প্রচ্ছদ এডিটরস পিক

করোনা-পরবর্তী বিমা শিল্প

14
করোনা-পরবর্তী বিমা শিল্প
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

মীর নাজিম উদ্দিন আহমেদ

বিমা শিল্প সরকারের রাজস্ব আদায়ের বাতিঘর। সমুদ্রে যেমন নাবিকদের সঠিক পথ দেখাতে বাতিঘরের ব্যবহার করা হয়- তেমনি বিমা শিল্প বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, ব্যবসাবাণিজ্য থেকে সংগৃহীত প্রিমিয়াম ৭.৫ (সাড়ে সাত) লাখ কর্মীর মাধ্যমে সংগ্রহ করে সরকারের কোষাগারে প্রাপ্যটুকু জমার ব্যবস্থা করে। অথচ বিমা কর্মীদের পরিবারের প্রায় ৩০ লাখ সদস্য অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন কাটাচ্ছে। করোনা-পরবর্তী সরকারের রাজস্ব আদায়, কোম্পানির আর্থিক অবস্থান এবং কর্মীদের পারিবারিক চিত্র তুলে ধরার মানসে এই লেখা।

ইদানীং আমরা একটি কথা শুনতে পাই, তুমি তোমার পরিবারের জন্য অমূল্য সম্পদ, তোমার মৃতু্যতে তোমার পরিবার-পরিজন উপার্জনক্ষম একজনকে হারিয়ে পথে বসবে কারণ তুমি তাদের কাছে পুরো পৃথিবী। আর তোমার মৃতু্যতে সরকারি হিসাবে একটি সংখ্যা যোগ হবে। এত কিছুর পরেও সরকার দোদুল্যমান অবস্থায় একটি সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ৩১ মে, ২০২০ থেকে স্কুল-কলেজ বাদে সব প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। জীবনের জন্য লকডাউন যেমন দরকার জীবিকার জন্য লকডাউন সীমিত করা ছাড়া কোনো বিকল্প উপায় নেই।

বাংলাদেশে লাইফ এবং নন-লাইফ মিলে মোট ৭৮টি বিমা কোম্পানি করোনামুক্ত পরিবেশে কাজ করে যাচ্ছিল। এদের মধ্যে সাধারণ বিমা করপোরেশন ছাড়া বেসরকারি ৪৫টি বিমা কোম্পানি নন-লাইফ সেক্টরে কাজ করে যাচ্ছে।

আমরা যদি একটি আনুমানিক তথ্যের ভিত্তিতে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব ছোট ছোট কোম্পানিগুলো প্রতি মাসে ২-৩ কোটি, মাঝরি কোম্পানিগুলো ৪-৫ কোটি এবং বড় কোম্পানিগুলো ১৫-৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রিমিয়াম আয় করে থাকে। সে হিসাবে যদি এভারেজ প্রতিটি কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় প্রতি মাসে ৫ কোটি হিসাবে ধরি তাহলে মোট ৪৫টি বেসরকারি বিমা কোম্পানির প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় ২২৫ কোটি টাকা। করোনাকালীন যদি কোম্পানিগুলো এপ্রিল মাসে ৫০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম আয় করে থাকে তবে এই সেক্টর এপ্রিল মাসে নূ্যনতম ১৭৫ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর যদি সীমিতভাবে করোনাকালীন এপ্রিল, মে, জুন এই তিন মাস পর্যন্ত ধরি তাহলে আনুমানিক ক্ষতি হবে ৫২৫ কোটি টাকা। সাধারণ বীমা করপোরেশনের হিসাব এখানে নেই।

আরও পড়ুন:  প্রাণ বাঁচাতে ওজোনস্তর রক্ষা করতে হবে

প্রতিটি কোম্পানি প্রিমিয়াম আয় থেকে বঞ্চিত হলেও এপ্রিল মাসের বেতন ও বোনাস বাবদ আনুমানিক ৯০ কোটি টাকা প্রদান করেছে- যা পূর্বে সঞ্চিত আয় থেকে ব্যয় করতে হয়েছে। মে মাসেও বেতন হিসাবে আনুমানিক ৬০ কোটি এবং জুন মাসে প্রায় ৯০ কোটি (কোরবানির ঈদসহ) টাকা বেতন ও বোনাস হিসাবে প্রদান করতে হবে। এই তিন মাসে সর্বমোট ২৪০ কোটি টাকা কোম্পানির আয় না থাকলেও বিমা কোম্পানিগুলোকে তাদের বিমাকর্মীদের প্রদান করতে হবে।

এবার সরকারি রাজস্বের কথায় আসা যাক, তিন মাসের নেট প্রিমিয়াম ক্ষতি আনুমানিক ৫২৫ কোটি (পুরোপুরি তথ্যনির্ভর নয়, এই হিসাব কম-বেশি হতে পারে, আইডিআরএ ও বিআইএ কোম্পানিগুলোর কাছে তথ্য চেয়েছে, সহসাই প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে) সেই হিসাবে সরকার তিন মাসে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা (ভ্যাট ও স্ট্যাম্প বাবদ)। তাছাড়া প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তির আয়কর থেকে বঞ্চিত হবে।

নন-লাইফ পুরোপুরি এখনো এজেন্টনির্ভর নয় বলে কর্মীরা তাদের মাসিক বেতন ও বোনাস পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু লাইফ ইন্সু্যরেন্স এজেন্টনির্ভর বলে তাদের ব্যবসা না থাকাতে বা সামাজিক দূরত্বের কারণে বিমা গ্রহীতাদের সঙ্গে যোগাযোগ মোটামুটি বিচ্ছিন্ন থাকাতে এই সেক্টরের অবস্থা আরও খারাপ।

জীবন বীমা করপোরেশন ও মেট লাইফ ছাড়া বেসরকারি খাতে এদেশীয় ৩০টি বিমা কোম্পানি কাজ করে যাচ্ছে। ছোট ছোট কোম্পানিগুলো প্রতি মাসে ১-২ কোটি, মাঝারি কোম্পানিগুলো ৫-৭ কোটি এবং বড় কোম্পানিগুলো আনুমানিক ৩০-১০০ কোটি টাকার ব্যবসা করে থাকে। সেই হিসাবে যদি প্রতি কোম্পানির মাসিক এভারেজ আয় ১০ কোটি টাকা হিসাবে গণনা করা হয় তবে প্রতি মাসে ৩০টি কোম্পানির আনুমানিক প্রিমিয়াম আয় দাঁড়ায় ৩০০ কোটি টাকা। করোনাকালীন এপ্রিল মাসে সীমিত আকারে যদি কোম্পানিগুলো ১০০ কোটি টাকার প্রিমিয়াম জমা করতে সমর্থ হয় তবু মাসিক ক্ষতি ২০০ কোটি টাকা।

আর শিল্পে কর্মরত অফিস কর্মকর্তা ও স্টাফদের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে বেতন-ভাতা ও বোনাস বাবদ অনেক টাকা প্রদান করতে হবে এবং মানবিক বিবেচনায় এজেন্টদেরও কিছু আর্থিক অনুদান বা অগ্রিম দিতে হবে। তাই সার্বিক অবস্থায় তিন মাসে সরকার আনুপাতিক ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব ও আয়কর থেকে বঞ্চিত হবে। কোম্পানি ব্যবসা না করেও বেতন-ভাতা এবং এজেন্টরা ব্যবসা না করতে পারাতে মাসিক আয় থেকে বঞ্চিত হবে। তাই বাধ্য হয়ে অনেককে বিমা পেশা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে।

আরও পড়ুন:  ঘুরে দাঁড়াচ্ছে পোশাকশিল্প

সার্বিক বিবেচনায় করোনাকালীন বিমা শিল্প ও অন্যান্য সেক্টরের ন্যায় যেমন গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, পর্যটন, সড়ক পরিবহণ, নৌপরিবহণ, বিমান পরিবহণের মতো গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়বে।

এই সংকটপূর্ণ সময় থেকে উত্তরণের জন্য আল কোরআনের ৪টি মোটিভেশনাল শব্দের মাধ্যমে লেখাটি শেষ করতে চাই।

লা তাগদাব: জীবনে চলার পথে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়ের সম্মুখীন হতে হবে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।

লা তাসখাত : আলস্নাহর কোনো ফয়সালার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা যাবে না।

লা তাহযান: অতীত নিয়ে কখনো হতাশ হওয়া যাবে না।

লা তাখাফ : ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা না করে তাওয়াক্কালতু আলস্নাহ্‌ অর্থাৎ আলস্নাহর ওপর সোপর্দ করতে হবে।

সেই সঙ্গে নেলসন ম্যান্ডেলার সেই কথাটা না বললেই নয়- ‘দেরিতে হবে কিন্তু ঠিকই হবে, তুমি যা চাও তাই হবে। মনে রেখো তোমার সময়টা খারাপ তোমার জীবনটা নয়, শুধু অপেক্ষা করো সময় সব কিছু ফিরিয়ে দেবে।’

আর কিছু না হোক করোনা আমাদের পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করেছে। একে অপরকে জানার সুযোগ করে দিয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতিগুলো পুনর্জীবিত করেছে, সৃষ্টিশীলতা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে।

তাছাড়া বউদের জীবন থেকে দুটি প্রশ্ন প্রায় হারিয়েই গেছে।

১. কোথায় আছ?

২. বাসায় কখন আসবা?

এটাও একটা পজিটিভ দিক।

ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, পরিবারের প্রতি, প্রতিষ্ঠানের প্রতি দরদী হউন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিরাপদে থাকুন।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares