প্রচ্ছদ মুক্ত মতামত

জিয়ায় ফেরার সময় বয়ে যায়

11
জিয়ায় ফেরার সময় বয়ে যায়
পড়া যাবে: 4 মিনিটে

মারুফ কামাল খান

কোনো দর্শন ও কর্মসূচির অনুসারীরা যখন আশপাশের অনেক কিছুই অন্যদের তুলনায় বেশি অ্যাকোমডেট করবার ক্ষমতা রাখে, তখনই সাফল্য ও বিজয় সূচিত হয় সেই দর্শন ও কর্মসূচির। যে-আদর্শের পতাকা তলে বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্য গড়বার সুযোগ যত বেশি, সেই আদর্শ ততো বেশি অজেয়। যে-দল সমাজের যত বেশি সংখ্যক মানুষের স্বার্থ ও চিন্তাকে ধারণ করতে পারে, সে-দল ততো বড় ও শক্তিশালী হয়।রবি ঠাকুর ‘ক্ষণিকা’য় দু’লাইনের চমৎকার ছন্দোবদ্ধ এক প্রবচন লিখে গেছেন। দ্বিপদী সেই কবিতাটিকে দারুণ সত্য বলে মনে হয় আমার কাছে। সেটি হলো : “উত্তম নিশ্চিন্তে চলে অধমের সাথেতিনিই মধ্যম যিনি থাকেন তফাতে।”এর সাথে চলা যাবেনা, একে দূরে রাখতে হবে, ওকে এড়িয়ে চলতে হবে, তাকে ছোঁয়া যাবেনা – এ ধরণের ছুঁৎমার্গে বিশ্বাসী লোকদেরকে রবীন্দ্রনাথ ভদ্রতা করে মধ্যম বা মাঝারি মানের লোক বলেছেন। তবে তিনি উন্নত ও উত্তম বলেছেন তাদেরকেই, যারা নিশ্চিন্তে, কোনো রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্বে না-ভুগে অধম সহ সকলকে সাথে করেই পথ চলতে পারে।রাজনীতি ও কুটনীতি সহ সব নীতিতেই এই কথাটি সত্য এবং প্রয়োগযোগ্য। যতো বেশি স্রোতধারাকে চলার পথে আপনি সঙ্গে নেবেন, যতো বেশি ধারাকে আপনার সঙ্গে মিলতে দেবেন, ততো বেশি শক্তিশালী ও বেগবান হবে আপনার মূলধারা।অন্যদের যত বেশি সম্ভব সঙ্গে রাখার এই যে যোগ্যতা, এটাই নেতৃত্বের দক্ষতা। ছোটোখাট অন্যমত, ভিন্নমত এবং ধারা-উপধারাকে আত্মস্থ ও অ্যাকোমডেট করার ক্ষমতা-সাধ্য-সামর্থ্য যে-আদর্শের যত বেশি, সেই আদর্শ ততো মহৎ, ততো উদার, ততো বড়ো।কূপমণ্ডূকেরা অন্যমত সহ্য করতে পারেনা। তারা জানে, তাদের আদর্শ এতো সংকীর্ণ যে, অন্য কোনো আদর্শকে পাশে আসতে দিলেই তাদেরটা ম্লান হয়ে যাবে। অন্য কোনো মতামতকেই তাই তারা সহ্য করতে পারে না। জবরদস্তি করে সকল ভিন্নমতকে অবদমিত বা নিশ্চিহ্ন করাটাই তাদের লক্ষ্য।এই সংকীর্ণতা ও অসহিষ্ণুতার বিপরীতে বাংলাদেশে দাঁড়িয়েছিলেন জিয়াউর রহমান নামের একজন মানুষ। সে কারণেই এদেশে সাফল্যের সিংহদরোজা খুলে গিয়েছিল তাঁর সামনে। তিনি রাজনৈতিক ভাবাদর্শের ডান ও বাম সকলকে দু’হাতে ধরে সঙ্গে নিয়ে নিজে মধ্যপথ দিয়ে নিশ্চিন্তে এগিয়ে গিয়েছেন নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে।তিনি বামঘেঁষা ভাসানী-ন্যাপকে তাঁর রাজনৈতিক দল গঠনের মূলস্রোত হিসেবে বেছে নিলেও ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জন্যও তাঁর দলের দুয়ার অবারিত রেখেছিলেন। একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অভিযাত্রায় কৃতি পেশাজীবীদেরকেও সঙ্গী করেছিলেন শহীদ জিয়া। তিনি নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করতেন, তাঁর আদর্শ এতো ঠুনকো নয় যে, অন্য কোনো আদর্শের সংগে প্রতিযোগিতায় তা টিকবে না, কিংবা অন্যমতের সংস্পর্শে এলেই তাঁর মতবাদ হারিয়ে যাবে।তিনি এই দৃঢ় আত্মবিশ্বাসে ভর করেই দেশপ্রেমিক, সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও মেধাবী মানুষদের খুঁজে খুঁজে এনে একত্র করেছিলেন তাঁর কর্মযজ্ঞের সারথি হিসেবে। এঁরা প্রায় প্রত্যেকেই নিজ নিজ অঙ্গনে নক্ষত্রের মতন দীপ্তিমান ছিলেন। শহীদ জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল ও সরকারকে তাই তখন বলা হতো ‘গ্যালাক্সি অব স্টার্স’। বাঙলায় তরজমা করলে বলতে হয়, তিনি তারকাখচিত ছায়াপথ রচনা করেছিলেন।তাঁর সমকালে নিজের দল ও সরকারের বাইরেও যারা অন্যমতের যোগ্য মানুষ ছিলেন, তিনি তাদেরকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। ডেকে এনে তাদের মতামত গুরুত্ব সহকারে শুনতেন। অনেককেই তিনি যোগ্যতা অনুযায়ী কাজে লাগাতেন, দায়িত্ব দিতেন।জিয়াউর রহমানের ওপর যখন রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় তখন দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ছিল এবং কোনো রাজনৈতিক দলও ছিল না। তিনি রাজনীতিকে শেকলমুক্ত করেন এবং রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার অবারিত করেন।কোনো দলমতকেই নিষিদ্ধ করে রাখার পক্ষপাতি ছিলেন না শহীদ জিয়া। সহিংস ও গুপ্ত রাজনৈতিক তৎপরতার অবসানকল্পে বাংলাদেশের নাগরিকদেরকে তিনি যে-কোনো মতামতের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের অধিকার দেন। তিনি ভিনদেশে রাজনৈতিক আশ্রিতদের দেশে ফিরে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হবারও সুযোগ দেন।কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকে গ্রহন কিংবা বর্জনের ব্যাপারে সরকারের কর্তৃত্ব ও এখতিয়ারকে খর্ব করে তিনি সে-অধিকার জনগণের হাতে অর্পণ করেন। তাঁর নেয়া এ-সব পদক্ষেপের ফলে সশস্ত্র বিপ্লবে বিশ্বাসী বামপন্থীরা অনেকে এবং ধর্মাশ্রয়ী ডানপন্থী দলগুলো গুপ্ত তৎপরতা ছেড়ে নিয়মতান্ত্রিক প্রকাশ্য রাজনীতির ধারায় ফিরে আসে।এ-সব পদক্ষেপ ও নীতির কারণেই শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনীতিকে জাতীয় ঐক্যের রাজনীতির অভিধায় চিত্রিত করা হয়। তাঁর সে রাজনীতি এতোটাই লোকপ্রিয় ও দুর্নিবার হয়ে ওঠে যে, রাজনীতির প্রচলিত কোনো ধারার পক্ষেই এর অগ্রযাত্রা ও সাফল্য রোধ করা সম্ভব হয়নি।তাঁর রাজনীতির সর্বব্যাপী এই গ্রহনযোগ্যতার কারণেই প্রায় চার দশক ধরে দৈহিক অনুপস্থিতি সত্বেও শহীদ জিয়ার আদর্শই এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উৎকণ্ঠার প্রধান কারণ হয়ে আছে।জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ধীরে ধীরে দেশের রাজনীতিতে আবারও অসহিষ্ণু, অনুদার, হিংসুটে ও ছোট মাপের লোকেরা প্রাধান্য বিস্তার করেছে। আচরণ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক থেকে এরা শহীদ জিয়ার সম্পূর্ণ বিপরীত। এদের সার্বক্ষণিক বুলিই হচ্ছে, এরে তাড়াও, ওরে খেদাও, তারে নির্মূল করো। এ ছাড়া যেন এদের মুখে আর কোনো কথা নেই। নিন্দাবাদ, কুৎসা ও নোংরা পরচর্চাই এদের প্রধান পুঁজি। এরা মতামতের শতফুল ফুটতে দেয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। এদের কথা হচ্ছে, আমার সাথে একশো ভাগ না মিললে, শতভাগ আমার অনুগত না হলেই সে আমার শত্রু।রাজনৈতিক এই অপসংস্কৃতি শুধু রাজনীতির দুর্দশাই নয়, দেশের দুর্গতির জন্যও দায়ী। চরম অসহিষ্ণু এই অপসংস্কৃতির চর্চায় দলগুলো যোগ্য লোকশূণ্য হয়ে পড়ছে এবং অযোগ্যরা জেঁকে বসছে। সুবিধাশিকারী, দুর্নীতিগ্রস্ত, ধান্দাবাজ ও মন্দ লোকেরা একে একটা মওকা হিসেবে নিয়েছে। এই অসহিষ্ণুতাকে আরো উষ্কে দিয়ে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে উগ্র স্লোগানের আড়ালে তারা নিজেরা বিভিন্ন সেক্টরে লুটেপুটে খাচ্ছে, দেশটাকে ফোকলা করে ফেলেছে।শহীদ জিয়ার দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে এ কথাগুলো এ-কারণে বলছি যে, ৪২ বছরের ঘাত-প্রতিঘাত ও সাফল্য-ব্যর্থতার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ দলটির ফের শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকেই দৃঢ়ভাবে ধারণ করার সময় এসেছে। কেননা বিপরীত রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির সংক্রমণ বিএনপিকেও ইতোমধ্যে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিও এই রোগে আক্রান্ত হবার জেরে ধুঁকছে তীব্র সংকটে।অনেকদিন ধরে, বিশেষ করে ২০০১ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই দলের ভেতরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদেরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে একটি অপকৌশলের প্রয়োগ শুরু করে। অপকৌশলটি হচ্ছে : “যোগ্যদের ভিড়তে দিও না, দক্ষদের তাড়িয়ে দাও।” এর ফলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ঘিরে মেধাবী, যোগ্য, দূরদর্শী, কৌশলী, দেশপ্রেমিক, সৎ, দক্ষ একদল উপযুক্ত মানুষের যে বলয় থাকার কথা, নেতৃত্বের সে বলয় ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে।এই শূণ্যস্থান যারা পূরণ করেছেন তাদেরকে নিজেদের অবস্থান তৈরি ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার তৎপরতাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। দেশের কিংবা দলের প্রতি অবদান রাখার অবকাশ তাদের হয়নি এবং আরেকটু কঠিন ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, সে সামর্থ বা যোগ্যতাও তাদের অনেকেরই হয়নি।এখনো এ দলের প্রতি জনসাধারণের বিপুল সমর্থনের কমতি বা মাঠের কর্মীর অভাব হয়নি এ-কথা সত্য কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি ও প্রশাসন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ ও যোগাযোগ রক্ষার মতন উপযুক্ত ব্যক্তিত্বের দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় আওয়ামী লীগের চলমান রেজিমের সর্বব্যাপী ব্যর্থতার পটভূমিতে বিএনপিতেও দক্ষ-যোগ্য একটি ডাইনামিক সরকার ও মন্ত্রিসভা গঠনের উপযোগী টিমের প্রকট অভাব এখন দেশী-বিদেশী স্টেক হোল্ডারদের চোখেও দৃষ্টিগ্রাহ্য।ব্যাপক জনসমর্থন, বিপুল কর্মীশক্তি, ভিনদেশের লেজুড়বৃত্তিমুক্ত দেশভিত্তিক স্বাধীন রাজনীতি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনস্বার্থঘনিষ্ঠ বাস্তবমুখী প্রয়োগযোগ্য কর্মসূচি থাকা সত্বেও কেবল কূটকৌশলের কাছে হেরে যাচ্ছে বিএনপি। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। পরিস্থিতি ও সময় বুঝে কখন দু’পা আগাতে হয়, আবার কখন এক-পা পিছিয়ে আসতে হয়, বারবার ভুল হচ্ছে সে কৌশল এবং সময় নির্ধারণেও।বিএনপিকে মিনিমাম স্যাক্রিফাইসে ম্যাক্সিমাম গেইন করার ব্যাপারে সবচে’ দক্ষ পার্টি বলে এক সময় সকলে জানতো। অথচ ইদানিং তারা আর সে ম্যাচিওরিটির পরিচয় দিতে পারছে না। ফলে অনেক বেশি ত্যাগের বিপরীতে দলের অর্জন হচ্ছে সামান্য।বিরাট রাজনৈতিক আদর্শ সম্বলিত বিপুল সমর্থনধন্য একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের যেমন আচরণ হওয়া উচিৎ বিএনপি যেন তেমন আচরণ করতেও ভুলে গেছে। সকল স্তরে মতাদর্শের চর্চা এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুশীলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব সৃষ্টির ধারা নানা অজুহাতে স্থগিত করে রেখে ওপর থেকে পদ-পদবি বন্টনের প্রক্রিয়াও দলকে গতিহীন, নিস্তরঙ্গ ও স্থবির করে ফেলেছে।কেবল দল নয়, এ-সব দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটির ভিকটিম হচ্ছে দেশ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকবৃন্দও। জন্মদিন উপলক্ষে বিএনপি বিষয়গুলো খুব ভালো করে খতিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনে পুনর্মূল্যায়ন করবে, নীতিনির্ধারকদের কাছে এটাই প্রত্যাশা।তবে শুধু বিএনপিকে নয়, আজ সর্বব্যাপী যে-সংকট তাতে, বিএনপিকে তো বটেই সেই সাথে রাজনীতিকে এবং দেশকেও জিয়ার নীতি-আদর্শ-কর্মসূচির কাছে ফিরে আসতে হবে। বড়ই তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে সে প্রয়োজন এবং সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে।মারুফ কামাল খান সিনিয়র সাংবাদিক

আরও পড়ুন:  ভিপি নুর, ধর্ষণ এবং আট মাস

বাংলা ম্যাগাজিন /এসপি

সাম্প্রতিক খবর আপনার মুঠোফোনে পেতে এখনি প্লে-স্টোর থেকে Bangla Magazine সার্চ করে ডাউনলোড করুন বাংলাদেশের নাম্বার ওয়ান নিউজ ম্যাগাজিন অ্যাপটি। অথবা ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন এখানে। ভালো লাগলে অবশ্যই রেটিং দিয়ে উৎসাহী করুন।

  • 4
    Shares