প্রচ্ছদ বাংলাদেশ জাতীয়

করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের তাগিদ সিদ্ধান্তের অপেক্ষা

14
করোনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের তাগিদ সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

বিশ্বে করোনার আয়ুষ্কাল প্রায় আট মাস চলছে। এই সময়ে ভাইরাসটি প্রতিরোধে এখনো কোনো কার্যকর ওষুধ মেলেনি দুনিয়ায়। তবে এর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে টিকা তৈরির পেছনে ছুটছে বিভিন্ন দেশ। টিকা বা ভ্যাকসিন তৈরিকারী দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ এখনো দৃশ্যত কোনো যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি। এক প্রকার সিদ্ধান্তহীনতা ভর করেছে। এই সিদ্ধান্তহীনতা শুধু টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নয়। দেশে টিকার ট্রায়াল দেয়ার ক্ষেত্রেও। অথচ কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার গঠিত জাতীয় কারিগরি কমিটিও ভ্যাকসিনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার তাগিদ দিয়েছে।

একই সঙ্গে দেশেই টিকার ট্রায়ালের পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। যদিও এ পর্যন্ত পরামর্শক কমিটির মতামতকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়নি স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে। করোনার ওষুধ আবিষ্কার না হওয়ায় পুরো বিশ্ব এখন ভ্যাকসিনের অপেক্ষায়। দেশের মানুষও অপেক্ষায় কবে ভ্যাকসিনের সুখবর আসবে। তবে এ পর্যন্ত ভ্যাকসিন নিয়ে কোনো আশার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

দেশের বিশেষজ্ঞরা টিকা বা ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে বলছেন, যারা টিকা আবিষ্কার করছেন তাদের সঙ্গে দৌড়াতে। কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি পরামর্শ দিয়েছে, করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে টিকার ট্রায়াল বাংলাদেশে হওয়া উচিত। পরামর্শক কমিটির মত, টিকা আন্তর্জাতিক বাজারে এসে গেলে তা কীভাবে প্রথমেই বাংলাদেশে নিয়ে আসা যায় তা বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনই নেয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের এই কমিটি মনে করে, বাংলাদেশে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হলে প্রথমত বাংলাদেশ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তা প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই টিকা সফল প্রমাণিত হলে সর্বাগ্রে পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে। বুধবার কমিটির সর্বশেষ বৈঠক থেকেই এমন পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, গত বুধবার ঢাকায় ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে সম্ভাব্য কোভিড-১৯ টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র সচিবকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ট্রায়াল সহ কোভিড-১৯ টিকা তৈরিতে যেকোনো ধরনের সহযোগিতা করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। টিকা প্রস্তুত হলে সাশ্রয়ী মূল্যে শুরুতেই পেতে চায় বাংলাদেশ।

গত ১৯শে আগস্ট কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির ১৭তম অনলাইন সভা থেকে এ পরামর্শ দেয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লাহ। কোভিড-১৯ বিশ্ব মহামারি মোকাবিলায় টিকার গুরুত্ব বিবেচনা করে এ বিষয়ে জাতীয় পরামর্শক কমিটি তাদের প্রস্তাব দেয় সরকারকে।

কমিটি তাদের প্রস্তাবে বলেছে, বাংলাদেশে কি পরিমাণে টিকার প্রয়োজন, তা সংগ্রহে কত খরচ হবে কিংবা বিনামূল্যে পাওয়া যাবে কিনা এ ব্যাপারে এখনই হিসাব করা প্রয়োজন। এখন থেকেই যে সব প্রতিষ্ঠান বা দেশ টিকার ট্রায়ালের তৃতীয় পর্যায়ে আছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত যেন টিকা মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতি পাওয়া মাত্রই বাংলাদেশ তা পেতে পারে। টিকা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় সিরিঞ্জ পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদন বা ক্রয় করার প্রস্তুতি থাকার কথাও বাতলে দেন পরামর্শক কমিটি। টিকা প্রাপ্তির পরে টিকার সংরক্ষণ (ঝঢ়ধপব রিঃয ঈড়ষফ পযধরহ), বিতরণ, লোকবল, সরঞ্জামসহ সকল পরিকল্পনা/ ব্যবস্থাপনা (গরপৎড়ঢ়ষধহহরহম) এখনই ঠিক করে রাখা উচিত। টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনসংখ্যা অগ্রাধিকার পাবে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অগ্রাধিকারে কোনো জনগোষ্ঠী সেটা নির্ধারণ করে রাখা প্রয়োজন বলে কমিটি মত দিয়েছে। সাধারণত প্রথম ব্যবহারযোগ্য ভ্যাকসিন/টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমেই বিতরণ করা হয়। একটি নির্দিষ্ট মাথাপিছু আয়ের নিচে যেসব দেশ সেসব দেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিনামূল্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক ভ্যাকসিন/টিকা দিয়ে থাকে এবং কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন/টিকার ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে যেটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই ঋধংঃ ঃৎধপশ (দ্রুত ব্যবস্থা) এর মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করার লক্ষ্যে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা সে দেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করা এবং প্রয়োজনীয় অগ্রিম অর্থ প্রদান করার প্রয়োজন হতে পারে।

আরও পড়ুন:  বাংলাদেশে প্রতি ৫ টেস্টে ১ জনের করোনা শনাক্ত

কমিটি পরামর্শ দিয়ে বলেছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে টিকার ট্রায়াল বাংলাদেশে হওয়া উচিত। বিশ্বের যে সব দেশ যেমন: যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া টিকার গবেষণায় এগিয়ে আছে। তারা তাদের টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্যান্য দেশও অংশগ্রহণ করছে। যেমন: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল ব্রাজিল ও ভারতে হচ্ছে। চীনের সিনোভ্যাক টিকা ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, চিলি, ফিলিপিন ও তুরস্কে হচ্ছে। বাংলাদেশে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হলে প্রথমত বাংলাদেশ এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তা প্রমাণের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং এই টিকা সফল প্রমাণিত হলে সর্বাগ্রে পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া থাকবে।এদিকে, ভারতের তৈরি সম্ভাব্য কোভিড-১৯ টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। বুধবার ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন তিনি। সোনারগাঁও হোটেলে তাদের বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পররাষ্ট্র সচিবকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ট্রায়ালসহ কোভিড-১৯ টিকা তৈরিতে যে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। টিকা প্রস্তুত হলে সাশ্রয়ী মূল্যে শুরুতেই পেতে চায় বাংলাদেশ। ১৩০ কোটি মানুষের দেশ ভারতে নিজেদের চাহিদা মেটাতেই বিপুল পরিমাণ টিকা উৎপাদন করতে হবে বলে দামও কিছুটা কমে আসবে। ঢাকায় ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে সম্ভাব্য কোভিড-১৯ টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকার পরীক্ষায় বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেন মাসুদ বিন মোমেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কোভিড নিয়ন্ত্রণে ভারতের যে প্রচেষ্টা চলছে, আমরা জানি যে কিছু ভ্যাকসিন সেখানে ডেভেলপ করছে এবং ট্রায়ালও শুরু হয়ে গেছে। আমরা অফার করেছি যদি সহযোগিতার প্রয়োজন হয়, ট্রায়ালের ক্ষেত্রে, তাহলে আমরা প্রস্তুত আছি। বাংলাদেশের প্রস্তাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সাড়া দিয়েছেন বলেও বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ। শ্রিংলাও সাংবাদিকদের বলেন, ভারত টিকা উৎপাদনে গেলে বাংলাদেশ সহ প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলো অগ্রাধিকার পাবে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমাদের জন্য বাংলাদেশ সব সময় অগ্রাধিকারে আছে।

আরও পড়ুন:  শেখ হাসিনার প্রশংসা করলেন এরদোগান

বুধবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দেশে ভ্যাকসিন আমদানির বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, চীন, রাশিয়া, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য সহ সব দেশের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। ভ্যাকসিনের গুণগত মান, সহজলভ্যতা, কার্যকারিতা বিচার বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা সব দিকে খোঁজখবর রাখছি। ভ্যাকসিনের বিষয়টি নিয়ে সজাগ আছি। প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছি, উনিও অবহিত হচ্ছেন। আমরা যখন সিদ্ধান্ত পেয়ে যাবো তখন জানাবো। আমাদের জন্য সবচেয়ে কোন্‌টা ভালো, কে দিতে পারবে, চাহিদা কেমন, সব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেব।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের করোনাভাইরাসের টিকা এখন তৃতীয় ধাপের পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়া প্রথম দেশ হিসেবে টিকা উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যে চীনের সিনোভ্যাক বায়োটেক লিমিটেড তাদের তৈরি করা টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা বাংলাদেশেও করার পরিকল্পনা করেছিল। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলও গত ১৮ই জুলাই বাংলাদেশে ওই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অনুমোদন দিয়েছিল। ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে চীনা টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের কাজটি করার কথা ছিল আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র-আইসিডিডিআর,বি’র। বলা হয়েছিল, দেশের সাতটি হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর এই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হবে। তবে সে বিষয়টি পরে ঝুলে যায়।

এদিকে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করা টিকার পরীক্ষা ও উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত হয়েছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটি অফ ইন্ডিয়া (এসআইই)। দ্বিতীয় ধাপ থেকেই কোভিশিল্ড নামের ওই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ করে যাচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী এই সংস্থা।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares