প্রচ্ছদ স্বাস্থ্য

জ’ন্ডি’স হলে কী খা’বেন কী খা’বে’ন না, জা’না’লেন এই ডা’ক্তা’র

17
জ’ন্ডি’স হলে কী খা’বেন কী খা’বে’ন না, জা’না’লেন এই ডা’ক্তা’র
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

লিভার দে’হের একটি গু’রুত্বপূর্ণ অ’ঙ্গ। লিভার (যকৃৎ) প্রাণীদে’হের বিপাকে কাজ করে। এ ছাড়া এটি শরীরের বিভিন্ন কাজে প্রধান ভূমিকা পালন করে। একজন প্রা’প্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে লিভারের ওজন প্রায় এক দশমিক ৫০ কেজি। সাধারণত দুই ধরণের কোষ দিয়ে লিভার গঠিত হয়। এগু’লো হলো প্যারেনকাইমাল ও নন-প্যারেনকাইমাল।

সারা বিশ্বে প্রায় এক লাখ মানুষ প্রতিবছর লিভারের রোগে মা’রা যায়। লিভারের যে রোগগু’লো সাধারণত হয়, সেগু’লো হলো: ভাইরাল হেপাটাইটিস (জন্ডিস), লিভার সিরোসিস, লিভারের ফোঁড়া, পিত্তথলির বা পিত্তনালির রোগ, ফ্যাটি লিভার, লিভার ক্যানসার ইত্যাদি। তাই লিভারের বিভিন্ন রোগ ভেদে আমর’া কী খাব আর কী খাব না তা জেনে নেওয়া জরুরি। আজ আমর’া একুশে টেলিভিশন অনলাইন পাঠকদের জন্য সে বি’ষয়ে আলাপ করব।

জন্ডিস নিজে কোন রোগ নয়, বরং এটি রোগের লক্ষণ। লিভারের সমস্যা ছাড়াও র’ক্তের রোগ কিংবা পিত্তের স্বাভাবিক প্রবাহ পাথর, ক্যান্সার কিংবা অন্য কোন কারণে বাধাপ্রা’প্ত হলেও জন্ডিস ’হতে পারে। তবে জন্ডিস বলতে সাধারণত আমর’া লিভারের একিউট প্রদাহ বা একিউট হেপাটাইটিস জনিত জন্ডিসকেই বুঝে থাকি।

ভাইরাস থেকে শুরু করে নানা ধরণের ওষুধ, এলকোহল ইত্যাদি অনেক কারণেই লিভারে একিউট হেপাটাইটিস ’হতে পারে। প্রস’ঙ্গত প্যারাসিটামল কিংবা টিবি রোগের ওষুধের কথা বলা যায়। তবে আমা’দের দেশে একিউট হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ই, এ এবং বি ভাইরাস।

এর মধ্যে পানি ও খাদ্যবাহিত আর তৃতীয়টি ছড়ায় মূলত র’ক্তের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস এ ভাইরাস প্রধানত শিশুদের জন্ডিসের কারণ, তবে যে কোন বয়সের মানুষই হেপাটাইটিস ই ও বি ভাইরাসে আ’ক্রা’ন্ত ’হতে পারেন। আমা’দের প্রথাগত বিশ্বা’স হচ্ছে জন্ডিস হলেই বেশি বেশি পানি খেতে হবে।

খেতে হবে বেশি করে আখের রস, ডাবের পানি, গ্লুকোজের সরবত ইত্যাদিও। আসলে ব্যাপারটি কিন্তু এরকম নয়। জন্ডিস রোগীকে সাধারণ মানুষের মতোই পর্যা’প্ত পরিমাণে পানি খেতে হবে। সমস্যা ’হতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম পানি খেলে, কারণ সে ক্ষেত্রে একিউট কিডনি ইনজুরি বা কিডনি ফেইলিওর দেখা দিতে পারে। জন্ডিসের রোগীরা অনেক সময়েই বমি বা বমি-বমি ভাব এবং খাবারে অরুচির কারণে যথেষ্ট পরিমাণে পানি এবং অন্যান্য খাবার খেতে পারেন না। সেক্ষেত্রে রোগীকে শিরায় স্যালাইন দেয়া জরুরি।

বেশি বেশি পানি বা তরল খেলে প্রস্রাবের রং অনেকটাই হালকা বা সাদা হয়ে আসে বলে জন্ডিসের রোগীরা প্রায় বেশি বেশি তরল খাবার খেয়ে থাকেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে যে, এতে জন্ডিস কিন্তু এতটুকুও কমে না। ধ’রা যাক এক বালতি এবং এক গ্লাস পানিতে এক চামচ করে হলুদ রং গু’লিয়ে দেয়া হলো।

আরও পড়ুন:  দাঁ’ড়ি’য়ে পানি পান করলে যেসব শা*রি*রী*ক স’ম’স্যা হয়

গ্লাসের চেয়ে বালতির পানি অনেক কম হলুদ দেখালেও আসলে কিন্তু গ্লাস আর বালতি দুটোতেই হলুদ রঙের পরিমাণ সমান। তেমনি বেশি বেশি পানি খেলে ঘন-ঘন প্রসাব হয় বলে তা কিছুটা হালকা হয়ে এলেও র’ক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ এতে বিন্দুমাত্রও কমে না। বরং বিশ্রামই যেখানে জন্ডিস রোগীর প্রধান সমস্যা,

সেখানে প্রস্রাব করার জন্য বারবার টয়লেটে যেতে হলে রোগীর বিশ্রামে ব্যাঘা’ত ঘটে, যা রোগীর জন্য মোটেও ম’ঙ্গলজনক নয়। তেমনিভাবে বেশি বেশি ফলের রস খাওয়াও বু’দ্ধিমানোচিত হবে না। কারণ এতেও একই কারণে রোগীর বিশ্রামের ব্যাঘা’ত ঘটে। পাশাপাশি বেশি বেশি ফলের রস খেলে পেটের মধ্যে ফার্মেন্টেশনের কারণে রোগীর পেট ফাপা, খাওয়ায় অরুচি ইত্যাদি বেড়ে যায়।

সকাল বেলার পাড়া তাল সারাদিন ফেলে রেখে বিকেলে খেলে, সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষও হাতে হাতে এর প্রমাণ পাবেন। জন্ডিসের রোগীর এমনিতেই তার রোগের কারণে খাওয়ায় অরুচি, বমি বা বমিভাব এসব থাকতে পারে। আর তার সাথে যদি এই উটকো ঝামেলা যোগ হয়, তাতে যে রোগীর স্বাভাবিক খাদ্য ও পানি গ্রহণ ব্যা’হত হবে, সেটাতো বলাই বাহুল্য।

আখের রস আমা’দের দেশে জন্ডিসের একটি বহুল প্রচলিত ওষুধ। অথচ সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে রাস্তার পাশের যে দুষিত পানিতে আখ ভিজিয়ে রাখা হয় সেই পানি থেকেই অনেক সময় আখের রসে এবং তারপর ঐ রস থেকে হেপাটাইটিস এ বা ই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়াতে পারে।

আমা’দের আরেকটি প্রচলিত বিশ্বা’স হচ্ছে জন্ডিসের রোগীকে হলুদ দিয়ে রান্না করা তরকারি খেতে দেয়া যাব’ে না কারণ এতে রোগীর জন্ডিস বাড়তে পারে। আসল কথা হলো র’ক্তে বিলিরুবিন নামক একটি হলুদ পিগমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই জন্ডিস দেখা দেয়, কিন্তু এর সাথে খাবারের হলুদের কোন ধরনের যোগাযোগই নেই। একইভাবে জন্ডিসের রোগীকে তেল-মসলা না দিয়ে শুধুমাত্র সি’দ্ধ খাবার খেতে দেয়ারও কোন যুক্তি থাকতে পারে না।

এ সমস্ত রোগীদের এমনিতেই খাবারে অরুচি দেখা দেয়। তার উপর এ ধরনের খাবার-দাবার রোগীদের উপকারের চেয়ে অ’পকারই করে বেশি। তাই জন্ডিসের রোগীকে সবসময় এমন খাবার দেয়া উচিত যা তার জন্য রুচিকর, যা তিনি খেতে পারছেন।তবে মনে রাখতে হবে বাইরের খাবার সব সময় পরিহার করা উচিত। বিশেষ করে খুব সাবধান থাকতে হবে পানির ব্যাপারে।

আরও পড়ুন:  কচু শাক শুধু দৃ’ষ্টি’শ’ক্তি’ই বা’ড়ায় না, কমায় হৃ’দ’রো’গ-ডা’য়া’বে’টিসের ঝুঁ’কিও

জন্ডিস থাক বা না থাক, না ফুটিয়ে পানি কখনোই খাওয়া উচিত নয়। তেমনিভাবে বাইরের খাবার যদি নেহাৎ খেতেই হয় তবে তা অবশ্যই গরম খাওয়া উচিত। সতর্ক থাকা উচিত ফুচকা-চটপটি, বোরহানি আর সালাদের ব্যাপারে। কারণ হেপাটাইটিস এ বা ই-এর মতো পানিবাহিত ভাইরাসগু’লো এসবের মাধ্যমেই ছড়িয়ে থাকে।

বিশেষ করে গ’র্ভবতী মায়েদের খুব সাবধান থাকা উচিত। এ সময় মায়েরা প্রায়শই বাইরের খাবার, এটা-সেটা খেয়ে থাকেন যা থেকে তারা অনেক সময়ই হেপাটাইটিস ই ভাইরাস জনিত জন্ডিসে আ’ক্রা’ন্ত হন। আর গ’র্ভাবস্থার শেষ তিন মাসে যদি হেপাটাইটিস ই হয়, তবে তা থেকে মা ও গ’র্ভের শিশুর মৃ’ত্যুর আশঙ্কা শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি।জন্ডিসের রোগীদের সাথে একই প্লেট-বাসন বা গ্লাসে খাবার বা পানি খাওয়া যাব’ে কিনা এটি জন্ডিস রোগীর আ’ত্মীয়-স্বজনদের একটি বড় প্রশ্ন।

যে সমস্ত ভাইরাসের মাধ্যমে একিউট হেপাটাইটিস জনিত জন্ডিস ’হতে পারে, তাদের মধ্যে হেপাটাইটিস বি ও সি ছড়ায় র’ক্তের মাধ্যমে। আর হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাস দুটি খাদ্য ও পানিবাহিত হলেও, এই দুটি ভাইরাসের কারণে রোগীর যতদিনে জন্ডিস দেখা দেয়, তখন তার কাছ থেকে আর ঐ ভাইরাস দুটি ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে না বললেই চলে। কাজেই জন্ডিস রোগীর সাথে প্লেট-বাসন শেয়ার করার মাধ্যমে কারও এই রোগে আ’ক্রা’ন্ত হওয়ার কোন কারণ নেই।

ঠিক তেমনিভাবে জন্ডিস রোগে আ’ক্রা’ন্ত মা নিশ্চিন্তে তার সন্তানকে দুধ পান করাতে পারেন তবে মা’র যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাস জনিত জন্ডিস হয়ে থাকে তবে শিশুর জন্মের সাথে সাথেই হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন ইঞ্জেকশন দেয়া অত্যন্ত জরুরি। কারণ মায়ের দুধের মাধ্যমে না ছড়ালেও, মা’র ঘনিষ্ট সাহচর্যে শিশুর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আ’ক্রা’ন্ত হবার আশঙ্কা থাকে এবং আমা’দের দেশে অনেক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের রোগী এভাবেই এই রোগে আ’ক্রা’ন্ত হয়ে থাকেন।

(লেখক: ইসরাত জাহান, ডায়েটিশিয়ান ও নিউট্রিশিয়ানিস্ট, বিআরবি হাসপাতাল, ঢাকা।)

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 6
    Shares