প্রচ্ছদ এডিটরস পিক

নজরুলের সৃষ্টি সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব

12
নজরুলের সৃষ্টি সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

শাকিলা নাছরিন পাপিয়া

‘চরণ ফেলিও ধীরে ধীরে প্রিয়

আমার সমাধি পরে।’

আমার প্রিয় একটি গান। বারবার শুনেও তৃষ্ণা মেটে না যেসব গানে এটা তেমনই একটা গান আমার কাছে।

ফিরোজা বেগম, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অ্যালবামে এ গানটি আছে। কিশোরী বয়স থেকে বেতারে, টেপ রেকর্ডারে গানটি শুনে আসছি।

অর্ধশত বছর পার করেও গানটির ভালো লাগা একটুও কমেনি।

নজরুল গীতি হিসেবে এতদিন জেনে এসেছি যে গানটি হঠাৎ করে সে গানটি গুগল বলছে প্রণব রায়ের লেখা। একই গান ইউটিউব বলছে কোথাও নজরুল গীতি আবার কোথাও প্রণব রায়ের লেখা।

এটা কি করে হয়?

ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে আর কমল দাশ গুপ্তের সুরে সব গানই যেন নজরুল গীতি হয়ে উঠে।

‘এমনই বরষা ছিল সেদিন

শিয়রে প্রদীপ ছিল মলিন।’

এ গানটি আমার মতো অনেকেই জানতো এটা নজরুল গীতি। কিন্তু গুগলে গিয়ে দেখা গেল কোথাও লেখা প্রণব রায় আবার কোথাও লেখা পুলক বন্দোপাধ্যায়।

নজরুল বাংলাসাহিত্যে ধূমকেতু। সাইক্লোনের মতো পূর্বের সব উড়িয়ে দিয়ে আপন আলোয় উদ্ভাসিত। বহুকাল যাবত একই গতিতে চলে আসা সবকিছু লন্ডভন্ড করে খোদার আসন আরশ ছেঁদিয়া উঠবার মতো দৃঢ়তা নিয়ে নজরুল স্বপ্রতিভায় বিকশিত হয়েছিলেন।

জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, দরিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করা নজরুল জীবন থেকেই চয়ন করেছিলেন আগুন দীপ্ত শব্দ।

গান, কবিতা, গল্প সব কিছুতেই আলাদা তেজ নিয়ে জ্বলে উঠেছিলেন তার সময়ে।

নজরুল নিজেই বলেছিলেন, গানের জন্য তাকে মনে রাখতে হবে।

নজরুল কখনোই গুছানো স্বভাবের ছিলেন না। তাৎক্ষণিকভাবে বহু গান কবিতা লিখেছেন। যে চেয়েছে তাকেই দিয়েছেন তার রচনা। নজরুলের কাছের বন্ধু কমরেড মোজাফফর আহমদ তার কিছু গান, কবিতা উদ্ধার করেছিলেন।

একবার নজরুলের একটি পান্ডুলিপি হারিয়ে গিয়েছিল। গানগুলো তখন অন্য একজনের নামে প্রচার হয়ে গেছে। নজরুলের এক ভক্ত এই পান্ডুলিপি উদ্ধার করে নিয়ে এলো। নজরুল তাকে বিষয়টি চেপে যেতে বলেন। কারণ কথাটা প্রকাশ করে তিনি ওই ব্যক্তিকে লজ্জা দিতে চাননি। বরং তিনি বলেছিলেন, ‘সাগর থেকে দুফোটা জল কেউ নিয়ে গেলে সাগর শুকিয়ে যায় না।’

আরও পড়ুন:  সুশাসন ও শিক্ষা

নজরুলের জীবদ্দশায়ই তার অনেক গান কবিতা অন্যের নামে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা এই সহজ, সরল অথচ প্রতিবাদী,

প্রেমময় মানুষটির জীবন সুন্দর করতে, তার দরিদ্রতাকে দূর করে নিশ্চিন্ত একটা জীবন তাকে দিতে পারিনি।

একজন মানুষ কতটা অসহায় হলে ছেলের মৃত দেহ বাড়িতে রেখে প্রকাশকের কাছে পাওনা টাকার জন্য যেতে হয়। তা কি ভেবে দেখেছি?

আবার একটা সমাজে মানুষ কতটা নির্দয় হলে বাড়িতে পুত্রের লাশ রেখে আসা পিতাকে টাকা দেওয়ার জন্য লিখতে কাগজ এগিয়ে দেয়া হয়?

নজরুলের হৃদয়ের রক্তক্ষরণে, বেদনার কালিতে, একজন পিতার হাহাকার হয়ে লেখা হয়েছে সেই অমর গান্ত

‘শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে

আমার গানের বুলবুলি’।

আমাদের দেশে নজরুল গবেষণা ইনস্টিটিউট আছে। অতি আড়ম্বরের সঙ্গে তার জন্ম এবং মৃতু্য দিবস পালন করা হয়। অথচ তার যেসব সৃষ্টি হারিয়ে গেছে, অন্যের নামে প্রচারিত হচ্ছে তা কেন উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হচ্ছে না?

নজরুলকে ভালোবেসে তাকে নিয়ে এ দেশের অনেক মেধাবী গবেষণা করছে। তারা নীরবে নিভৃতে তাদের কাজ করে যাচ্ছে কোনো প্রচার ছাড়াই। এদের কাজে লাগানো, এদের জনসম্মুখে নিয়ে আসা উচিত।

নজরুলকে নিয়ে অনেক বছর যাবত চর্চা করছেন, গবেষণা করছেন এমনই এক নিভৃতচারী শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম জীবন। তিনি আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজের বাংলার প্রভাষক।

নজরুলের বিখ্যাত একটা গানের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী দেবো খোঁপায় তারার ফুল।’

কবি বিশেষ একজনকে রাণী সম্বোধন করতেন। তাকে কবি প্রিয়া হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। প্রিয়া হলে তাকে কী কী উপহার দেবেন তারই বর্ণনা পুরো গান জুড়ে।

মজার বিষয় হচ্ছে কবির দেয়া কোনো উপহারই টাকা দিয়ে কেনা যাবে না। একাধারে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক ইত্যাদি অলঙ্কারে এ এক অসাধারণ প্রদর্শনী, অসাধারণ কাব্যালংকার প্রয়োগ করেছেন কবি।

আকাশে অজস্র তারা, এই তারাদের কবি তারাফুল মনে করেন। কবি বলেছেন, প্রিয়া হলে খোঁপায় সেই তারারফুল গুঁজে দেবেন।

তৃতীয় চরণ হলো- ‘কর্ণে দোলাবো তৃতীয়া তিথির চৈতি চাঁদের দুল।’

আরও পড়ুন:  বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

অর্থাৎ একটা বিশেষ লগ্ন বা সময়ের চাঁদ। এই সময়ের চাঁদকে বাঁকানো মনে হয়। অনুষঙ্গ হিসেবে এনেছেন চৈতি অর্থাৎ বিশেষ ধরনের চৈতি ফুল। যে ফুল অবিকল কানের দুলের মতো। বাঁকানো চাঁদের সঙ্গে চৈতি ফুল যুক্ত করে কবি যে অলঙ্কারের জন্ম দিয়েছেন তা এক কথায় অভিনব ও চরম বিস্ময়কর।

এখানে তিথি, চৈতি ও চাঁদ শব্দের ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যা গানটিকে ব্যতিক্রম মাত্রা দান করেছে। জগতের আর কোনো প্রেমিক পুরুষ এতটা ব্যতিক্রম উপহার প্রিয়তমাকে দিয়েছেন বলে জানা যায়নি।

এভাবে সম্পূর্ণ গানের প্রতিটি শব্দের বিশ্লেষণ করে নান্দনিক দিকটি তুলে ধরেছেন এই নজরুল গবেষক।

তিনি দাবি করেছেন, সুযোগ এবং সহায়তা পেলে তিনি নজরুলের গানগুলো বিশ্লেষণ করে অন্যান্য গান থেকে এর আলাদা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পারবেন এবং প্রামাণ করে দিতে পারবেন কোন কোন গান নজরুলের। নজরুলের গানের সুর, কথা আলাদা স্বাতন্ত্র্য বহন করে। ফলে গবেষণা করেই বলা যায়, কোন গানগুলো তার।

আমরা বিশাল বাজেটের নজরুল জয়ন্তী উদযাপন করেই যদি দায়িত্ব শেষ করি তাহলে নজরুলের হারিয়ে যাওয়া গান, কবিতা কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং তথ্য বিভ্রাট দেখা দেবে।

আমাদের নজরুল গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এই গবেষণা কেন্দ্রের উচিত নজরুল সংগীত নিয়ে তথ্যের যে ভুল তা ঠিক করে বিভ্রান্তি দূর করা। নজরুলের হারিয়ে যাওয়া, চুরি হওয়া, সৃষ্টিকে খুঁজে বের করা।

নজরুল বাংলা সাহিত্যে এক বিস্ময়ের নাম। তার সৃষ্টিকে আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা জাতি হিসেবে আমাদের কর্তব্য। এ জন্যই খুঁজে বের করতে হবে সেইসব নজরুল প্রেমিকদের যারা নজরুলকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসেন। তার সৃষ্টিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেন। নজরুলকে নিয়ে ভাবা এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্রকে এ ভাবনাটা ভাবতে হবে।

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares