসংখ্য হাসপাতাল রয়েছে, যাদের প্রধান কাজ হলো মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা।

পরিসংখ্যান বলছে বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ১৭ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এমন পরিসংখ্যানের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। যার অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এখানে শঙ্কার তথ্য হলো অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন নেই। প্রতি বছর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা বাধ্যতামূলক হলেও দেশের অর্ধেকের বেশি লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না। কিছু করা হয় অবৈধ উপায়ে। আর বাকিগুলো লাইসেন্স ছাড়াই চলতে থাকে বছরের পর বছর। আর এসব কাজগুলো করেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সারা বছরই স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতির কথা যেন সবার কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সবার প্রত্যাশা ছিল করোনাকালে সেই দুর্নীতি কমে আসবে। কিন্তু কমেনি। বরং করোনাকে পুঁজি করে একশ্রেণির মানুষ প্রতারণা করছেন। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো আইন ও নিয়মনীতি না মেনে নিজের ইচ্ছামতো যা ইচ্ছে তাই করছে।

করোনাকালে দুর্নীতির আরও একটি বড় উদাহরণ মাস্ক কেলেঙ্কারি। সারা বিশ্বে করোনার সময়ে মাস্ক ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তবে অন্য দেশে নকল মাস্ক তৈরির খবর পাওনা না গেলেও আমাদের দেশের কিছু ব্যবসায়ী নকল মাস্ক তৈরি করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। শুধু মাস্ক নয়, করোনাকালে অতি প্রয়োজনীয় হ্যান্ড সেনিটাইজার নিয়েও হয়েছে অনিয়ম। এখন নকল হ্যান্ড সেনিটাইজারে বাজার সয়লাব। এ ছাড়া এ সময় ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। নামি-দামি ওষুধের দোকান থেকে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উদ্ধার করার খবর সবাইকে হতাশ করেছে। আমাদের দেশে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খবর সবসময়ের। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এবার হয়তো করোনার সময়ে মানবিক দিক বিবেচনা করে এমন অসৎ কাজে যুক্ত হবেন না ব্যবসায়ীরা। কিন্তু না, উল্টো এমন প্রবণতা কমেনি বরং বেড়েছে। এমন বাড়ার খবরে সবাইকে আতঙ্কিত ও হতাশ করেছে। যেখানে মানুষ সুস্থ হওয়ার জন্য ওষুধ খাবেন সেখানে সেই ওষুধ খেয়ে অসুস্থ হওয়ার উপক্রম।

আরও পড়ুন:  নিত্যপণ্যের বাজারে অসহায় ক্রেতা ব্যবসায়ীদের কারসাজি রুখতে হবে

করোনার সময়ে আরও একটি বিষয় বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা সড়ক দুর্ঘটনা। কয়েক মাস দেশ লকডাউন থাকার সময়েও সড়ক দুর্ঘটনা থেমে থাকেনি। সে সময় গাড়ি বন্ধ থাকায় নিহতের সংখ্যা কম ছিল। এখন লকডাউন উঠে যাওয়ায় আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে সড়কে নিহতের সংখ্যা। যেন প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। প্রতিদিন করোনায় যে পরিমাণ মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়ও মৃতু্যর সংখ্যা কম নয়। এ থেকে কবে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব হবে তা যেন কারও জানা নেই। করোনাকালে সবাই মানবিক হবেন, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে প্রত্যাশা ছিল এমন। কিন্তু অনেকাংশে তা হয়নি। করোনার সময়েও অপরাধ থেমে থাকেনি। দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়েছে ছিনতাইসহ নানা অপরাধ। এসময় সবচেয়ে বেশি তৎপর রয়েছে মাদক ব্যবসায়ীরা। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে মাদক।

এমন খবর সবসময়ের জন্যই অস্বস্তির। বিশেষ করে করোনার সময়ে এমন খবরে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে সরকার বরাবরের মতো এবারও দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। করোনা টেস্ট ও মাস্কেও প্রতারণার সঙ্গে যারাই জড়িত ছিল তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। এটা ইতিবাচক বার্তা সবার জন্য। তবে এখন এসব বিষয়ে আরও কিছু উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি রোধে সজাগ থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের উচিত এ বিষয়ে আরও নজরদারি ও তৎপরতা অব্যাহত রাখা। যারাই দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকবেন তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে। তবেই হয়তো দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে। এ ছাড়া

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকেও বিশেষ নজর নিতে হবে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares