প্রচ্ছদ এক্সক্লুসিভ

ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠবে কি মহামারি?

14
ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠবে কি মহামারি?
পড়া যাবে: 3 মিনিটে

১৯১৮ সালের মহামারির পর বিংশ শতাব্দি দুটি বড় ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির সাক্ষী হয়েছে। এর একটি ১৯৫৭ সালের এশিয়ান ফ্লু (এইচ২এন২), যা কিনা পৃথিবীব্যাপী প্রায় ১১ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে এবং অন্যটি হলো ১৯৬৮ সালের তথাকথিত হংকং ফ্লু (এইচ৩এন২)। যাতে বিশ্বব্যাপী ১০ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল, যাদের বেশিরভাগেরই বয়স ছিল ৬৫ বছর। এর এক বছর পর মৌসুমি অসুখ হিসেবে ফিরে এসেছিল পরের ফ্লুটি। যদিও এর প্রভাব ও প্রাণঘাতী স্বভাব হ্রাস পেয়েছিল।

তখনকার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ঘেটে যে বিষয়টি অনুধাবন করা যায় তা হলো-  মহামারির রাজনৈতিক মাত্রা ছিল বেশ অস্পষ্ট কিংবা সংক্ষিপ্ত। এর সঙ্গে আমরা যদি কোভিড-১৯ এর তুলনা করি যেখানে স্পষ্টতই মধ্য জুলাই ২০২০ পর্যন্ত ৬ লাখ মানুষ মারা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে, যদিও বেশিরভাগ দেশের প্রকাশিত ডাটার সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। পাশাপাশি এটাও অনেকটা নিশ্চিত যে এ বছরের মহামারিতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৫৭ ও ১৯৬৮ সালকে ছাড়িয়ে যাবে।

একইসঙ্গে এটাও অনেকটা স্পষ্ট যে, এর অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিণতি কিছু ভিন্ন ধরনের। এটাকে বলা যায় যেমনটি ব্রিটিশ রক্ষণশীল দার্শনিক জন গ্রে দাবি করেছেন, ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্টের কম কিছু না।

রাষ্ট্রের আপেক্ষিক নিষ্ক্রিয়তাএক পর্যায়ে এ ধরনের দাবির অন্তর্নিহিত কারণ অনেকটাই স্পষ্ট হয়। ১৯৫৭ ও ১৯৬৮ সালের মহামারির সময় রাষ্ট্রের বড় ধরনের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়নি। আরও একটি বিষয় স্পষ্ট, যে পরিসংখ্যান সংক্রমিত ও মৃত্যুর সংখ্যার হিসাব রাখে, তা সে দুই মহামারিতে অনেক বেশি আনুমানিক ছিল।

তবে এটাও ঠিক যে, সে সময় কোনও গুজব ছিল কিনা- যেখানে মহামারিকে জৈবিক যুদ্ধের ইচ্ছাকৃত কিংবা অপ্রত্যাশিত কোনও ফলাফল হিসেবে দেখানো হয়েছে। অবশ্য এমন গুজব বিস্তৃত আকারে ছিল বলে দেখা যায়নি। এছাড়া ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে রাষ্ট্র ও জনগণের কেউই বড় আকারের হস্তক্ষেপের আশা করেনি।

প্রাথমিকভাবে এ ষড়যন্ত্রতত্ত্বের অনুপস্থিতির ব্যতিক্রম ঘটে ১৯২২ সালে, যখন নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে জানায়, ১৯৭৭ সালের তথাকথিত রাশিয়ান ফ্লু সম্পর্কে অনেক বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন যে ১৯৫০ এর একটি ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস চীনের ল্যাবে সংরক্ষণ করা ছিল, যা কিনা ১৯৭৭ সালে কোনোভাবে পরিবেশে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। 

আরও পড়ুন:  ডানপন্থীর বামে বামপন্থীর ডানে

১৯৫৭ ও ১৯৬৮ সালের মহামারির ক্ষেত্রে জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া কেন আমাদের কাছে অপেক্ষাকৃত কম মনে হচ্ছে, মারাত্মক মৃত্যুহার সত্ত্বেও? এখানে সম্ভাব্য কিছু কারণ চিল। একটি হচ্ছে, দুই মহামারির অর্থনৈতিক প্রভাব অপেক্ষাকৃত সীমিত ছিল। যদিও ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপিতে ধস নেমেছিল। এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান রঘুরাম রাজন বলেছিলেন, এ বছর পাশ্চাত্যের দেশগুলো জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ২-৩ শতাংশ (ইতিবাচক) থেকে ৪-৫ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক হয়ে উঠবে এবং চীনের প্রবৃদ্ধি বর্তমান পরিসংখ্যানও বেশ হতাশাজনক। 

সীমিত প্রত্যাশাআরেকটি কারণ হলো ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশক উভয় সময়েই সরকারের কাছে সীমিত সংস্থান ছিল সামাজিকভাবে হস্তক্ষেপ করার জন্য। যদিও এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সক্ষমতা বেড়েছে হস্তক্ষেপ চলাকালেই। কিন্তু খুব সমান্তরাল উপায়ে।

অন্যদিকে এই সময়ের মধ্যে মিডিয়ার অবস্থানগত পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৫৭ ও ১৯৬৮ সালের মহামারির সংবাদ প্রকাশ করেছে কেবল এপিসোডিক্যালি এবং প্রায়ই তা ছিল অস্বচ্ছ এবং টেকনিক্যাল ভাষায়। যা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে বেশ ভিন্ন। আমরা এখন সারাক্ষণ সংবাদ পাচ্ছি। অনেকগুলো সাইট প্রতিনিয়ত আপডেট দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এছাড়া মধ্য শতাব্দির মহামারি সরকারি নিষ্ক্রিয়তা খুব অল্প রাজনৈতিক মূল্যই বহন করতো। কিন্তু ২০২০ সালের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সত্য ছাড়াও আরও সূচক আছে যা প্রমাণ করে তিনটি মহামারির মাঝে করোনা মহামারি সবচেয়ে মারাত্মক। সামাজিক বিধিনিষেধ মানা না হলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারতো।

পরিসংখ্যানের বার্তাচীন এখন আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাত করছে নিজেদের মহামারি মোকাবিলা করার মডেল। একইভাবে বিভিন্ন সরকারের মাঝে তুলনা করা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের প্রস্তাবিত সমাধানগুলোকে নাগরিকরা গ্রেড দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ সবচেয়ে বিশৃঙ্খল ও উদ্ভট অসমন্বিত নীতি দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। যা সেই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দুর্বল বিজ্ঞাপন হতে পারে। 

আরও পড়ুন:  মৌনতার পাপে আমরা সবাই পাপী

অন্যদিকে এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, বিশ্বব্যাপী ডাটা ও সংবাদ পরিচালিত হয় বিভিন্ন এজেন্সি দ্বারা। যার কিছু আবার সরকারি। এটা আমাদের নিয়ে যায় অনিবার্যভাবে দ্বিতীয় রাজনৈতিক মাত্রার দিকে। যা ষড়যন্ত্রতত্ত্বগুলোর বিস্তৃত প্রচারের শর্ত, বিশেষ করে পাশ্চত্যের দেশগুলোতে। যা বিস্তৃতভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত।

একসময় যার প্রথম ভাগ ইতালিয়ান দার্শনিক গিওর্গিও আগামবেনের মতো প্রভাবশালীর দ্বারা স্বীকৃতি পেয়েছিল। তিনি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিলেন, কোভিড-১৯ প্রতি বছর যে মৌসুমী ফ্লু হয়েছিল তার চেয়ে বেশি মারাত্মক নয়। যা কোনও মনোযোগ বাদ দিয়ে অনেক জীবন দাবি করে বসে। আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি, যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের কিছু অংশে বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। যা ছিল কোভিড-১৯ ল্যাবে তৈরি এবং এটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে। 

তৃতীয় রাজনৈতিক মাত্রার দিকে এসব পরিচালিত করেছে। যা কোভিড-১৯ এর বিস্তৃতির সময় অপেক্ষাকৃত স্বল্প সময়ে রক্ষণাত্মক জাতীয়তাবাদে অবদান রেখেছিল। যা আবার সম্পর্কিত ছিল জোনোফোবিয়ার সঙ্গে। এছাড়া ইউরোপিয়ান সংহতিও মহামারির শুরুর দিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

এই মহামারির ফলে পেশিবাদী জাতীয়তাবাদ ফিরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। এমনকি ব্রেক্সিটিয়াররা যুক্তি দেখাতে পারে যে তারা ঠিক ছিলেন, যদিও ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে অনেক অভিবাসী ডাক্তার ও নার্স রয়েছেন। এমন অবস্থা বিশ্বের আর অনেক স্থানেই দেখা গেছে।

আমরা ২০২২ সালে কোনও ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড দেখতে পাবো না। বরং দুনিয়াটা হবে সীমিতকরণ ও বিস্তৃতির; দেশগুলো পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হবে কিন্তু তাদের মধ্যে থাকবে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ২০২০ সালের এই মহামারি তাই সম্ভবত কোনও টার্নি পয়েন্ট হয়ে উঠবে না।

লেখক: সঞ্জয় সুব্রামনিয়াম, অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 5
    Shares